সাজানো নাটকের মাধ্যমে এবি ব্যাংকের অর্থ পাচার

নিউজ ডেস্ক: সাজানো নাটকের মাধ্যমে এবি ব্যাংকের ২ কোটি ডলার বা ১৬৫ কোটি টাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। নাটকটি সাজান ব্যাংকের গ্রাহক ও আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক। এতে দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেন ব্যাংকের সাবেক একজন চেয়ারম্যান, দু’জন এমডিসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অর্থ আত্মসাতের নাটকীয় ঘটনা।

দুদক সূত্র জানায়, দুবাইয়ের একজন দালালের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক কোম্পানিতে বিনিয়োগের নামে অর্থ আত্মসাৎ নাটকের স্ট্ক্রিপ্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হককে অবহিত করা হলে তিনি তা লুফে নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন ও দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে ১৬৫ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, সাবেক এমডি মো. ফজলুর রহমান, আরেক সাবেক এমডি শামীম আহমেদ চৌধুরী, গ্রাহক সাইফুল হকসহ উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা। বিনিয়োগের বিষয়টি ছিল পুরো সাজানো।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, সাইফুল হক রাজধানীর মতিঝিলে এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন ২০১৩ সালের অক্টোবরে। সাইফুলের সঙ্গে ছিলেন তার বন্ধু দুবাইয়ের নাগরিক খুররম আবদুল্লাহ। বৈঠকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক তহবিল সংগ্রাহক ও বিনিয়োগ কোম্পানি পিনাকল গ্লোবাল ফান্ডে (পিজিএফ) বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এবি ব্যাংকের ২ কোটি ডলার ও পিনাকলের ৮ কোটি ডলার মিলিয়ে ১০ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করে বিনিয়োগ হবে বলে জানানো হয়। বিনিয়োগ থেকে এবি ব্যাংকের ৮ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়ার কথা।

বৈঠকের পর ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে এবি ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি টিম দুবাই সফর করে। টিমের অন্য দুই সদস্য ছিলেন ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ আফজাল হাসান উদ্দিন ও ট্রেজারি শাখার প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাদের বৈঠক, দুবাই সফর, চুক্তি করাসহ সব কাজই ছিল লোক দেখানো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খুররম এবি ব্যাংকের ২ কোটি ডলার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে (এডিসিবি) চেংবাও নামে এক কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলেন। পাঠানোর পরপরই ‘পে-অর্ডারে’র মাধ্যমে ওই টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়। পরে হিসাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বলা হয়েছিল, চেংবাও পিজিএফের একটি সহযোগী কোম্পানি। প্রকৃতপক্ষে চেংবাও পিজিএফের সহযোগী কোম্পানি নয়। উভয়ের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কও নেই। কোম্পানি দুটির উদ্যোক্তাদের মাঝে কোনো পরিচয়ও নেই। দুদক কর্মকর্তারা জানান, এসব ছিল উভয় পক্ষের পরিকল্পিত নাটক। খুররমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছুই যাচাই করা হয়নি। পিজিএফের সঙ্গে খুররম আবদুল্লার কোনো ধরনের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব সম্পর্ক ছিল না।

জানা গেছে, এবি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ২ কোটি ডলার চেংবাওয়ের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এবি ব্যাংক ও পিজিএফের মনোনীত প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি যৌথ হিসাবে টাকা পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। দুদকের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, চেংবাওয়ের অ্যাকাউন্টের মালিক ছিলেন খুররমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুস সামাদ। এই আবদুস সামাদ বর্তমানে কানাডায় বাস করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক বলেন, এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যখন একটি তহবিল বিনিয়োগে তার সহায়তা চেয়েছিলেন তখন তাদের বলেছিলেন, দুবাইতে এ রকম কোম্পানি আছে যেগুলোতে বিনিয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি স্থানীয়ভাবে কারও প্রতিনিধি ছিলেন না। ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে এক বৈঠকে তার দুবাইর বন্ধু খুররম আবদুল্লাহ ছিলেন বলে স্বীকার করেন। ২০ মিলিয়ন ডলার এডিসিবি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে পাঠানো ও সেই অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাতের পেছনে তার কোনো ভূমিকা নেই বলে জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়। এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতিবেদনটি দুদকে পাঠানো হয় গত নভেম্বরের শেষ দিকে। পরে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান অভিযোগটির অনুসন্ধান শুরু করেন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। অনুসন্ধানকালে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত সব ধরনের নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। জালিয়াতিপূর্ণ ওইসব নথিতে সাবেক ওই চেয়ারম্যান, এমডিসহ অন্য কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর রয়েছে।