একাত্তরে আকাঙ্ক্ষার যে বিস্ফোরণ ঘটেছিলো তাই আজকের বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি – ড. আতিউর রহমান

“শুরুতে অনেকেই বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র সাথে তুলনা করছিলেন, বা ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’ বলছিলেন (অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়ন করা সম্ভব হলে যে কোন দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব)। কিন্তু এদেশের সাহসী ও পরিশ্রমী মানুষ তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন। একাত্তরে আকাক্সক্ষার যে বিস্ফোরণ ঘটেছিলো তাই আজকে বাংলাদেশকে অন্তর্ভূক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছে।”- বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান। আজ ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর কালচারাল এন্ড সোস্যাল স্টাডিজের আয়োজনে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি: গতি-প্রকৃতি’ শিরোনামে সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথা বলেন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার মিলনায়তনে এই সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিলো। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল, অর্থনৈতিক সাংবাদিক মনোয়ার হোসেন, এবং দৈনিক জনকণ্ঠের নগর সম্পাদক কাওসার হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী।

ড. আতিউর আরও বলেন- “বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন সূচনা করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হওয়া সংবিধানে পরিস্কারভাবে কৃষক, মজুর ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ওপর সব রকমের শোষণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশে সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে”। তিনি বলেন যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সাম্য ও অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের অভিযাত্রার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এরপরও অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের পর আজ আমরা তাঁর সুযোগ্য কন্যাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। তিনি নিরলসভাবে জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা ইতোমধ্যেই তাঁর গতিশীল ও অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের সুফল পেতে শুরু করেছি।

উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকের হিসেবে বাংলাদেশের অর্জন সম্পর্কে আলোচনায় ড. আতিউর বলেন যে প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস-এর “ওয়ার্ল্ড ইন ২০৫০” প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৩১-তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ (পিপিপি এডজাস্টেড মার্কিন ডলারের হিসেবে) এবং আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল তিনটি দেশের মধ্যে থাকবে। দেশের জিডিপি ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে (বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ৭.২৮ শতাংশ)। তিনি আরও বলেন যে, সামাজিক সূচকগুলোতেও বাংলাদেশের অর্জন সমান প্রশংসনীয়। যেমন: বর্তমানে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২৩ ও ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেছে। বর্তমানে প্রতি দম্পতির মোট সন্তানের সংখ্যা গড়ে ২.১ জন, সত্তরের দশকে এ সংখ্যা ছিল ৬। গড় প্রত্যাশিত আয়ু ২০০৫ সালের ৬৫.২ বছর থেকে ২০১৬ সালে ৭১.৬ এ উন্নিত হয়েছে, যা প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি।

“আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাম্প্রতিক কালে পত্র পত্রিকায় দেশের আর্থিক খাতে নানান দূর্নীতির খবর আগের চেয়ে বেশি হারে আসছে। মনে রাখতে হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের শক্ত হাতে দূর্নীত দমন এবং সকল ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে”- বলেন ড. আতিউর। বক্তব্যের শেষ ভাগে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সকলে একসঙ্গে কাজ করে অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।