শত বাধা পেরিয়ে পিএসসিতে জিপিএ ৫ পেল সুমাইয়া

রাউজান প্রতিনিধি: বাঁশের বেড়ার ঝুপড়ি ঘর। ঘরটিও নিজের নয়। অন্যের মহানুভবতায় সেখানে আশ্রয় পেয়েছেন দিনমজুর মো. মাঈনুদ্দিন। অভাব-অনটনের সংসার।

তাই অন্যের বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন তাঁর স্ত্রী মর্জিনা বেগম। তাঁদের দুই সন্তান মো. রিফাত (৮) ও সুফিয়া বেগম সুমাইয়া (১১)।

মা-বাবার দুঃখের সংসারে আলো জ্বালিয়েছে সুমাইয়া। সে এবারের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (পিএসসি) জিপিএ ৫ পেয়েছে। সুমাইয়া রাউজান পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের বড় ঠাকুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ওই স্কুল থেকে এবার মাত্র চারজন জিপিএ-৫ পায়।

তাদের মধ্যে তিনজনই সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তান। ব্যতিক্রম শুধু সুমাইয়া। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়ে শত বাধা জয় করে জিপিএ ৫ পেয়ে পুরো বড় ঠাকুরপাড়া গ্রামে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সুমাইয়া। তাঁর এ সাফল্যে পরিবার, স্কুল ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক, প্রতিবেশীসহ সবাই আনন্দে উদ্বেলিত।

বাবা-মায়ের অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া কতটুকু পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে চিন্তিত সুমাইয়া। তবে সুমাইয়ার ‘পণ’ সে লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। সে লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে আইনজীবী হতে চায়। সুমাইয়া বলেছে, ‘পড়ালেখা করে আমি মানুষকে আইনগত সহায়তা দিতে চাই।

’অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা সুমাইয়া শুধু পিএসসিতে নয়, মেধার স্বাক্ষর রেখেছে প্রতিটি ক্লাস এবং বার্ষিক পরীক্ষায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিউ মুৎসুদ্দী জানান, পঞ্চম শ্রেণির ৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে তার রোল নম্বর এক। এছাড়া অন্য সব শ্রেণিতেও প্রথম ছিল।

সুমাইয়ার বাবা বলেন, ‘সুমাইয়া শুরুতে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়ত। সেখানে খরচ চালাতে না পেরে তাকে বড় ঠাকুর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পরও মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করিনি। আমার শরীওে শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত মেয়েকে পড়ানোর ইচ্ছা আছে। মেয়েরও পড়ার বেশ আগ্রহ আছে।

সে আইনজীবী হতে চায়। দেখি আল্লাহ কি করেন।’তিনি আরো জানান, সুমাইয়া ও তার ছোট ভাই রিফাতকে দুঃখে-কষ্টে পড়ালেখা করাতে হচ্ছে। রিফাতকে মাদরাসায় ভর্তি করেছি। সুমাইয়াকে গত রবিবার পূর্ব গুজরা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে গিয়ে অর্থের অভাবে পারিনি।

সোমবার স্কুলের ফরম পূরণ বাবদ ১০০ টাকা জোগাড় করে স্কুলে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ের সভাপতি সাংবাদিক তৈয়ব চৌধুরীর সুপারিশে সুমাইয়াকে ওই স্কুলে ভর্তি করানো হয়।‘দুই সন্তানের লেখাপড়া কতটুকু চালিয়ে নিতে পারব জানি না, তবে কেউ যদি তাদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেন, তাহলে আমি খুব উপকৃত হব।’জানা যায়, সুমাইয়াদের বাড়ি হাতিয়া উপজেলার উচখালী এলাকায়।

১০ বছর আগে বাবা মো. মাঈনুদ্দিন কর্মসূত্রে (দিনমজুর) রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের বড় ঠাকুর পাড়া গ্রামের ফজল করিম ফোরম্যানের বাড়িতে আশ্রয় পান। ওই বাড়ির আবু তাহেরের পুরাতন বাঁশের বেড়ার ঘরটিতে পরিবারের চার সদস্যের বসবাস।

সুমাইয়া জানায়, পরিবারে অভাবের কারণে মাঝে মাঝে স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি, প্রাইভেট শিক্ষকের বেতন সময়মতো দেওয়া সম্ভব হতো না। মা-বাবার কাছ থেকে কখনো শখের বেশি কিছু চাইনি।বড় ঠাকুর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাংবাদিক তৈয়ব চৌধুরী বলেন, ‘সুমাইয়ার লেখা পড়ায় খুবই ভাল। তার ফলাফলেও আমরা খুবই খুশি। তার ভবিষ্যত লেখাপড়ার জন্য যা যা করতে হয় তাই আমি করব ইনশাহআল্লাহ।

প্রিন্স, ঢাকা