শহীদ-স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং করণীয়

মোঃ রফিকুল ইসলাম: বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বের বুকে প্রথম সারির স্থান দখল করতে না পারলেও, জাতিগতভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসে তার স্থান অত্যন্ত সমুজ্জ্বল ও গৌরবের। ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি ও বিশ্বব্যাপী উদ্‌যাপন এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।

১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-র গণ অভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে ১৯৭১-র মহান মুক্তি যুদ্ধের মহান বিজয় অর্জনে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ আজ গৌরবের, অহংকারের। একটি জাতির কতটুকু সাহস ও দেশপ্রেম থাকলে মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আপোসহীনভাবে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সুদীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিল, তা এক মহাবিস্ময়। শহর-বন্দর-গ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের সেই জনযুদ্ধ আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনা।

ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের সোনার বাংলাদেশ। লাখো-লাখো শহীদ, লাখো বীরাঙ্গনা মা-বোন এবং লাখো জীবনবাজী-রাখা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সেই ঋণ কোনদিন এ জাতি শেষ করতে পারবে না। তাঁরা আমাদের জন্য উপহার দিয়ে গেছেন চিরভাস্বর অপার সম্ভাবনাময় স্বাধীন সোনার বাংলাদেশ। কিন্তু, মহান স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছর পরেও আমরা কি করতে পেরেছি প্রতিটি শহীদের স্মৃতিকে ধারণ করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদেরকে চিরভাস্বর করে রাখার বিস্তৃত ও ব্যাপক কোন আয়োজন?

জাতীয়ভাবে শহীদদের জন্য জাতীয় স্মৃতি সৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ করা হলেও তা আঞ্চলিক ইতিহাস ও ব্যক্তি পর্যায়ের স্মৃতি সংরক্ষণে কোনরকম ভুমিকা রাখেনা। একটি দেশের মুক্তির সংগ্রামের কেন্দ্রীয় ইতিহাস সংরক্ষণ যেমন জরুরী, তেমনি আঞ্চলিক ইতিহাস ও ব্যাক্তির আত্মত্যাগের কাহিনীও সংরক্ষণ করা তেমন জরুরী, কেননা বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যক্তির অবদানের ইতিহাসের সমষ্টিই আমাদের জাতীয় ইতিহাস। বিভিন্ন সময়ে সরকার ধাপে ধাপে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করলেও আঞ্চলিক ও গ্রামীন পর্যায়ে তা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও সমস্যাগ্রস্থ অবস্থায় আছে বলেই আমার ধারণা।

তাই পত্র-পত্রিকা বা ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াতে যে খবরটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে, সেগুলো হলো- আজো চিহ্নিত করা হয়নি বধ্যভূমি; বধ্যভূমিতে নেই কোন স্মৃতিস্তম্ভ; দখল হয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমি; ৪৬ বছরেও শহীদের নামে নেই কোন স্মারক স্থাপনা; অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে স্মৃতি স্তম্ভ/ শহীদ মিনার; শহীদ স্মারক স্থাপনার নাম পুনঃস্থাপনের দাবী; শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ না করায় ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শন; ইত্যাদি। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও দীর্ঘ নয় মাস ব্যপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার দেশে এধরণের সংবাদ আমাদের ব্যথিত ও লজ্জিত করে।

আর বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সরকার বরাবরই মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদস্মৃতি সংরক্ষণের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে এবং ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক এ সংক্রান্ত আদেশও সরকারকে দেয়া হয়। তা সত্বেও কী এক রহস্যজনক কারণ ও উদাসীনতায় তা সব অঞ্চলে সমভাবে ও সম্পূর্ণরূপে সফল হচ্ছেনা বলে আমার ধারণা। তার উপর আছে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ-কোন্দল ও ইর্ষা এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সুক্ষ ষড়যন্ত্র।

এরকম ঔদাসীন্য, অবহেলা ও নিস্পৃহতা আমাদেরকে শুধু অকৃতজ্ঞ জাতিতেই পরিণত করবেনা, বাঙালি জাতির মূলধারার শ্রেষ্ঠ চেতনা ৭১র চেতনা থেকে এ জাতি ছিটকে পড়বে এবং ১৯৭১র মহান মুক্তিযুদ্ধের যে জনভিত্তি ও গণঅবদানের ইতিহাস তাও তলিয়ে যাবে কালের গর্বে। কিন্তু, কোন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বব্যাপী ও বিস্তৃত ইতিহাস বিশ্বের দেশপ্রেমিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জাতিগুলো সর্বযুগেই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সংরক্ষণ করে আসছে। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছর একটি জাতির জন্য নেহায়েত কম সময় নয়।

আমাদেরকে নিন্মোক্ত গুরুত্বগুলো অনুধাবন করে যথাশীগ্র শহীদ-স্মৃতি রক্ষার বিভিন্ন স্তর ভিত্তিক বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত।
১) শহীদ-স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের যুগান্তকারী ও বিশ্বস্বীকৃত ভাষণের পর প্রতিটি শহর-বন্দর-গ্রামের পাড়ায়-মহল্লায় কীভাবে শহীদ ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযুদ্ধের জন্য অনুপ্রাণিত হন এবং কীভাবে অপরাপর ঘনিষ্টজনদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সংগঠিত করেন তা বহুমাত্রিক তথ্য এ জাতি জানতে পারবে;
২) প্রতিটি শহীদের ব্যক্তিগত স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে তাঁকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা প্রদানের এটিই শ্রেষ্ঠ উপায়;
৩) শহীদস্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে এ জাতি ৭১র মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরো বলিষ্ট ও চিরজাগরুক করে রাখতে সমর্থ হবে;
৪) বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও জাগ্রত রাখার জন্যেও এটি হবে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ;
৫) এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনকে নিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরী করা। সমস্ত শহীদদের আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা ভবিষ্যত প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন ও সাহসী ভূমিকা রাখতে প্রেরণা যোগাবে;
৬) প্রতিটি শহীদের জীবনগাথায় লুক্কায়িত আছে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান সমূহ। তাই শহীদ-স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে আমরা ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা প্রতিরোধ করতে পারি;
৭) এর মাধ্যমে জাতি শহীদ পরিবারের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারে। এবং শহীদ-স্মারকগুলোই হবে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য শ্রেষ্ট উপহার;
৮) শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি জাতির বর্তমান এবং অতীত প্রজন্মের মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভংগী অপরাপর দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীর কাছে প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে;
৯) ভবিষ্যতের জন্য শহীদ-স্মারকগুলোই হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থায়ী রেকর্ড ও দলিল;
১০) ব্যক্তির বীরত্বগাথার সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে মহান মুক্তি যুদ্ধের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে উঠবে;
১১) বর্তমানে যেখানে পাকিস্তানের কিছু লেখক এবং তাদের এদেশীয় দোসরেরা ১৯৭১-এর গণহত্যাকে অস্বীকার করছে, সেখানে সমস্ত শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমেই সারা বিশ্বে ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সেই গণহত্যার সুস্পষ্ঠ নিদর্শন দেখানো সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো- জাতি কীভাবে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করবে? স্বাধীনতার পর থেকে সরকার যে সমস্ত পদক্ষেপ ও কর্মসূচী গ্রহন করেছে বৈচিত্র্যের দিক থেকে তা ঠিকই আছে, কিন্তু পরিমান, ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতির দিক থেকে তা নেহাতই অপ্রতুল মনে হয়। আবার কোন কোন এলাকায় শহীদস্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা হলেও কোন এলাকায় তা নামমাত্র বা একদম হয়নি।

আবার কোন এলাকায় স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বিভিন্ন রকম শহীদ স্মারক-স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হলেও কালের বিবর্তনে, সঠিক উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলীন হয়ে গেলেও অদ্যাবধি তা আর পুনঃস্থাপিত হয়নি। অথবা কোথাও শহীদ-স্মারক স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে থাকলেও সময়োপযোগী উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাবে সেগুলোও আর প্রতিষ্ঠা পায়নি। অথবা সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে শহীদ-স্মৃতি রক্ষার জোরালো তাগিদ দেয়া সত্বেও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং শহীদ পরিবারগুলোর সংগে সঠিক যোগাযোগ ও অনুসন্ধানের অভাবে তাও কাঙ্খিত ও ব্যাপকহারে বাস্তবায়িত হয়নি।

অথচ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের এ দেশের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ-স্মারক প্রতিষ্ঠা করা উচিত ও সম্ভব। এর মাধ্যমে সারা বিশ্বকে আমরা জানিয়ে দিতে পারি যে, কতো দাম দিয়ে এ বাংলাদেশ আমরা অর্জন করেছি। আমরা এ লক্ষ্যমাত্রা স্থির করতে পারি যে, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপনের পূর্বেই সমস্ত শহীদদের নাম বিভিন্ন স্মারক-স্থপনায় অন্তর্ভূক্ত হবে। সে লক্ষ্যে একটি সঠিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রনয়ন ও তার আশু বাস্তবায়নই এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সে উদ্দেশ্যে নিন্মলিখিত কর্মসূচী ও পদক্ষেপ আমরা গ্রহন করতে পারি-
১) যে সমস্ত গ্রামে, পাড়া বা মহল্লায় কোন শহীদ রয়েছেন, সে সমস্ত স্থানে নূন্যপক্ষে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ থাকবে এবং যাতে শহীদদের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ থাকবে।
২) বিশিষ্ট শহীদদের নামে তাঁদের স্ব স্ব এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করতে হবে যেমন, রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, স্টেডিয়াম ইত্যাদি।
৩) সমস্ত ছোট-বড় বধ্যভূমিগুলোকে চিহ্নিত করে তাতে সমস্ত শহীদদের নাম-ঠীকানা উল্লেখ করতে হবে।
৪) শহীদদের ব্যবহার্য্য পণ্য বা স্মারক বস্তু নিয়ে জেলা/উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৫) বিভিন্ন ট্রেনের/রেলগাড়ীর নাম শহীদদের নামে করা যেতে পারে।
৬) বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন ভবন ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও শহীদদের নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা যেতে পারে।

এসমস্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ-স্মৃতি সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ কার্যক্রমের বাস্তবায়নে জন্য জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ইউনিট/স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহন ও সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কার্যক্রমকে বেগবান ও সফল করার জন্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে তাঁদের মাঠ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে দ্বায়িত্ব প্রদান করা আবশ্যক। অন্তর্ভূক্ত করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমান্ড কাউন্সিলকে এবং অতি অবশ্যই শহীদ পরিবার ও শহীদ স্মৃতি সংসদগুলোকে।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, বিস্তৃত ও ব্যপকভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদস্মৃতি সংরক্ষণ কার্যক্রমের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই শহীদদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক আলোকিত ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব, নতুবা নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি, সুসং মহাবিদ্যালয়, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।