আগামীর জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত থাকতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের ফলে সামনে নতুন শিল্প বিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই তরুণ প্রজন্মকে সুন্দর আগামীর জন্য প্রস্তুত করতে হবে। দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মই আইসিটি সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আইসিটি সেক্টরের মেগা ইভেন্ট চার দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রথম নাগরিকত্ব পাওয়া নারী রোবট সোফিয়া উপস্থিত ছিল।

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নট টুডে ফর টুমরো, আমরা বাংলাদেশকে তৈরি করতে চাই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কিভাবে তৈরি হবে সেটাই আমরা দেখতে চাই, সেভাবেই আমরা কাজ করতে চাই।’ তিনি বলেন, আর কালক্ষেপণ যেন না হয় সেজন্য আমরা লক্ষ্য স্থির করেছি ‘ভিশন-২০২১’। অর্থাত্ ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো। সে সময়ে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ দেশ। আর ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে আমরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হব, ইনশাল্লাহ আমরা সেটা অর্জন করতে পারবো, সে বিশ্বাস আমার আছে। কারণ, আমরা এখন যেটা করে যাচ্ছি— আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য। শুধু বর্তমান নয়, আমাদের ভবিষ্যেক দেখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সব থেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে সফ্টওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফ্টওয়্যার ও আইসিটি সেবা খাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এ সব পার্কে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। আমরা প্রথমস্থানে উঠবো ইনশাল্লাহ। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্যপ্রযুক্তির পেশার সঙ্গে যুক্ত হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বানানো শুরু করেছি। এই খাতে উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করতে চলতি বছর থেকে আমরা ৯৪টি উপকরণের ওপর শুল্ক ১ শতাংশ করে দিয়েছি। ইতোমধ্যে স্যামসাং-এর মতো কোম্পানি ঢাকার অদূরে কারখানা স্থাপন করেছে। আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সংযোগ ও বেসরকারি খাতে ৬টি ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সুবিধা দিয়েছি। যার ফলে দেশব্যাপী ১০ গুণেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানিও হচ্ছে । যে ব্যান্ডউইথ এর দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা তা এখন ৫শ থেকে ১ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। ফলে ই-গভর্নেন্স, ই-হেলথ, ই-কমার্স, ই-লার্নিং, মোবাইল এপ্লিকেশনসহ ইন্টারনেটের বহুবিধ ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে ফোর-জি প্রযুক্তি চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মানুষকে যে কথা দিয়েছি নির্বাচনী ইশতেহারে, তা আমরা রেখেছি।’

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রতিবছর ১০ হাজার স্নাতক বের হওয়ার কথা তুলে ধরে জাপানের ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্টকে স্মার্ট করার কাজ বাংলাদেশের তরুণদের দেওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত না হলেও আমাদের দেশের মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে খুবই পারদর্শী।’ রোবট সোফিয়াকে নাতি-পুতির সমতুল্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগেই বলেছিলাম, শুধু ছেলে মেয়ে না, এখন নাতি-নাতনিদের সময়।’

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফর্মেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকবৃন্দ, মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং কম্পিউটার খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি নিয়ে একটি ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন পরিবেশিত হয়। কয়েকটি আইটি সংগঠনের সহযোগিতায় আইসিটি বিভাগ ও বেসিস ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-এর আয়োজন করেছে। ‘রেডি ফর টুমরো’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪শ’ আইসিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। মেলায় ২৯টি সেমিনার হবে। গতকাল থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

মেলায় বক্তৃতা পর্ব শেষে বর্ণাঢ্য লেজার শো অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। সেখানে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবন। এরই একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি গেমসের স্টলে যান। সেখানে তিনি ভারচুয়ালি ক্রিকেট খেলেন। ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে কয়েকটি বল মোকাবেলা করতে দেখা যায় তাকে। প্রসঙ্গত, ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড দেখতে কোনো টিকিট লাগবে না, তবে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে হবে। মেলা প্রাঙ্গণেও নিবন্ধন করার সুযোগ রয়েছে।