ফলাফল ফাঁসে জড়িত শিক্ষক-কর্মচারী

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: নগরীর ‘ক’ ক্লাস্টারভুক্ত তিন সরকারি স্কুলের (কলেজিয়েট, ডা. খাস্তগীর ও বাকলিয়া-বালক) ভর্তি পরীক্ষা গত ১৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। ঐদিন সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ৫ম, ৭ম ও ৮ম শ্রেণির এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৬ষ্ঠ শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা স্কুল ও বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের (বালক) ৫ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ২১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু জেলা প্রশাসক স্বাক্ষর করার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে ফলাফল। এরই প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন তদন্ত করে ফলাফল ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে। সেই তদন্তে স্বয়ং কলেজিয়েট স্কুলের দুই শিক্ষক, দুই কর্মচারী ও কথিত কোচিং সেন্টারের দুই পরিচালকের নামও এসেছে।

এদিকে, ‘ক’ ক্লাস্টারভুক্ত তিনটি স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে বলে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকদের মতে- ‘ক’ ক্লাস্টার ভুক্ত নগরীর ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভর্তির ফলাফলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম উত্তীর্ণ হয়েছে।

অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আবেদনের জন্য প্রশাসনের কাছে যোগাযোগ করলেও বিভিন্ন অজুহাতে তা নাকচ করে দেয়া হয়। ফলে পরীক্ষার খাতা মূল্যয়ান ও ফল প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগটি আরো বদ্ধমূল হয় বলে জানান অভিভাবকগণ। নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন অভিভাবক সাংবাদিকদের জানান, তাদের মেয়ে নগরীর ভালো ভালো স্কুল থেকে ডা. খাস্তগীর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজিয়েট স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফলে তাদের সন্তানেরা ৯৫ নম্বর এর কম পাওয়ার কথা নয়। অথচ ফলাফলে তাদের সন্তানদের রোল নম্বর আসেনি।

বিভিন্ন মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন দ্রæত ফল প্রকাশ করতে গিয়ে খাতা মূল্যায়ন কিংবা ফলাফলের যোগ-বিয়োগের ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে, তেমনি কোন কোন উত্তরপত্র হারিয়ে ও গেছে। এদের ক্ষেত্রে মনগড়া নম্বর দেয়া হয়েছে। মূলত এ কারণেই স্কুল দু’টির ফলাফলে হ য ব র ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যারা ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে চাই তাদের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হলে আসল সত্য বের হয়ে আসবে বলেও দাবি করেন অভিভাবকগণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ হাবিবুর জানান, প্রতিবছর ভর্তির পরীক্ষার পর অভিভাবকদের কেউ না কেউ পরীক্ষার ফল নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে চায়। সরকারি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার নীতিমালায় খাতা বা উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের কোন সুযোগ নেই। তাই তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাও সম্ভব হয় না। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে কোন ধরনের অনিয়ম হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর হওয়ার আগেই ফলাফল ফাঁস হওয়ায় বিষয়টি চারপাশে সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন তদন্ত করে ফলাফল ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে। সেই তদন্তে স্বয়ং কলেজিয়েট স্কুলের দুই শিক্ষকের নামও এসেছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন ও সহকারী শিক্ষক (গণিত) আনিছ ফারুক এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে জেলা প্রশাসনের তদন্তে।

পাশাপাশি স্কুলের উচ্চমান সহকারী মো. ফারুক আহমেদ ও কম্পিউটার অপারেটর রিদুয়ানুল হককেও ফলাফল ফাঁসের জন্য দায়ী করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া কথিত ‘বাবলা স্যার কোচিং সেন্টারের’ পরিচালক বাবলা দে ও মামুন কোচিং সেন্টারের পরিচালক মামুনও এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে প্রশাসনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন স্কুলের কম্পিউটার অপারেটর রিদুয়ানুল হককে বরখাস্ত করেছে এবং স্কুলের চার শিক্ষক-কর্মচারীসহ দুই কোচিং সেন্টারের পরিচালকের বিরুদ্ধে গতরোববার (২৪ ডিসেম্বর) সদরঘাট থানায় মামলা করেছে জেলা প্রশাসন। যার মামলা নম্বর ২৩। জেলা প্রশাসনের এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বলা হয়, জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরের আগেই ফলাফল প্রকাশের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ফলাফল প্রক্রিয়াকরণের পর জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরের জন্য উক্ত কেন্দ্র থেকে নিয়ে আসা হলে উক্ত কেন্দ্রের কম্পিউটারে সংরক্ষিত সফ্ট কপি পুনরায় প্রিন্ট করে শিক্ষক-কর্মচারী ও কতিপয় অভিভাবকের সহায়তায় কথিত ‘বাবলা স্যার কোচিং সেন্টার’ এর পরিচালক বাবলা দে দে’কে সরবরাহ করা হয়।

এছাড়া অপর কথিত ‘মামুন কোচিং সেন্টারের’ পরিচালক মামুনের সহায়তায় বাবলা দে ভর্তি পরীক্ষার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কলেজিয়েট স্কুলের কম্পিউটার অপারেটর রিদুয়ানুল হককে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন, সহকারী শিক্ষক (গণিত) আনিছ ফারুক ও উচ্চমান সহকারী মো. ফারুক আহমেদের এ অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।