বিজয় দিবস : আজকের উপলব্ধি

আবুল কাসেম ফজলুল হক: ছেচল্লিশ বছর আগে এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা বিজয় অর্জন করি। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা : একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে দেশব্যাপী বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর জন্য হাহাকার। ১৯৭১ সালের ষোলই ডিসেম্বর সকাল থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ভেসে আসছিল সব্যসাচীর কণ্ঠে নজরুরের কবিতা আবৃত্তিÑ ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মোর মুখ হাসে/মোর চোখ হাসে/মোর টগবগিয়ে খুন হাসে।’ সে এক অদ্ভুত আনন্দ! নতুন রাষ্ট্র-স্বাধীন, সার্বভৌম, দীর্ঘ সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত। নতুন রাষ্ট্রের জন্য অগণিত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। স্বজন হারানো শ্মশানে নিজেদের নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আনন্দ।

তখনকার অনেক ঘটনা আছে স্মরণ করার মতো। স্মৃতিকাতরতার চাইতে ভবিষ্যতের নতুন দৃষ্টির জন্য চিন্তা অনেক বেশি মূল্যবান। বড় কিছু অর্জন করতে হলে দুনিয়ার সর্বত্র মানুষকে বড় মূল্য দিতে হয়। আমাদেরও তা দিতে হয়েছে।

স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অনেক বড় ঘটনা। আমাদের ইতিহাসে তা এক অতুলনীয় ঘটনা। তা নিয়ে আমাদের গর্ব থাকবে চিরদিন। এর মধ্যে প্রশ্ন : এই যে ছেচল্লিশটি বছর পার হয়ে গেল, তার মধ্যে আমাদের অর্জন কী? অর্জন অনেক। সারা দুনিয়ায় যে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, আমরা তার অংশীদার। আবার সারা দুনিয়ায় যে সভ্যতার সংকট চলছে, আমরা তারও অংশীদার। একদিকে প্রাচুর্য, অন্যদিকে রিক্ততা। মনের দিক দিয়ে, নৈতিক চেতনতার দিক দিয়ে মানুষ রিক্ততার দিকেÑ নিঃঙ্গতার দিকে এগিয়ে চলছে। উৎপাদন ও বৈষয়িক প্রাচুর্য বাড়ছে। যে বিজ্ঞানের কল্যাণে এত কিছু হয়েছে, সেই বিজ্ঞানের দিক থেকে সাধারণ মানুষ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহের উল্টো গতি দেখে অনেকে বলছেন ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। পুরনো, পরিত্যক্ত সব জিনিস পুনরুজ্জীবিত হয়ে চলছে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণি প্রায় শূন্য থেকে এই সময়ের মধ্যে যে সম্পত্তি অর্জন করেছে, তা অতুলনীয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তারা উপভোগ করছে। তবে তাদের কষ্টও ভোগ করতে হয়েছে। মাঝখানে একুশ বছর তারা ক্ষমতাচ্যুত ছিল। উচ্চ-মধ্যশ্রেণি, মধ্য-মধ্যশ্রেণি ও নিম্ন মধ্যশ্রেণি তীব্র প্রতিযোগিতা ও জটিল সব সমস্যার মধ্যে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নেই। সব পর্যায়েই নিরাপত্তার অভাব। অসামাজিক কার্যকলাপ দ্রুত বাড়ছে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ গণস্বার্থবিরোধী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী, রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী রূপ দিয়ে রাখা হয়েছে। শ্রমিক-কৃষকরা আগের তুলনায় খাওয়া-পরার দিক দিয়ে কিছুটা ভালো আছে। তবে তাদের কঠোর শ্রম থেকে একটুও রেহাই হয়নি। সর্বস্তরের মানুষই মানবিক গুণাবলি হারিয়ে চলছে। মানুষ বর্বরতার দিকে চলছে। নতুন সভ্যতা সৃষ্টির আকাক্সক্ষা যাদের মধ্যে আছে সমাজে তারা কোণঠাসা। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া সম্পূর্ণরূপে কায়েমি স্বার্থবাদের-প্রচলিত ব্যবস্থা রক্ষা করে চলার জন্য কাজ করছে। সমাজের কোথাও প্রগতিকামী কোনো শক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। দুনিয়াজুড়েই মানুষ পরিবর্তনবিমুখ, পরিবর্ধনবিমুখ।

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার উন্নতির জন্য নতুন চিন্তাধারা ও নতুন কর্মধারা দরকার। সংগীত, চারুকলা, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল বড় প্রতিজ্ঞার সন্ধান স্বাধীন বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। গতানুগতিক ধারায় নতুন নতুন বিষয় প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলো মানুষকে উন্নত চেতনায়, উন্নত রুচি-পছন্দে, সম্প্রীতির সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টির নামে যা কিছু পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সবই রূপ-রীতি সর্বস্ব, বিনোদনমূলক। আনন্দের প্রকারভেদ আছে। মূল আনন্দের দিকেই সবার মনোযোগ। মূল্যবোধ বিকারপ্রাপ্ত ও ক্ষয়িষ্ণু।

রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি অনেক হয়েছে এবং হচ্ছে। ঢাকা শহরে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা শহর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতিকূল। যেখানে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ লাখ লোকের বসবাস করার কথা, সেখানে লোকসংখ্যা দুই কোটির দিকে এগিয়ে চলছে। রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের-গ্রামাঞ্চলের বৈষম্য বাড়ছে। রাষ্ট্র প্রায় অর্থনীতি, প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠার প্রতিকূল। অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিশীলতার এই যুগে বাংলাদেশের সামনে উন্নতির অনেক সুযোগ আছে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। আপনিতেই হবে না। প্রস্তুতি লাগবে, চেষ্টা লাগবে, চিন্তা লাগবে, কাজ লাগবে। গতানুগতিতে হবে না।

ছাত্র-তরুণদের দেখা যাচ্ছে নিস্তেজ, আশা-আকাক্সক্ষাহীন। শিক্ষাব্যবস্থা এত খারাপ, এই নিয়ে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকদের মধ্যে মামুলি চিন্তার বাইরে কোনো চিন্তাই নেই। মৃদু আপত্তি জানিয়ে সবাই এই ব্যবস্থাই মেনে নিয়ে চলছে।

সবার উন্নতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের উন্নতি দরকার। বর্তমানে যে জনচরিত্র ও রাজনৈতিক চরিত্র বাংলাদেশে বিরাজ করছে, অতীতে তা থাকলে কখনো আমরা স্বাধীনতা-সংগ্রাম করতে পারতাম না, মুক্তিযুদ্ধ করতে পারতাম না, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম না। যে আবহাওয়া বিরাজ করছে তাতে প্রথমে আমাদের স্বীকার করা দরকার দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি। এরপর অনুসন্ধান করা দরকার সম্ভাবনার দিকগুলো। তারপর দরকার সম্ভাব্যগুলোর বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচি প্রণয়ন করা এবং তা নিয়ে কাজ করা। গতানুগতি পরিহার করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে চিন্তার ও কাজের নতুন ধারা। সভ্যতা ও প্রগতি সম্পর্কে আমাদের নতুনভাবে সন্ধিৎসু হওয়া দরকার।

বাংলাদেশকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দূরদর্শী পরিকল্পনা দরকার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার পরিপন্থী। প্রধান দুই দলের নেতারা জাতীয়তাবাদের ঘোষণা নিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য ধরনা দিতে যান সাম্রাজ্যবাদী সব রাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাসগুলোয়। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে চলে যান। আঠারো শতকে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে এ ধরনের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে দেশটাকে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল ইংরেজদের হাতে। ঘসেটি বেগম, মীরজাফর, ইয়াবলতিফ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠদের কথা স্মরণ করে সবারই সতর্ক হওয়া দরকার।

অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, স্বাধীতার ছেচল্লিশ বছর পর আজ আমাদের স্মৃতিতে ভাসছে মীরজাফরদের কথা। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই মীরজাফরদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগের লোকদের সাবধান থাকতে বলতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা খুব বলা হয়। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি একটুও শ্রদ্ধাশীল নয় তারাও জোরগলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রচার করেন। খারাপ থেকে ভালোর দিকে ওঠার উপায় আমাদের সন্ধান করতে হবে।

আজ বিজয়ের ছেচল্লিশ বছর পর আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি স্বাধীনতা সংগ্রামের ও মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতাদের। স্মরণ করছি শহীদদের।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক