আন্দোলনের নামে জানমালের ক্ষতি জনগণ মেনে নেবে না

নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনো কোনো মহল আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ অশান্তি চায় না। নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলনের নামে জনগণের জানমালের ক্ষতি- এসব আর এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না।

শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের এই দিনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলাম। আজ বর্ষপূর্তিতে আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি। ২৮ বছর এ দেশের জনগণ বঞ্চিত ছিল। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে আশু করণীয়, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদের চতুর্থ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এ ভাষণে টানা নয় বছর ধরে দেশের নেতৃত্ব দানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবে।

দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্ম পাবে সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ। দেশের অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থেকে দেশবাসীকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলবে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশকে গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও একযোগে সম্প্রচার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কীভাবে নির্বাচন হবে তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করবে। রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশন ইতিমধ্যে দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কিছু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে।

ভাষণের শুরুতেই শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়ে তাকে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, জনগণ তার ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন, তার মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। কতটুকু সফল কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন, সে বিচার জনগণই করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশ স্বাধীন করেছেন একটি আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে। এ দেশের মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষার হাত থেকে মুক্ত করে তাদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছেন। ২৪ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই তার (প্রধানমন্ত্রী) একমাত্র ব্রত। ‘বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়’- জাতির পিতার এই উক্তি সব সময় তার হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তাই সর্বদা তার একটাই চেষ্টা- কীভাবে এ দেশের মানুষের জীবনকে অর্থবহ এবং সচ্ছল ও সুন্দর করে গড়ে তুলবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা, পরবর্তী ছয় বছর বিদেশের মাটিতে তার নির্বাসিত জীবনযাপন এবং ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ে তার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের বিবরণও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তিনি যখনই মানুষের কাছে গিয়েছেন, তখনই পেয়েছেন মানুষের অপার স্নেহ, ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, বন্ধুর পথ অতিক্রম করে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে দেশবাসীর সেবা করার সুযোগ পায়।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসন, সন্ত্রাস-দুর্নীতি ও লুটপাটের এবং পরবর্তী দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুঃশাসনের বিবরণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ২০১৪ সালের নির্বাচন বানচাল ও সরকার উৎখাতের নামে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যার প্রসঙ্গও টানেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত ২১ বছর এবং ২০০১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ বছর- এই ২৮ বছর বাংলাদেশের জনগণ বঞ্চিত থেকেছে। যারা ক্ষমতা দখল করেছে তারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল। জনগণের কল্যাণে তারা কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং আমরা জনকল্যাণে যেসব কাজ হাতে নিয়েছিলাম, তারা তা বন্ধ করে দেয়।

২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে তার সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছি বলেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি। নয় বছর একটানা জনসেবার সুযোগ পেয়েছি বলেই বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মন্দা থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। জনগণ এর সুফল ভোগ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ হিসেবে গড়ে তুলতে বেশ কয়েকটি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর কাজ অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সমগ্র বাংলাদেশকে রেল সংযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি এবং রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বপ্রামাণ্য দলিলে স্থান পাওয়ায় বাংলাদেশ সম্মানিত হয়েছে বিশ্বসভায়। যে বাংলাদেশকে একসময় করুণার চোখে দেখা হতো, সাহায্যের জন্য হাত বাড়ানোয় করুণার পাত্র মনে করা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বসভায় সম্মানিত।

দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, জনগণই সব ক্ষমতার মালিক। কাজেই লক্ষ্য জনগণকেই ঠিক করতে হবে- তারা কী চান! তারা কি দেশকে সামনে এগিয়ে যাওয়া দেখতে চান, না আবার পেছনের দিকে চলুক-সেটাই দেখতে চান? একবার ভাবুন তো, মাত্র ১০ বছর আগে দেশের অবস্থান কোথায় ছিল? মানুষ কি চায় না তাদের সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হোক? প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে যাক? প্রতিটি গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হোক? মানুষ কি চায় না, সবাই দু’বেলা পেট পুরে খেতে পাক? শান্তিতে জীবন-যাপন করুক?

দৃঢ়কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। বাংলাদেশ আর দরিদ্র হিসেবে পরিচিত হতে চায় না, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাঁচতে চায়। এই সরকার লক্ষ্য স্থির করেছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ দেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না; তবে অতীতকে ভুলেও যাব না। অতীতের সফলতা-ব্যর্থতার মূল্যায়ন করে, ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাব। উন্নয়নের যে মহাসড়ক ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে সব বাধা দূর করার দায়িত্ব নেবে।