স্বৈরাচার এরশাদের পতন দিবস আজ

সোহরাব হাসান:  আজ ৬ ডিসেম্বর, স্বৈরাচার পতন দিবস। গণতন্ত্র দিবস। কিন্তু সত্যিই স্বৈরাচারের পতন হয়েছে কি না তা নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যেমন দ্বিমত আছে, তেমনি মতভেদ আছে গণতন্ত্রের সাফল্য ও সংকট নিয়েও।

নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তিন জোটের শরিকেরা এখন ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও সরকারে আছে ১৪ দল, সেই সময়ের পাঁচ দলীয় বাম জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং এরশাদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে জামায়াতে ইসলামী, আন্দালিব রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির দুটি গ্রুপ।

এ সত্ত্বেও প্রধান দুই জোটের নেতারাই পরস্পরকে স্বৈরাচার ও রাজাকারের দোসর হিসেবে অভিযুক্ত করে থাকে। কেননা, যে দল বা যারাই রাজাকার ও স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় দেয়, তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিপন্থী কাজ করে।

গণতন্ত্র মানে শুধু লেবাস ও ছবি বদল নয়; গণতন্ত্র একটি ব্যবস্থা এবং তার নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন। আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়, ‘গণতন্ত্র হলো জনগণ দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের গণতন্ত্রের পূর্বাপর শাসনে জনগণের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। নিজের নয় বছরের শাসনামলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্বৈরাচারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আর তার শাসনামল-পরবর্তী ২৭ বছর নিজেকে তিনি ‘গণতান্ত্রিক নেতা’ হিসেবে জাহির করেছেন। মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে গণতন্ত্রের সবক দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে এরশাদ পদত্যাগ করার সময় ভাবা অসম্ভব ছিল, তিনি ফের বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেউকেটা হয়ে উঠবেন। গণতন্ত্রের দুই আপসহীন নেত্রী তাঁকে নিয়ে টানাটানি করবেন। এরশাদ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ, যিনি ফার্স্ট লেডি থাকতে নানা বিশেষণে ভূষিত হয়েছিলেন, এখন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। সরকারে এরশাদের দলের তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আছেন।

গত ২৭ বছরে বাংলাদেশ অর্থনীতির সূচকে অনেক এগিয়ে গেছে। মানুষের গড় আয় ও আয়ু—দুটোই বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি সাতের ঘরে পৌঁছেছে। কিন্তু রাজনীতি তথা গণতন্ত্রের সূচকগুলো অবিশ্বাস্যভাবে নিম্নগামী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ষাট ও সত্তরের প্রজন্মকে যেভাবে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলিত করেছিল, আশি ও নব্বইয়ের প্রজন্মকে একইভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন।

এই আন্দোলন কেবল রাজনীতিকদের ছিল না, ছিল ছাত্র-তরুণ, শ্রমিক, সংস্কৃতিসেবীসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন। মূলত নাগরিক সমাজের উদ্যোগী ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে এক টেবিলে বসানো সম্ভব হয়েছিল। তাঁদের ঐক্যের কারণেই যেমন স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল, তেমনি গণতান্ত্রিক শক্তির বিরোধ ও বিভক্তির রাজনৈতিক আবহাওয়ায় সেই স্বৈরাচার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির ও মৌলবাদী হেফাজতে ইসলামের বেলায়ও। এরা বরাবর নিজেদের সুবিধামতো পক্ষ বদল করেছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বর আন্দোলনরত তিন জোট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দল ও বামপন্থী ৫-দলীয় জোট গণতন্ত্র উত্তরণে যে রূপরেখা দিয়েছিল, তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দলিল হয়ে আছে। এই দলিলে হত্যা, অভ্যুত্থান, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির অবসান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ‘সার্বভৌম সংসদ’ প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন রহিত করার কথা বলা হয়েছিল। আর তিন জোট ঘোষিত আচরণবিধিতে ‘স্বৈরাচারের চিহ্নিত সহযোগী ও অস্ত্রধারীদের’ দলে না নেওয়ার অঙ্গীকার ছিল।

স্বৈরাচার পতনের ২৭ বছর পর সংসদ কতটা সার্বভৌম এই প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বাম নেতারা যে জবাব দিয়েছেন, তাতে মিলের চেয়ে অমিলের ভাগই বেশি। তবে তারা স্বীকার করেছেন, নব্বইয়ের আন্দোলনের কম উদ্দেশ্যই অর্জিত হয়ছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বলেন, তিন জোটের রূপরেখার অন্যতম দাবি ছিল সার্বভৌম সংসদ। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে সেটি আমরা করেছি। স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গে জোট করা বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি জামায়াতের আত্মঘাতী রাজনীতির কারণেই জেনেশুনে এই বিষ গ্রহণ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মনে করেন, তিন জোটের রূপরেখার চেতনা থেকে দেশ অনেক দূরে সরে এসেছে। আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের সঙ্গে এবং বিএনপি রাজাকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে কুঠারাঘাত করেছে।

১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালা করে সংসদ বর্জন করেছে। কোনো কোনো সংসদে অর্ধেকেরও বেশি কার্যদিবসে বিরোধী দল অনুপস্থিত থেকেছে। প্রতিটি সংসদের শেষের দুই আড়াই বছর চলেছে বিরোধী দল ছাড়াই। আর ২০১৪ সালে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া যে নির্বাচন হয়েছে, শুরু থেকেই সে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল নেই। খাতাপত্রে যে দলটি বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃত, সে দল আবার সরকারেরও অংশীদার।

তিন জোটের রূপরেখায় রাষ্ট্রীয় বেতার-টিভিতে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা ছিল। ২৭ বছরেও তা হয়নি। সামরিক শাসনামলে টেলিভিশন ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আমলে সে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে কেউ মনে করেন না। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, বেতার-টিভিকে তারা তাদের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

তিন জোটের রূপরেখায় হত্যা, অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবে তা কতটা বন্ধ হয়েছে, সেই প্রশ্ন না উঠে পারে না। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা এবং আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতাদের গুম হওয়ার ঘটনাকে মানুষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই মনে করে।

তিন জোটের রূপরেখায় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা, তথা ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা না করার কথা বলা হয়েছিল। এখন বড় দুই দলের নেতারা একে অপরকে গালমন্দ না করে কথা বলেন না। স্বৈরাচার এরশাদ আমলে বিরোধী দলের নেতাদের চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। গণতান্ত্রিক আমলে সে ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে বলা যাবে না। নেতারা কে কতটা গণতান্ত্রিক, সেই হিসাব দেওয়ার বদলে কার আমলে কত বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার পরিসংখ্যান তুলে ধরার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ভোটারবিহীন নির্বাচন ও জবরদস্তি করে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এরশাদ। সে কারণে তিন জোটের রূপরেখায় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ২৭ বছর পর নির্বাচনী বিতর্ক আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে। সব দল সহনশীল আচরণ করলেই গণতান্ত্রিক ধারাকে আমরা এগিয়ে নিতে পারব। সংসদ সার্বভৌম, সংসদীয় কমিটি কার্যকর। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে সরকারের জবাবদিহিতা বেড়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ব্যাপারে বিপরীত মত দেন। তিনি বলেন, নব্বইয়ের আন্দোলনে মূল কথা ছিল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন। অথচ এখন তো মানুষের ভোটের অধিকারই নেই। জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেই স্বৈরাচারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নীতি বলতে কিছু নেই।

আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন বলেন, গত ২৭ বছরে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে। তবে দেশে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে বলে তিনিও স্বীকার করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী আসাদুজ্জামান রিপন এই দাবি নাকচ করে বলেন, নব্বইয়ের আন্দোলনের বিজয় যে ধরে রাখা যায়নি, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশে স্বৈরাচার পুনর্বাসিত হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও মনে করেন, নব্বইয়ের আন্দোলনের মূল কথাই ছিল স্বৈরাচারের পতন। সেই স্বৈরাচার যখন নখদন্ত বের করছে, তখন কোনোভাবেই বলা যাবে না যে গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে।

খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের পুরোটা সময়টাই এরশাদ জেলে ছিলেন। দণ্ড ভোগ করেছেন। আবার ক্ষমতার পালাবদলের পর জেল থেকে ছাড়াও পেয়েছেন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রতিষ্ঠা। এরশাদের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তার অবসান। ১৯৮৭ সালে লড়াকু নূর হোসেন আত্মাহুতি দেওয়ার আগে বুকে-পিঠে লিখেছিলেন, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’।

নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতনের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র সুশাসন এবং দেশে একটি সহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিষ্ঠা। স্বৈরাচারের ক্ষতগুলো সমাজ থেকে মুছে ফেলা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টোটাই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাজের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। পরস্পরের প্রতি ুসহনশীলতা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি আইনসহ নানা কালাকানুনে গণমাধ্যম শঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত। চারদিকে ভয়ের পরিবেশ। অহরহ ঘটছে গুম-নিখোঁজের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে এ কথা অবস্থায় বলা যায় না যে গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে।