রাজধানীতে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করছে নেক্সপার্ক

বিশেষ প্রতিবেদন : আজ থেকে দশ বছর আগেও ঢাকা শহরে প্রতি ঘন্টায় একুশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া যেত। যা কিনা বর্তমানে ঘন্টায় সাত কিলোমিটারে নেমে এসেছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে যানজটের জন্য প্রতিবছর আমাদের প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকার মত ক্ষতি হচ্ছে। যানজটের কারণে ঢাকাবাসীর জীবন যখন দূর্বিষহ, ঠিক তখনই যানজট নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে বাজারে এলো নেক্সপার্ক । নেক্সপার্ক এমন একটি প্লাটফর্ম যেটি ব্যবহার করে আপনি পাবেন নিকটবর্তী খালি গ্যারেজের সন্ধান। এতে করে রাস্তার পাশে যত্র তত্র গাড়ি পার্কিং না করে আপনা্র গাড়িটি নিকটবর্তী খালি গ্যারেজে রাখতে পারবেন।  নেক্সপার্কের বিভিন্ন ফিচার এবং তরুণদের উদ্দেশ্যে আইটি খাতে ক্যারিয়ার গঠনে নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান। শাহরিয়ার খান গত ১০ বছর কাজ করছেন দেশের আই টি সেক্টরে । তার রয়েছে ব্যাংক , টেলিকম ও আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার ফার্মে কাজের অভিজ্ঞতা। বর্তমানে নিজের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে চিফ ইনফর্মেশন অফিসার হিসাবে কাজ করছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন  রিজিউম ডেভলপমেন্ট স্পেশালিষ্ট নিয়াজ আহমেদ।

নিয়াজ আহমেদঃ নেক্সপার্ক কি এবং কিভাবে কাজ করে?

শাহরিয়ার খানঃ এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে আপনি আপনার পছন্দ মত স্থানে পার্কিং বাছাই করে, আপনার পছন্দ মত সময়ে পার্কিং করতে পারবেন। আপনি হয়তো আপনার বাচ্চাকে স্কুল ড্রপ করতে গিয়েছেন, আপনি হয়ত ডাক্তার দেখাতে গিয়েছেন, ফ্যামিলি নিয়ে শপিং এ গিয়েছেন , রাতে কোথাও ডিনার করতে গিয়েছেন , এইরপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনার হয়ত পার্কিং এর প্রয়োজন হতে পারে । আপনার এই সব প্রয়োজনে নেক্সপার্ক আপনার সঙ্গী হতে পারে। নেক্সপার্ক শুধু পার্কিং সমাধান নয়, নেক্সপার্ক হতে পারে আপনার আয়ের উৎসও। আমাদের অনেকেরই গ্যারেজ সারাদিন ফাঁকা পড়ে থাকে। সকালে গাড়ি নিয়ে বের হলে অফিস বা কাজ থেকে না আসা পর্যন্ত খালি পড়ে থাকে আমাদের গ্যারেজ। সেই সময়টুকু আমরা আমাদের গ্যারেজ নেক্সপার্কের মাধ্যমে ঘণ্টা / দৈনিক / সাপ্তাহিক / মাসিক হিসেবে ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত কিছু আয় করতে পারি। বাংলাদেশের যেকোন ব্যাংকের ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে আপনার লেনদেন করতে পারবেন ।  

নিয়াজ আহমেদঃ কিভাবে সাধারণ মানুষ নেক্সপার্ক ব্যবহার করতে পারবে?

শাহরিয়ার খানঃ নেক্সপার্ক একটি সহজ মোবাইল অ্যাপ, এই অ্যাপটি আপনি সহজেই মোবাইলে  ডাউনলোড করে ইনস্টল করে নিতে পারেন অথবা ওয়েব ব্রাউসারের মাধ্যমেও পেতে পারেন। আমাদের ওয়েব সাইট www.nexparc.com এ গিয়েও ডাউনলোড করে নিতে পারেন। আপনি যেখানেই যাবেন, এই অ্যাপ কাজে লাগিয়ে নিকটবর্তী কোথায় খালি গ্যারেজ আছে খুজে নিতে পারবেন। যেহেতু নেক্সপার্ক একটি প্লাটফর্ম, তাই এক্ষেত্রে গাড়ি ও গ্যারেজের প্রয়োজনীয় তথ্য নেক্সপার্কের ডাটাবেজেই আছে। তাই, আপনি পাবেন নিশ্চিত নিরাপত্তা। এছাড়াও গাড়ি পার্কিং থাকা অবস্থায় ইন্সুরেন্সের পরিকল্পনাও নেক্সপার্কের আছে। অচিরেই সেটিও বাস্তবায়িত হবে। 

নিয়াজ আহমেদঃ নেক্সপার্ক তৈরীর চিন্তা কিভাবে মাথায় আসে?

শাহরিয়ার খানঃ ঢাকা শহরের এই যানজটে আমার নিজেরই অনেক সময় নষ্ট হয়। অনেক রুগী সময় মতো হাসপাতালে পৌছাতে পারে না। অনেক বাচ্চা সময় মতো স্কুলে যেতে পারে না। আবার স্কুল কলেজ ছুটি হলে রাস্তায় জ্যাম প্রকট আকার ধারন করে। স্কুলে বাচ্চাকে নামিয়ে দিয়ে অনেক গাড়ি রাস্তায় অপেক্ষমান থাকে। এতে রাস্তায় স্পেস কমে আসে ও যানজট বাধে। পক্ষান্তরে আবার, একটি গাড়ি সকালে বেরিয়ে যাওয়ার পর গ্যারেজ বা পার্কিং স্পেস খালিই পড়ে থাকে। আমাদের প্রাথমিক আইডিয়া ছিলো রাস্তার পাশের এই গাড়িগুলো যদি না থাকে তাহলে যানজট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সাথে মাথায় আসে খালি গ্যারেজের আইডিয়া। এরপর শুধু দরকার ছিলো তাদের সমন্বয়, আর এর জন্য প্রয়োজন ছিলো একটি প্লাটফর্ম। আর এভাবেই হয়ে গেলো নেক্সপার্ক।

নিয়াজ আহমেদঃ ই-কমার্স সেক্টরে উদ্যোক্তা হতে হলে কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে?

শাহরিয়ার খানঃ উদ্যোগতা হতে হলে সব সময় থাকতে হবে নতুন আইডিয়া। হয়তো খুব কমন কাজ, কিন্তু আগে কেউ কখনো এভাবে ভাবেনি। প্রথমে শুনে মনে হবে খুব সাধারন, কিন্তু না। এর মাঝেই আছে  অপার সম্ভাবনা। চালডাল, উবার, পাঠাও এমনকি আলীবাবা, সবাই কিন্তু সমাজের যে কোন সমস্যা নিয়ে ভেবেছে এবং সেই সমস্যা কিভাবে সমন্বিত ভাবে সমাধান করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করেছে। যারা এই সমস্যার সমাধান করতে পারে তাদের এক করেছে। উদ্যোগতা হতে হলে এই না যে তার অনেক টাকা পয়সা লাগবে, অনেক বড় অফিস বা লোকবল লাগবে। লাগবে আইডিয়া, স্বদিচ্ছা ও লেগে থাকার মনোভাব।  

নিয়াজ আহমেদঃ ই-কমার্স সেক্টরে একজন ফ্রেসারের জব পাওয়ার জন্য কি কি ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত?

শাহরিয়ার খানঃ আমাদের দেশের ই-কমার্স সেক্টরটি এখনও ততোটা পরিনত না। বেসরকারি স্পন্সর নেই বললেই চলে । অনলাইন পেমেন্টএ অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে । তাই এই সেক্টরে কাজ করতে আসার আগে এই সেক্টরের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে হবে। ক্লায়েন্ট এখন খুব সার্ভিস সচেতন। যে কোন কাজ একটু সহজে, কম সময়ে একটু সুন্দর করে, গুছিয়ে করে দেয়াকে ক্লায়েন্ট এখন অনেক বেশি প্রাধান্য দেয়। কাজেই ছাত্র জীবন থেকে নিজের ভেতন এসব সফট স্কিল গড়ে তোলা দরকার। এছাড়া আমার মনে হয়, সাধারন কম্পিউটার স্কিল, সফটওয়্যার স্কিল, প্রেজেন্টেশান স্কিল  এগুলো এখনকার সবার মাঝেই কম বেশি আছে। আর না থাকলেও এগুলো শিখে নেয়া তেমন কঠিন কিছু না। এজন্য ছাত্রাবস্থায়  ই-কমার্স সেক্টরেও পার্ট টাইম জব করলে ই-কমার্স বিজনেসের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা হয়ে যায় যা পরবর্তী কর্ম/ব্যাবসা  জীবনে ভীষণ ভাবে ভ্যালু অ্যাড করে।

নিয়াজ আহমেদঃ টেকনোলজি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে কি কি পরিবর্তন আনা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

শাহরিয়ার খানঃ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাস্তবের মিল খুবই সামান্য। তাই, কর্মমুখী শিক্ষা ও ব্যবহারিক শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে সরকার সরকারি/ বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে বাধ্যতামূলক কর্মমুখী ও ব্যবহারিক শিক্ষার উপর সাবসিডি বা আইন করতে পারেন । আপনি যেটা বইয়ে শিখছেন সেটার দৈনন্দিন জীবনে সেটার প্রয়োগটা কোথায় সেটা দেখতে হবে। বাংলাদেশে এখন স্পেসিফিক ভাবে ই কমার্স সেক্টরে কাজের জন্য জব সার্কুলার দেয়া হয় । বছরে শেষে যে বন্ধটা পাওয়া যায়, সেই সময়টা কোন একটা কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে কাজ শিখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নিজের কাজ শিখাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। 

নিয়াজ আহমেদঃ নেক্সপার্ক কিভাবে আপনার আয়ের  উৎস হতে পারে?

শাহরিয়ার খানঃ আমরা আমাদের গ্যারেজ নেক্সপার্ক-এ ভাড়ার জন্য দিয়ে বাড়তি কিছু আয় করতে পারি। এভাবে নেক্সপার্কে আপনি বিনা পরিশ্রমে অনায়াসে আনুমানিক ১০/১৫ হাজার আয় করতে পারবেন। নেক্সপার্ক এ সকল প্রকার ট্রানসাকশন বর্তমানে আপনি বিকাশের মাধ্যমে করতে পারবেন এ ছাড়া আপনি যেকোন ব্যাঙ্ক এর ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে পার্কিং চার্জ পরিশোধ করার সুযোগ আমরা করে দিব । আপনার সকল ট্রানসাকশন আপনার নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে আপনি মনিটর করতে পারবেন । আপনার অ্যাকাউন্টস ডিটেইলস চাইলে আপনি প্রিন্ট দিতে পারবেন । উপরের সুবিধাগুলোসহ বাংলাদেশ এ আমরাই প্রথম আপনাদের সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে কিছুটা হলেও যানজটমুক্ত সবুজ পরিবেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নেক্সপার্ক আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি ।

নিয়াজ আহমেদঃ  নেক্সপার্ককে নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

শাহরিয়ার খানঃ বর্তমানে নেক্সপার্ক ঢাকায় কাজ শুরু করেছে, ক্রমেই আমরা চট্টগ্রাম ও সিলেটে এটা চালু করবো। ট্রাফিক সমস্যা আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান একা করা সম্ভব না। তবুও যদি আমাদের এই উদ্যোগ সমাজের একটু হলেও কাজে আসে। একজন রুগী যদি সময় মতো হাসপাতালে পৌছে যথাসময়ে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে, তাহলেই আমাদের এই চিন্তা ও উদ্যোগকে সফল মনে করবো।