বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়বই

তোফায়েল আহমেদ:  বছর ঘুরে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে অনেক স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। ‘৭১-এর ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্তরূপ অর্জন করে। পরদিন ৪ ডিসেম্বর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যৌথভাবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জনে চিঠি লেখেন।

চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, ‘যদি আমরা পরস্পর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ করি, তবে পাকিস্তান সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আমাদের যৌথ অবস্থান অধিকতর সহজতর হয়। অবিলম্বে ভারত সরকার আমাদের দেশ এবং আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করুক।’ ৬ ডিসেম্বর সোমবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত সরকার স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গৃহীত রাষ্ট্রের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ উদ্ধৃত করে লোকসভার অধিবেশনে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত হবে।”

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও মুজিববাহিনীর জন্য ৭ ডিসেম্বর ছিল এক বিশেষ দিন। এদিন মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চল যশোর হানাদারমুক্ত হয়। সেদিন সরকারের নেতৃবৃন্দ ও মুজিব বাহিনীর কমান্ডাররাসহ আমরা বিজয়ীর বেশে স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রুমুক্ত প্রথম মুক্তাঞ্চল যশোরে প্রবেশ করি। জনসাধারণ আমাদের বিজয়মাল্যে ভূষিত করে। সে আনন্দ অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৮ ডিসেম্বর আমি এবং শ্রদ্ধেয় নেতা আবদুর রাজ্জাক- আমরা দু’ভাই হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসি।

চারদিকে সেকি আনন্দ, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম- বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শ্রদ্ধেয়া ভাবি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলসহ- বঙ্গবন্ধু পরিবারকে যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখানে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। যে স্বাধীন বাংলার স্লোগান তুলেছিলাম রাজপথে; যে বাংলার জন্য বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে কাজ করেছি; পরমাকাঙ্ক্ষিত সেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ অপূর্ব দক্ষতার সাথে, দল-মত-শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে, আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ২২ ডিসেম্বর।

বিমানবন্দরে নেতৃবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানাই। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সর্বত্র মুখরিত। বিজয়ের সেই সুমহান দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে গৌরবের যে দীপ্তি আমি দেখেছি, সেই রূপ বিজয়ের গৌরবমণ্ডিত আলোকে উদ্ভাসিত। স্বজন হারানোর বেদনা সত্ত্বেও প্রত্যেক বাঙালির মুখে ছিল পরম পরিতৃপ্তির হাসি; যা আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। যার সাথেই দেখা হয়, সকলের একই প্রশ্ন, ‘বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কবে ফিরবেন?’ বঙ্গবন্ধুবিহীন বিজয় অপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল।

কিন্তু আমরা জানতাম, বীর বাঙালির ওপর নেতার আস্থার কথা। তিনি তো গর্ব করে বলতেন, ‘তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু বাংলার মানুষকে তারা দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ওরা আমাকে হত্যা করলে লাখ মুজিবের জন্ম হবে।’ ১৬ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করার পরেও আমরা নিজদের স্বাধীন ভাবতে পারিনি। কারণ, বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। আমরা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেদিন, যেদিন ‘৭২-এর ১০ জানুয়ারি বুকভরা আনন্দ আর স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে জাতির পিতা তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন।

১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিদের দোসর এদেশীয় রাজাকার-আলবদর বাহিনীর ঘাতকরা। ডিসেম্বর মহান বিজয়ের গৌরবমণ্ডিত মাস হলেও ১৪ ডিসেম্বর আমাদের বেদনার দিন। মনে পড়ে নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের কথা। যাঁর কাছে আমি ঋণী। ‘৬৯-এর গণ-আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যিনি আমাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল দেশমাতৃকার স্বাধীনতার সূত্রে। ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী-কৃষক-শ্রমিক-যুবক সকলেই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণে সফল জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছি সুমহান বিজয়। আর এখানেই নিহিত আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের ঐতিহাসিক সাফল্য। স্বাধীনতার ডাক দিয়ে একটি নিরস্ত্র জাতিকে তিনি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। সেদিন কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান এসব প্রশ্ন ছিল অবান্তর। আমাদের মূল স্লোগান ছিল ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙ্গালী, বাঙ্গালী’। আমাদের পরিচয় ছিল ‘আমরা সবাই বাঙ্গালী’।

অথচ ভাবতে অবাক লাগে যে পাকিস্তানের কারাগার বঙ্গবন্ধুকে আটকে রাখতে পারেনি; মৃত্যুদণ্ড দিয়েও কার্যকর করতে পারেনি। অথচ ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত শক্তির দোসর খুনি মোশতাক-রশীদ-ফারুক-ডালিমচক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল! যে স্বাধীনতাবিরোধীরা মাকে ছেলেহারা, পিতাকে পুত্রহারা, বোনকে স্বামীহারা করেছিল; জেনারেল জিয়া তাদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সংবিধান থেকে উৎপাটিত করেছিল। পরাজিত শক্তির পুনরুত্থানে প্রতি মুহূর্তে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি- তাতে কেবলই মনে হয়েছে, বিজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, আর পরাজয়ের গ্লানি দীর্ঘস্থায়ী!

একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য ২৬ ও ২৭ নভেম্বর কলকাতা গিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কলকাতার যে বাড়িতে ছিলাম- সানি ভিলা, ২১নং রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা-এবার সেখানে গিয়েছিলাম। যদিও সেই স্মৃতি এখন আর নেই। গিয়েছিলাম ব্যারাকপুর। যেখানে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে আমি অবস্থান করতাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাতাম। কিন্তু ব্যারাকপুরে যেখানে আমি ছিলাম সেটা ক্যান্টনমেন্টে পরিণত হওয়ায় তার স্মৃতি এখন আর নেই। গিয়েছিলাম ৮নং থিয়েটার রোডে।

স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠেছিল চার জাতীয় নেতা- যারা এখান থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালে বঙ্গবন্ধু যে হোস্টেলে থাকতেন, সেই বেকার হোস্টেলে গিয়েছিলাম। সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ’ নামে একটি কক্ষ দেখে অভিভূত হয়েছি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তিনি যে একদিন মহান নেতা হবেন, স্মৃতিকক্ষটি সেই স্বাক্ষর বহন করছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানাদি যেখান থেকে পরিচালিত হতো, সেখানে গিয়েছিলাম। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠেছিল।

প্রতিপক্ষের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক আজ ইতিবাচকভাবে অগ্রগতির দিকে ধাবমান। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি; যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরে ঘরে ছিল খাদ্যাভাব। কিন্তু আজ দেশে ১৬ কোটি মানুষ এবং খাদ্যভাণ্ডার পরিপূর্ণ। বিশ্বের প্রধান প্রধান জরিপকারী সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশ হচ্ছে উদীয়মান ১১টি দেশের অন্যতম।

বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট মতে, সামাজিক খাতের অগ্রগতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে।’ নারীর ক্ষমতায়নেও আমরা এগিয়ে। সামগ্রিকতায় বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশমান। যদিও আমরা এখনও স্বল্পোন্নত। তথাপি আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের আশাবাদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প’ অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে।

মহান বিজয় দিবসের ৪৬তম বার্ষিকীতে আজ গর্ব করে বলতে পারি, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। তবে দেশ যখন অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে নেই। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী এবং যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সংবিধান পরিবর্তন করেছিল, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে যারা বাতিল করেছিল এবং যারা দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছিল- আজকে ভাবতে ভালো লাগে, আমরা সেই স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে পুনরুদ্ধার করেছি।

জাতির পিতার হত্যার বিচার শেষ করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের হত্যার বিচার করে ইতিমধ্যে অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, বাকিদের বিচারকার্য চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ আজ মর্যাদাশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল, একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অপরটি বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। একটি তিনি পূর্ণ করে গিয়েছেন। আরেকটি আজকে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য
বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
tofailahmed69@gmail.com