বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা, একটি ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ

হারুন হাবীব: পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্ত স্বদেশভূমিতে ফিরে আসার ঘটনা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের আরেক আশীর্বাদ। পাকিস্তানের শাসকরা যেখানে তাকে হত্যা করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধুকে স্বসম্মানে ফিরে আসার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয় তাদেরই।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে একদিকে ছিল প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত এবং আত্মসমর্পণকৃত পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরাপদে স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ।

বলাই বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির প্রশ্নে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত ও তার নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশ। পাকিস্তান যেন বঙ্গবন্ধুর তথাকথিত বিচার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তিনি যেন স্বসম্মানে স্বদেশ ফিরতে পারেন, সে লক্ষে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে ধরনা দিয়েছেন ভারত নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। শেখ মুজিবের মুক্তিকে বাংলাদেশ সংকট সমাধানের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে গোটা বিশ্বে প্রবল প্রচারণা চালিয়েছেন শ্রীমতি গান্ধী।

এরপরও বঙ্গবন্ধুকে যখন প্রহসনমূলক গোপন বিচারে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করা হয়, তখন ১১ আগস্ট ১৯৭১, ২৪ জন শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ব্যক্তিগত আবেদন পাঠান তিনি। ঠিক একই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণদ- দিয়ে পরিস্থিতি যেন আরও জটিল করে না তোলার জন্য পাকিস্তানকে শক্ত ভাষায় সতর্ক করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের প্রধান প্রধান সরকার প্রধানদের কাছে অতি-গুরুত্বপূর্ণ যে বার্তাটি প্রেরণ করেন তা এ রকম : ÒGovernment and people of India as well as our Press and Parliament are greatly perturbed by the reported statement of President Yahya Khan that he is going to start secret military trial of Mujibur Rahman without affording him any foreign legal assistance. We apprehend that this so-called trial will be used only as a cover to execute Sheikh Mujibur Rahman. This will aggravate the situation in East Bengal and will create a serious situation in India because of the strong feelings of our people and all political parties.

হোয়াইট হাউসে শ্রীমতী গান্ধী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন ৪ নভেম্বর ১৯৭১, যে বৈঠকের মূল প্রসঙ্গ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়। নিক্সন ও কিসিঞ্জার বিলক্ষণ অনুধাবন করেন ইন্দিরা গান্ধীকে বাগে আনা যাবে না, বাংলাদেশ প্রশ্নে তিনি এক চুলও ছাড় দেবেন না। কার্যত বাংলাদেশ প্রশ্নে লাগাতার চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং ওয়াশিংটনের দুর্ভাগ্যজনক পাকিস্তানপন্থি কৌশলগুলো অকার্যকর পরিণত করেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী।

তার যুক্তি, দৃঢ়তা এবং বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ফলে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্ররোচনা সত্ত্বেও চীন ভারত আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে। চীনের এই নিষ্ক্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ ভারতের মাটিতে আক্রমণ চালানো হলে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির ধারামতে মস্কো ভারতের পক্ষ অবলম্বন করবে, যা মঙ্গল বয়ে আনবে না।

এদিকে মুক্তিবাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে পাকিস্তান বাহিনী ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত হতে থাকে। ৩ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিম অংশে পাকিস্তান আকস্মিক আক্রমণ চালালে যুদ্ধ পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সামরিক কমান্ড’। সেদিন থেকেই হানাদার বাহিনীর ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালাতে থাকে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথবাহিনী। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের দুতিয়ালীতে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক বসে।

সেই বৈঠকে ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর করার প্রস্তাব আনা হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুবার ‘ভেটো’ প্রদান করে প্রস্তাবটিকে অকার্যকর করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভেটো’ পাকিস্তানের দ্রুত পরাজয় এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে যৌথবাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ পাকিস্তান বাহিনী দ্রুত পরাজয় বরণ করতে থাকে এবং তারা আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তান বাহিনী মুক্ত ঢাকায় লাখো মানুষের আকাশ ফাটানো ‘জয় বাংলা’ ধ্বনির মধ্যে আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ পরিপূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়। ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস তাদের সরকারের কাছে দুটি সুপারিশ পাঠায়। একটি, দ্রুত বাংলাদেশ সরকারকে মেনে নেওয়া এবং অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে পাকিস্তান সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা।
ইন্দিরা গান্ধী বিলক্ষণ অনুধাবন করেন যে, পাকিস্তান কেবল পরাজিতই নয় দেশটির প্রায় ১ লাখ সৈন্য বাংলাদেশ-ভারতের মাটিতে বন্দী, কাজেই বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই তার সামনে।

কাজেই ১৬ ডিসেম্বর লোকসভায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক খবরটি যখন তিনি দেশবাসীকে জানান তখন ভারত নেত্রী বলেন : We hope and trust that the Father of this new nation, Sheikh Mujibur Rahman, will take his rightful place among his own people and lead Bangla Desh to peace, progress and prosperity.

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসে বুধবার, ডিসেম্বর ২২, ১৯৭১। শত্রুমুক্ত ঢাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা এসে পৌঁছলে হাজার হাজার মানুষ তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা জানায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়; কিন্তু সেই স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। বিশ্বের সকল প্রধান গণমাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বন্দিত্ব নিয়ে ব্যাপক প্রচার চলতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান এ ব্যাপারে প্রখর নীরবতা অবলম্বন করে।

বলাই বাহুল্য, ঢাকার মাটিতে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। আত্মসমর্পণের চার দিন পর, ২১ ডিসেম্বর, প্রথমবারের মতো শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হবে বলে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা দেন। কিন্তু কবে, কখন এসবের কিছুই জানানো হয় না।

৯ মাসের বন্দিজীবন শেষে বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। সেদিনই পাকিস্তান ইন্টারনেশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ)-এর একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছেন। বিমানবন্দরে জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানান বলে রেডিও পাকিস্তান খবর প্রচার করে। একই দিন তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকায় এক ভাষণে বলেন, ভুট্টো যদি তার পাকিস্তানকে রক্ষা করতে চায় তা হলে অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুকে স্বসম্মানে ঢাকায় ফেরত পাঠাতে হবে।

৮ জানুয়ারি লন্ডনের ক্লারিস হোটেলের এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ভাষণ দেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক ও রাষ্ট্রপতি। সেই ভাষণে তিনি বাংলাদেশকে এক Unchallengeable Reality বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি যখন পাকিস্তানের কারাগারে ‘কনডেম্ড সেলে’ ফাঁসিতে ঝুলবার অপেক্ষায় ছিলাম, বাংলাদেশের মানুষ তখনো আমাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে।” এই সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোলান্ডসহ পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সকে বাংলাদেশের সমর্থনে দাঁড়াবার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ধন্যবাদ জানান বঙ্গবন্ধু।

লন্ডনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা অবস্থানের সময় বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৯ জানুয়ারি হিথরো থেকে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিশেষ বিমানে ঢাকার পথে যাত্রা করেন তিনি। ১০ জানুয়ারি তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করেন। বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী-সহ মন্ত্রিসভার সকল সদস্য ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশের জাতির পিতাকে ঐতিহাসিক অভ্যর্থনা জানান। ২১ বার গান স্যালুটের মধ্য দিয়ে তাকে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানানো হয়, ওড়ানো হয় বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় পতাকা। বাজানো হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত।

বঙ্গবন্ধুকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি মন্তব্য করেন, The emergence of independent Bangladesh is itself a unique event in the annals of democratic movements in world history. You have truly been acclaimed the Father of the new nation, Bangladesh. উত্তরে বঙ্গবন্ধু ভারতের জনগণ, সরকার, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।

প্রায় সকল বিশ্ব সংবাদপত্রে পরদিন প্রায় একই ধরনের শিরোনাম হয়Ñ A WELCOME DELHI WILL REMEMBER| একটি পত্রিকা লেখে : The Sheikh, looking slightly weary after his journey from Nicosia, was greeted with full-throated cries of “Sheikh Mujibur Rahman Zindabad” and “Long live Mujib” as he climbed down the steps from the RAF aircraft which brought him here (New Delhi).
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকায় পৌঁছেন বঙ্গবন্ধু।

পাকিস্তানের কারাগারে থেকেও যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের যিনি রাষ্ট্রপতি, সেই প্রাণপ্রিয় নেতাকে মুক্ত স্বদেশে স্বাগত জানায় লাখো উদ্বেলিত মানুষ। সব রকমের নিরাপত্তা বেষ্টনি উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ঢুকে পড়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমানটি থামার পর তাকে ঘিরে রাখে উদ্বেলিত জনতা, একজন নবীন সাংবাদিক হিসেবে যা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

মাটিতে অবতরণ করার আগে বঙ্গবন্ধু বিমানের জানালা দিয়ে তার প্রাণপ্রিয় ‘সোনার বাংলা’ দেখেন, মুক্ত স্বদেশ দেখেন, যাকে পরাধীনতা থেকে মুক্তি দিতে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গোটা মুজিবনগর মন্ত্রিসভা, মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব, শীর্ষ ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ লাখো মানুষ বঙ্গবন্ধুকে স্বদেশের মাটিতে আবেগময় অভ্যর্থনা জানান। এরপর মোটর শোভাযাত্রায় তিনি রমনা রেসকোর্সে পৌঁছেন, যেখানে ৭ মার্চ ১৯৭১ ঐতিহাসিক ভাষণ রাখেন তিনি।

পরদিন, অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার বৈঠক বসে। সেই বৈঠকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধু দেশকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পথে ধাবিত করেন। ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমাকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা। বাংলার এক কোটি লোক প্রাণভয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের খাবার, বাসস্থান দিয়ে সাহায্য করেছে ভারত। আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, ভারত সরকার ও ভারতবাসীকে আমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে জানাই কৃতজ্ঞতা।

বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দান ও সহযোগিতা দানের জন্য ব্রিটিশ, জার্মান, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন জনগণকেও আমি ধন্যবাদ জানাই।” তিনি আরও বলেন, “ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। বাঙালিরা একবারই মরতে জানে। তাই বলেছি, ক্ষমা চাই না। তাদের বলেছি, তোমরা মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।… ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আমি চিনি। তাঁকে আমি জানাই আমার শ্রদ্ধা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আমার মুক্তির জন্য আবেদন করেছেন।”

পাকিস্তানের সামরিক আদালতে যে বিচার প্রহসন চালানো হয়েছিল, হত্যার চেষ্টা হয়েছিল, সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ডেভিড ফ্রস্টের সাথে তার বহুলালোচিত সাক্ষাৎকারে স্ববিস্তারে বলেন : দেশদ্রোহিতা, পাকিস্তান ও তার সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও পাকিস্তানের পূর্ব অংশকে স্বাধীন করা সহ ১২টি অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। ফাঁসিতে ঝুলানোর সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি এও বলেন, কারাগারের পাশেই তার কবর খোঁড়া হয়েছিল।

ভারতে প্রথম রাষ্টীয় সফরে যান বঙ্গবন্ধু ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে ভারতের সর্বস্তরের মানুষ ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। মঞ্চে উপবিষ্ট ইন্দিরা গান্ধীকে লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আপনাকে মোবারকবাদ জানাই বেশী করে শ্রীমতী গান্ধী, আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়েছিল, আমাকে ফাঁসি দেবার জন্য তারা সমস্ত কিছু ঠিক করে ফেলেছিল, আমি জানি আপনি দুনিয়ার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। আপনি দেশে দেশে ঘুরেছেন, আমার দুখী মানুষের জন্য, ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য। সেজন্য আপনাকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

১৯৭২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন সেদিন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন একই দিনে। সেদিনকার রেসকোর্স ময়দানে ভারত নেত্রী বলেন, I salute the gallant men who have fought this battle, for it is their sacrifice and courage that has brought you freedom. মিসেস গান্ধী আরও বলেন, Today is specially auspicious, because it is the birthday of the leader of your nation, who suffer from injustice or from tyranny. To Sheikh Mujibur Rahman. I offer congratulations and good wishes on my own behalf and on behalf of the Government and the entire people of India..

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নেতৃত্ব গ্রহণের ঘটনাটি ছিল জাতীয় ইতিহাসের আশীর্বাদ। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ সংকট দূর হয়, মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সংবরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি দ্রুত সম্পন্ন হয়, যা যুদ্ধ-পরবর্তীকালের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারই আহ্বানে মাত্র দুই মাসের মাথায় ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে নতুন যাত্রাপথ নির্মিত হয়। একের পর সুচিন্তিত পদক্ষেপে তিনি নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে স্বচেষ্ট হন, শুরু করেন তার ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’, যার সফল বাস্তবায়ন ঘটেনি। তারই নেতৃত্বে চীনসহ কিছু রাষ্ট্রের প্রতিরোধ উপেক্ষা করে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপ্রাপ্তী ঘটে, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এবং ‘ওআইসি’ বা বিশ্ব ইসলামি জোটের সদস্য হয় বাংলাদেশ।

কিন্তু স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা বসে থাকে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হয় ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করা হয়। বলা যায়, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকেই স্বাধীনতার শত্রুরা নতুন রাষ্ট্র ও তার জনককে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। তারই পরিণতি ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকা-ের মাধ্যমে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক