হীরা-মণি

এম এস প্রিন্স
বৃহস্পতিবার বেলা দুপুর- ছেলে মেয়েরা বাড়ির পথে হাঁটছে
কেবলি হীরা মণি স্কুল ঘরে পাশাপাশি বসে আছে।
দরজা নেই জানালা নেই মাস্টার মশাই-গণও বিদায়;
দু’জনায় ভাবছে- ‘কাল শুক্রবার পুতুল বিয়ে খেলব-
সামাজিক বিধানানুযায়ী বিয়ে যেমন করে হয় তেমন ভাবেই।’
এই কল্পনায় কালের ঘড়ি চলতে চলতে অর্ধরাত খবর নেই।
বাটীতে কান্নার রুল- ‘আমার সোনা মানিক কই?’
স্কুল ঘরের বারান্দায় শিয়ালের ডাক, কোনো-ব্যাঙ্গের স্বর
এই মাত্র কান নাড়া দিল- জোনাকিরা জ্বলছে,
রাতের পাখির গান আর চাঁদের আলো আমার জীবনে এক-
নতুন কবিতা, দু’জনার কথা। আপনার মাঝেই আবার প্রশ্ন-
বাড়ি ফিরব কেমনে, কেমনেই বা রাত কাটাব?
আমরা দু’জন এই বয়সে- বলে দু’জনার-
ভয়ের মলিন মুখ মুখোমুখি, টেবিলে মাথা রেখে ঘুমায়।
মা-বাবা আত্মীয় বাড়ি খোঁজে স্কুল ঘরের দিকে যাত্রা করল।

আস্সালাতু খায়রুন মিনান নাও, আস্সালাতু খায়রুন মিনান নাও।
ভিষণ খিদে, এইটুকু জল খাবারে কি হবে? বাবার ডাকে-
ঘুম ভাঙে, কচলাতে কচলাতে মণি চোখ খোলেই- তোমরা!
প্রশ্ন না উত্তর দাও- ‘বাড়ি যাও নি কেন? কেমনেই বা দিবারাত্রি কাটলো!
আমার হালে যে পনি নাই।’
আমরা যে পুতুল বিয়ে খেলব- এই বিয়েতে বউ জামায়ের সাজন ভজন-
মুরুব্বি থাকবে থাকবে বন্ধু যত। তাদের আপ্যায়ন
কাবিনে দেনমোহর,- এই নিয়ে নকশা আঁকতে গিয়ে
কখন যে দিন শেষে রাত এল বলাই মুশকিল! বলে বাবার হাত
ধরে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল উভয়ে।

শিউলি ঝরা প্রভাত শেষে সবুজ ঘাসের ফুলে রবির কীরণে-
সোনালি শিশির যেন এক আর পৃথিবী। ইচ্ছে করে আমি তাতে
হেঁটে চলি বারবার কিন্তু না। হীরা-মণির নিচক খেলা আমায় যেতে দিল না।
বন্ধু গণ সবাই এল। জামাই-বউকে হলুদ মেহেদি পরে দিয়ে হীরা-মণি
নিজেরাও একজন আর জনকে পরাল। বন্ধুরা মিলে বিয়ের গান ধরল-
আমি কেবল বিচরণ করে চলছি তাদের মাঝে উল্লাসের নবদিগন্তে।
উঠোনের পূর্ব দক্ষিণ কোণে চুলা বানিয়ে আপনার মত করে
ভাত মাছ পাকায়ে খেয়ে নিল সবে। বাড়ির বুড়ো দাদু ভাইও হাজির
কলার পাত আর কুপি বাতির শিষে তেল মিশে কালি বানিয়ে আনল-
কাবিন নামা লিখবে। সবে চুপ, পোষা টুঠন দৌঁড়ে এসে মণির পাশে
মাটিতে শোয়ে মাথা তোলে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
দাদু ভাই আঙুলের মাথায় কালি ভরায়ে কলা-পাতায় কি যেন লিখে তিনবার বলল- ‘এক টাকা দেনমোহর ধার্য করে পচিশ পয়সা উসল দিয়ে পঁচাত্তর পয়সা বাকি রেখে হীরার পুত্র আবিরের সহিত মণির কন্যা প্রকৃতির বিবাহ প্রদান করা হল। রাজি থাকলে বল মা- কবুল।’ পুতুল আর কথা বলে না।
কবুল বলল যেমন হীরা মণি, আংটি বদলও করল তারা তাদের মাঝে।
আমি অবাক নয়নে চেয়ে কান পেতে শোনছি আর সময়ের ডানায় লিখছি-
‘নিরাকার প্রেম কেন নীলাকাশের চাঁদে মিলায়?’
আর এই প্রশ্নই আমায় আলেয়ার মত সজীব কবিতার ধারে নিয়ে গেল।
নিয়ে গেল বসন্তের অস্পষ্ট স্নিগ্ধ নীলাচলে।
ফিরতে চাইলেও কভু আর ফেরা হয় না।
আমার মেয়ে এখন তোমার ঘরের লক্ষ্মী, দেখে রেখো- বলে সপে দিয়ে
প্রকৃতি-আবিরের দুধ হীরার মুখে দিল দিল নিজেরও অননে।
অতপর তোলে দিল আপনার হাতে কলা-কাঠের পাল্কীতে।
হীরা পুত্র বধু নিয়ে যাত্রা করল জীবনের এক নবদিগন্তে।

অমন করে চলতে গিয়ে জীবন বেলাতে বিশতম অধ্যায়।
মণির বিয়ের ঘর এল, দাগ কাটলো এই প্রথম তাদের মনে –
‘এ কোন হাসি হাসব আমি আর পৃথিবীর তরে?’
বলে চোখের জলে ভেসে পত্রে হীরাকে লিখল-
‘কালের স্রোতের অতীত সব লিখা আছে চিত্ত-সবুজের সমারোহে।
চোখ খোললেই কাছে টানে কবিতার সংবিধানে।
দেখা যায় পড়া যায়, ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না। তুমি এসো।’
শান্ত পাখির থেকে নিয়ে পড়ে- ‘নূরের জীবন আঁধারে মিলাতে দিও না।’
বলে কাছে এসে মণিকে বুকে নিল।
‘গগন তলে আলো দেখিয়েছি শিখিয়েছি সবুজ শ্যামল সান্ত¦নার বাণী।’-
বলে বাবা-মায় দু’জনার প্রেমে আঁকে ক্ষয় রেখা।
‘যেমন করে চাই সাজবে পৃথিবী তেমন ভাবে।’- বলে মণির ঘরে
তালা দেয়। হীরাকে স্বীয় বাড়িতে।
সূর্য কন্যার মত ফোটা পুষ্প তারা হৃদয় থেকে হারায় না,
গৌরব মহিমায় নিয়ে চলে নীলাকাশ তলের শারদীয় মেঘে।
তাই- ‘হোক না সে নিচক পুতুল বিয়ে কবুল তো বলেছি আমরা।
এক টাকার দেনমোহরে বন্ধু যত আরো সাক্ষি দাদু ভাই।’ বলে-
দু’জনায় পাড়ি জমায় সবার চোখের আড়ালে নতুন ধরা তরে,
যেখানে মিলেছে জীবনের সব সবুজ রেখা পথ।
অবণীর সব দিক দিগন্তর খোঁজে ফিরে- ‘সন্তানের মত
যাচাই কর্তব্য।’ বলে- বাংলা মা পত্রিকায়- ‘সন্ধান চাই।’-
লিখে আশায় দিন গুণছে বাবা-মায়।