ছাত্ররা পরীক্ষায় ফেল করে কেন?

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী:  মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় নানা প্রবন্ধ লিখেছেন।

১৯৫২ সালে সংবাদ-এ ছাপা হয়েছিল তাঁর লেখা: ‘আমাদের শিক্ষা সমস্যা: ছাত্ররা পরীক্ষায় ফেল করে কেন?’ আজ থেকে ৬৫ বছর আগে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী যে সমস্যা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, আজও আমরা সেটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলবদর, রাজাকাররা যদি তাঁর মতো গুণীজনদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা না করত, কে জানে, আজ হয়তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা অন্য রকম হতো। আগ্রহী পাঠকেরা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচনাবলী সংগ্রহ করে প্রয়াত এই বুদ্ধিজীবীর লেখাগুলো পড়তে পারেন।

পরীক্ষা পাসের হার যাতে বাড়ে, তার জন্য, সত্যি সত্যি ছাত্র ও শিক্ষকদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। তার জন্য ছাত্ররা ‘সাজেশন’ ও পরীক্ষায় প্রশ্নোত্তর খুঁজতে খুঁজতে প্রাণান্ত এবং শিক্ষকেরাও ‘নিশ্চিত পাস’ (সিওর-সাকসেস) পরীক্ষা সহজ উপায় (মেড-ইজি), পাঠ্য-পুস্তক হজমি (digest) প্রভৃতি পরীক্ষা পাস বটিকা সেবন করিয়ে পরীক্ষা ফেল রোগের উপশমের চেষ্টায় নিয়ত ব্যস্ত রয়েছেন। কাজেই তাঁদের দোষ আর ত্রুটি কোথায়?

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে এই, সবাই যেটাকে মহাসমস্যা বলে সামনে দেখতে পাচ্ছেন, সেটা পরীক্ষা, লেখাপড়া নয়। যেন আসল উদ্দেশ্য, কোনোমতে শুধু পরীক্ষাটা পাস করা, লেখাপড়াটা কিছুই নয়। অন্তত সেটি গৌণ। আমাদের মূল ব্যাধি হচ্ছে এইখানে!

ছাত্ররা ও অভিভাবকেরাও হয়তো একটা জিনিস জানেন না যে, ছাত্ররা যত বেশি করে পরীক্ষা পাসের চেষ্টা করে, তত বেশি তারা পরীক্ষা ফেল করে। কথাটা শুনতে উল্টো হলেও সত্যি। কারণ, ছাত্ররা শুধু ‘পরীক্ষার পড়া’ পড়তে গিয়ে জ্ঞানের বিষয় কম পড়ে বা একেবারেই পড়ে না। তাতে করে পরীক্ষার বেলায়ও সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তারা অকৃতকার্য হয়। পরীক্ষার খাতা খুললেই দেখা যায়, শতকরা ৯৫ জন ছাত্রের বেলাতেই অন্য সব প্রশ্নের উত্তর যেমন তেমন কিন্তু রচনা বা essay লেখাতেই একেবারে কুপোকাত। কেননা, রচনাটা নিজে ভেবেচিন্তে লিখতে হয়। তাই শুনলে অবাক হবেন পরীক্ষার আগে ছেলেরা essay-এর বিষয়েও ‘সাজেশন’ চায়। অনেক শিক্ষক অম্লান বদনে বলেও দিয়ে থাকেন।

অর্থাৎ আমাদের ছাত্রদের মধ্যে শতকরা দু-একজন বাদ দিলে স্বীয় চিন্তাশক্তির এত দৈন্য যে, কল্পনা করা যায় না। পড়াটাকে কেবল পরীক্ষামুখী করতে দিয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে না বুঝে ক্রমাগত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার ফলে এই অবস্থা হয়েছে।

এখন আমাদের প্রশ্ন, ছাত্ররা পড়াশোনা না শিখে কেবল পরীক্ষা পাসের জন্য উন্মুখ কেন? তার কারণ, পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেটই আমাদের উপজীবিকার সম্বল, চাকরি বিশিষ্ট বিরাট বিরাট সৌধগুলোর কঠিন লোহার ফটক খোলার একমাত্র চাবিকাঠি। আমাদের বিদ্যা যাচাই করা হয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দ্বারা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিচারেরও সেই একই মাপকাঠি। তাই ছাত্ররাও সব ছেড়েছুড়ে কী করে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, তার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

তার ফলে দেখা যায়, বহু ছাত্র এমএ পাস করেছে অথচ কথা বলতে জানে না। ইংরেজি উচ্চারণ তো দূরের কথা, বাংলা সাধারণ শব্দের উচ্চারণ এবং অর্থও ঠিকমতো বলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে এসেছে, অথচ সাধারণ ভদ্রতাবোধ জন্মায়নি, আদব-কায়দা জানে না। কর্তব্যবোধের কথা এই নিদ্রালু, শিথিল দেহ বাংলাদেশে না-ই বললুম। আমার মনে হয়, পরীক্ষা ফেলের চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এইগুলো, আমাদের ছাত্রদের এই অযোগ্যতা।

পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে যত দিন ছাত্রদের মূল্য যাচাই চলবে, তত দিন এমনি অযোগ্য হয়েই গড়ে উঠবে। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে তারা ক্রমাগত এমনি বেশি সংখ্যায় ফেল করতেই থাকবে।

কাজেই দেখছি, পরীক্ষাই পরীক্ষা ফেলের বড় কারণ। অর্থাৎ পরীক্ষার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ না করে ছাত্রদের শিক্ষাকে কীভাবে সর্বতোমুখী (all round) করা যায়, সেইটেই আমাদের চিন্তা করে দেখতে হবে। এ সম্বন্ধে আমার যা বক্তব্য, সেটি এ প্রবন্ধের পরিসরে বলা যাবে না। পরে কখনো বলব।

দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার ও শিক্ষার বাহন আমাদের বিদেশি ভাষা। আজ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে স্বাধীন দেশে যে এ সম্বন্ধে কিছু বলবার প্রয়োজন হয়, এইটেই আমাদের পক্ষে গভীর লজ্জা ও পরিতাপের বিষয়। যেকোনো জাতির পক্ষেই শিক্ষার বাহন হতে পারে একমাত্র তার মাতৃভাষা। কেননা, বিদেশি ভাষায় প্রদত্ত শিক্ষা ছাত্ররা আত্মস্থ করতে পারে না। বিদেশি ভাষায় কতগুলো পাঠ্যবস্তু ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, তাদের ওপর ইট-পাথরের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেয়েও কষ্ট ও ক্ষতিকর। আমাদের ছাত্ররা তাদের জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো ইংরেজিতে পড়তে গিয়ে বুঝতে পারে না

ভালোমতো, লিখতে গিয়ে তো কিছুতেই কলম এগোয় না। ইংরেজিতে মনের ভাব প্রকাশ করার কথা তাদের ক্ষেত্রে ওঠেই না। কাজেই তারা ফেল করে। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি ভাষার পাষাণে মাথা ঠুকতে তাদের মাথাটিও একেবারে ঝরঝর হয়ে যায়, অর্থাৎ অমন অমূল্য চিন্তাশক্তি যেটা বিধাতার অলৌকিক দান, সেটিই হারিয়ে বসে। যেহেতু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে চিন্তা করা দরকার, ছাত্ররা তা করে না। ইংরেজি তারা শুধু পড়েই যায়, মুখস্থ করে, ইংরেজিতে তারা চিন্তা করতে পারে না; কারণ, চিন্তা মানুষ তার নিজ ভাষাতেই করে। এমনিভাবে অন্যদিকে ক্রমাগত শক্তির অপব্যয় করে এবং চিন্তাশক্তিকে উপবাসী রেখে সে শক্তিকে ছাত্ররা পঙ্গু করে ফেলে। আমাদের ছাত্রদের চিন্তাশক্তির দৈন্যের এইটেই প্রধান কারণ।

বিষয়বস্তু তো তারা ভালো রকম আয়ত্ত করতে পারেই না, উপরন্তু প্রকৃতিদত্ত স্বকীয় চিন্তাশক্তি পর্যন্ত তাদের বিনষ্ট হয়ে যায় আমাদের বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির এই গুণ। বহু ছাত্র আছে দেখতে পারেন, যাঁরা কোনো সাধারণ প্রশ্ন করলেও পুথির বুলি না আওড়ে নিজের বুদ্ধি থেকে কোনো জবাব দিতে পারবে না। যেটি একজন গ্রাম্য মূর্খ ব্যক্তিও পারবে। এটি বড় অসহনীয় অবস্থা। যে পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার বাহন বাংলা না হচ্ছে, সে পর্যন্ত এ অবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। (সংক্ষেপিত)