উৎসবে বাধা পুরোটাই ধাঁধা

শান্তনু চৌধুরী:  পুরনো বছর চলে যায়, রেখে যায় হাজারো স্মৃতি, হাজারো মায়া। সেখানে প্রাপ্তির আনন্দ থাকে, হারানোর বেদনা থাকে। জীবনের কষ্টের সুর থাকে। তবে এ কথা ঠিক যে, মুখে যতই বলি যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। কিন্তু আমরা প্রত্যাশা করি আগামী দিনটা যাতে ভালো হয় এবং সত্যি সত্যি ভেবে বসি, যাই হোক, গেল বছরে যা হওয়ার হয়েছে, এ বছর আরও ভালো হবে।

সে হিসেবে অনেকের মনে অনেক ভাবনা এসে ভর করে। কেউ কেউ নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখে, নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে। অথবা বদলে যাওয়ার, বদলে দেওয়ার স্বপ্নও দেখে। সেই স্বপ্নের শুরুটা কেউ কেউ করতে চান একটু অন্যভাবে। বছরের প্রথম দিনটা উদযাপন করতে যান হেসে, খেলে আনন্দ আয়োজনে। কিন্তু সেখানেও যেন কয়েক বছর ধরে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্র। বিষয়টি একটু খোলাসা করেই বলি।

থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে উন্মুক্ত স্থানে সমাবেশ, গানবাজনা, আতশবাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল ডিএমপির নিরাপত্তা ও ট্রাফিকসংক্রান্ত সমন্বয় সভায় এ তথ্য জানান ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, খ্রিস্টীয় নববর্ষ উপলক্ষে কোনো উন্মুক্ত স্থানে বা বাড়ির ছাদে কোনো সমাবেশ বা গানবাজনার আয়োজন করা যাবে না এবং কোনোভাবেই আতশবাজি পোড়ানো যাবে না।

৩১ ডিসেম্বর রাত ৮টার মধ্যে গুলশান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থানরত বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে হবে। আর স্থানীয়দেরও রাত ৮টার মধ্যে নিজ এলাকায় প্রবেশ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাত ৮টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হবে না। হেঁটে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইডি কার্ড দেখাতে হবে। তিনি এও বলেছেন, যদি কেউ চার দেয়ালের মধ্যে নববর্ষ উদযাপন করতে চান, তাতে কোনো বাধা নেই। তবে অনুষ্ঠানের আগেই পুলিশকে জানাতে হবে। সামনে দেখা যাবে, বিয়েশাদি, খতনাসহ সামাজিক বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানও পুলিশের অনুমতি নিয়ে করতে হবে।

আরও এক কাঠি সরেস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটে গুলশান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কিছু মানুষ খামোখাই হইচই করে। যাতে বাইরে কোনো জায়গায় কেউ একত্র না হতে পারে এবং গুলশান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাতে যাতে কেউ খামোখাই হইচই না করে, সে বিষয়েও আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ কেন এমন বিধিনিষেধ বাড়ছে, এর জবাব দিতে গেলে মন্ত্রীরা প্রায়ই বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে। যাতে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। এখন কথা হলো দ্বার বন্ধ করে দিয়ে কি মিথ্যাটা রোখা যায়। প্রায় এক দশক ধরে থার্টি ফার্স্ট নাইটের অনুষ্ঠান উন্মুক্ত স্থানে করতে দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে আর কতদিন।

হোলি আর্টিজান হামলার বছর থেকে এই নজরদারি যেন আরও বেড়েছে। সেদিন সাংবাদিকরাও জানতে চেয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এমন আর কত বছর চলবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্তরটা ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। তাই এখানে উল্লেখ করলাম না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তার অজুহাতে মানুষকে বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। গ্লোবালাইজেশনের পার্টে থাকতে চাইলে থার্টি ফার্স্টেও বাংলাদেশকে উৎসবমুখর রাখা উচিত।

শুধু মুখে উদার দেশ বললে হয় না। কাজের মধ্যেও সেটা দেখাতে হয়। ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। এতে কূপম-ূকরা উৎসাহ পান। কট্টরপন্থিরা ভাবেন তাদের জয় হয়েছে। হ্যাঁ, যুক্তি থাকতে পারে, আমাদের হাজার বছরের যে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস তাতে থার্টি ফার্স্ট নাইট বলে কিছু ছিল না। বাঙালি সংস্কৃতিতে যারা আমাদের আদর্শ, যারা আমাদের নমস্য, সেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, মুহম্মদ কুদরাত-ই-খুদা, জয়নুল আবেদিন হয়তো আমাদের সেটি দিয়ে যাননি।

কিন্তু যদি কোনো একটি বিষয়ের উপযোগিতা থাকে, তবে তা আমরা কেন যোগ করব না। যদি তা আনে উন্নত বাঙালি সংস্কৃতিতে উৎকর্ষ ও সৌন্দর্য। খ্রিস্টীয় নববর্ষ উদযাপন আমাদের সংস্কৃতি কিনা, সে বিতর্কে যাব না। কারণ সংস্কৃতি আদান-প্রদানের বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর বিবর্তন ঘটে। একটা দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের যদি সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরি হয়, সেটা নিশ্চয় খারাপ কিছু নয়। তা ছাড়া এখন সারা পৃথিবীতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এসব যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার থেকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র সাংস্কৃতিক চর্চা।

এখন বিনোদনের কোনো বিষয় গ্রহণ বা বর্জন ব্যক্তির নিজস্ব। সেখানে বাধা দিলেই বরং সর্বনাশ ঘটবে। সরকারের উচিত, যে কোনো আয়োজনে সঠিক নিরাপত্তা দেওয়া। এখন সেটা না করে উল্টো নিরাপত্তার অজুহাতে সবকিছুকে এমনভাবে গৃহবন্দি করে ফেলা হচ্ছে, যাতে মানুষ নিজস্ব আনন্দ উৎসব করতেও ভয় পাচ্ছে। কথায় বলে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। অতিরিক্ত নিরাপত্তা এমন এক ভীতিকর অবস্থা তৈরি করেছে, যাতে মানুষ সে পথ মাড়াতে ভয় পায়। একসময় টিএসটিতে কত হইচই-আনন্দ হতো। এখন সবাই বাসায় বসে থাকে।

গেল বছরও খ্রিস্টীয় নতুন বছরের প্রথম ক্ষণ উদযাপনের রাশ টেনে ধরা নিরাপত্তা কড়াকড়িতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মন্ত্রণালয়ের একদল কর্মকর্তা মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানানোর পর মুহিত বলেছিলেন, ‘আমরা পহেলা বৈশাখ অত্যন্ত ধুমধাম করে উদযাপন করি। ওই দিন সরকারি ছুটিও। তবে আমরা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করি।

সুতরাং দ্যাট ডে ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট। কালকে (২০১৬-এর থার্টি ফার্স্ট নাইট) সাড়ে ৮টা-৯টার সময় সারা দেশ স্তব্দ। মরা ডেড সিটি গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ। এই নববর্ষ পালন মন্দ না যে, আমি এই বছরটা এভাবে চালাব, এটা করব, সেটা করব।’ মানুষের উদযাপনে বাধা তৈরি করতে পারে, এমন নিরাপত্তাব্যবস্থারও সমালোচনা করেছিলেন তিনি। আরও এক বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং যেন নিষেধের বেড়াজাল বেড়েছে। এতে হয়তো একটি পক্ষ বেশ খুশি হচ্ছে।

সরকারও ভাবছে এ দেশ ইসলামিক দেশ। মুখে মুখে যতই বলি না কেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। ভেতরে ভেতরে বেশিরভাগই ধর্মান্ধ। কাজেই এদের খুশি রাখতে পারলে আখেরে ভোটের মাঠে লাভই বেশি। অনেকে অভিযোগ করে থাকেন, ওই রাতে যা হয় তা আমাদের তরুণদের বিপথগামী করছে। এ কথা ঠিক যে, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। তবে সেটি দমন করার দায়িত্বও কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।

আমি উৎসবের নামে উন্মক্ততা কখনই সাপোর্ট করি না। চাই না এমন কিছু হোক, যাতে দেশের সুনাম নষ্ট হয়। আবার পাশাপাশি এটাও ঠিক, যতই সংস্কৃতি চর্চা বাড়বে, ততই মানুষ আনন্দে থাকবে। এই যে ভোরবেলা মানুষ পার্কে বা মাঠে ব্যায়াম করার সময় ‘হা হা’ করে হাসে। এর কারণ হলো যাতে সুস্থ থাকা যায়। মানে মানুষ আনন্দের মধ্যে থাকলে সুস্থ থাকে। আর সুস্থ মন হলে স্বাস্থ্যও সুস্থ থাকে। এই আনন্দ থেকে নিশ্চয় রাষ্ট্র আমাদের বঞ্চিত করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে, এসব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। এ কথা ঠিক যে, এসব বিধিনিষেধের বেড়াজাল শুধু মধ্যবিত্তদের জন্য।

কারণ তাদের তো আর দেশের বাইরে গিয়ে আনন্দ উদযাপনের সুযোগ নেই, নেই দেশের তারকা হোটেলগুলোয় সুরা আর সাকির সঙ্গে নাচার। তাই তারা বঞ্চিত আনন্দ থেকে। সে কারণে রাত হতে না হতেই তাদের চলে যেতে হবে বাড়ির ভেতরে। আর যারা বিত্তবান তাদের চিত্ত জয় করতে হোটেলে হোটেলে, ক্লাবে ক্লাবে থাকবে ডিজে পার্টিসহ কত আয়োজন। দেশসেরা নামিদামি মডেলরা করবেন মনোরঞ্জন। ড্রামের তালে তালে বাজবে হাল আমলের আইটেম সং। আর আমরা না হয় ‘ভুসি’ পেয়ে খুশি হব। নইলে পুলিশের ঘুষি খেতে কেই বা নামবে আনন্দ উদযাপনে।

শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক