মার্কিন অনুদান ছাড়া পাকিস্তান টিকবে তো?

কুলদীপ নায়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বললেন, তাঁর দেশ ‘বোকার মতো’ গত ১৫ বছরে পাকিস্তানকে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে, তাতে সত্যতার উপাদান আছে। কিন্তু তিনি আরও যে বললেন, যুক্তরাষ্ট্র এর বিনিময়ে কিছু পায়নি, তা ঠিক নয়। বোধগম্যভাবেই পাকিস্তান ডলারে এর প্রতিদান দিতে পারেনি। ওয়াশিংটন তা আশাও করেনি। কিন্তু পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের দেশে ঘাঁটি করতে দিয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

পাকিস্তানের কাছ থেকে তারা মিথ্যা বা প্রতারণা ছাড়া কিছু পায়নি-এ কথা বলে তিনি অযথা কর্কশ আচরণ করেছেন। এমনকি তিনি নেতাদের বেকুবও বলেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় পৃথিবী যখন দুভাবে বিভক্ত ছিল, তখন পাকিস্তান ছিল মার্কিন বলয়ে। ১৯৫৫ সালে গঠিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেন্টোর অংশীদার ছিল রাওয়ালপিন্ডি। এই জোট খুব একটা সফল ছিল না, যার মধ্যে ছিল ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, তুরস্ক ও যুক্তরাজ্যের মতো অসম দেশগুলো।

এই সেন্টোর লক্ষ্যের সঙ্গে অধিকতর সফল জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর লক্ষ্যের মিল ছিল। ন্যাটো গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামাল দেওয়া, যাতে তারা মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। চুক্তির সদস্যদেশগুলো পরস্পরকে সহযোগিতা ও সুরক্ষা দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এই দেশগুলোকে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হতে হয়েছিল। সেন্টোর মূল নাম ছিল বাগদাদ প্যাক্ট। অর্থাৎ বোঝা যায়, এর সদর দপ্তর ছিল বাগদাদে। তবে ১৯৫৮ সালে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থান হলে দেশটি এই গোষ্ঠী থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর তার নাম বদলে হয় সেন্টো আর সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয় অপেক্ষাকৃত কম মৌলবাদী দেশ তুরস্কের আঙ্কারায়। এই সংস্থা ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ও ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখে, যদিও ইরাক প্রথম যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং দ্বিতীয় যুদ্ধে সহযোগিতা করেছে।

অন্যদিকে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে সেন্টো হস্তক্ষেপ করেনি। তাদের দাবি ছিল, এটি সোভিয়েতবিরোধী চুক্তি, ভারতবিরোধী নয়। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে তুরস্কের হস্তক্ষেপ থামাতে ব্যর্থ হলে এবং ইরানে ইসলামি বিপ্লব হলে ১৯৭৯ সালে জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। পাকিস্তান যৌক্তিকভাবেই ট্রাম্পের টুইট মেনে নিতে পারেনি। প্রতিক্রিয়ায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা এম আসিফ টুইট করেন, ‘আমরা শিগগিরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইটের জবাব দেব ইনশা আল্লাহ…পৃথিবীকে আমরা সত্যটা জানাব…. সত্য ও গল্পের মধ্যে পার্থক্যটা কী।’ এর কিছু সময় পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতি দেন, ‘পাকিস্তান এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে। এটা যেমন মাঠের বাস্তবতা ভুলভাবে তুলে ধরছে, তেমনি সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা খাটো করছে। এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান যে তুলনাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছে, এই টুইট বার্তায় তা অস্বীকার করা হয়েছে।’

চীন তো অনেক দিন ধরেই তক্কে তক্কে আছে, তারা পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে। চীন বলেছে, তার ‘চিরকালীন বন্ধু’ পৃথিবীর সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে যে ভূমিকা পালন করেছে, পৃথিবীর তা স্বীকার করা উচিত। পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় দেয় বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেদিন দেশটির তীব্র সমালোচনা করলেন, তার পরদিনই চীন এ কথা বলল।

চীন পাকিস্তানকে প্রশংসার বানে ভাসিয়ে বলেছে, সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে ইসলামাবাদ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, পাকিস্তান যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যোগ দিয়েছে, তাতে তারা খুশি, যার ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা পালন করছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘চীন ও পাকিস্তান সব সময়ের বন্ধু। উভয় পক্ষের সুবিধার্থে চীন এই সহযোগিতাকে গভীরতর করতে প্রস্তুত।’ চীন এমন কথা বলবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। আমরা জানি, চীন বর্তমানে পাকিস্তানে পাঁচ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) নির্মাণ করছে। এটি পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে গেছে বলে ভারত আপত্তি তুলেছে। কিছুদিন আগে চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে চীন বলেছে, তারা এই অর্থনৈতিক করিডর আফগানিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়, যদিও আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

তবে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাক্যবোমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় যৌথ মার্কিন-আঞ্চলিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যার মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে চাপ দিয়ে শুধু আফগানিস্তানে নয়, পুরো অঞ্চলেই শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে। আফগানিস্তানও অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান তালেবানদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। এই দ্বন্দ্বে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলেন, পাকিস্তান চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে। ওই করিডরের মাধ্যমে চীন ভারত ও আরব মহাসাগরে ঢোকার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে পারস্পরিক স্বার্থে আফগানিস্তান, চীন ও পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

বোঝা যাচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন মার্কিন নীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। ফলে তাঁর ওই ঘোষণায় ভারত স্বাভাবিকভাবেই খুশি হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বলেছেন, সন্ত্রাসের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের মতো অবস্থান নিয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ কাউকে ছাড়ে না। বিল ক্লিনটন যেখানে কেন্দ্রমুখী বাম নীতি গ্রহণ করেছিলেন, ট্রাম্প সেখানে অতি ডান। পুরোনো মূল্যবোধ এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। এখন দেখার বিষয় হলো, পাকিস্তান মার্কিন অনুদান ছাড়া টিকতে পারে কি না। ইসলামাবাদ বলেছে, তারা হিসাব করে দেখছে, এ-যাবৎ কত টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে, যাতে সেটা ফেরত দেওয়া যায়। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে পাকিস্তান তা করতে পারবে না।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।