রঙিলা পুরীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি

ড. সা’দত হুসাইন

রঙিলা পুরী একটি কল্পিত দেশের নাম। সে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। ৫-৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রতি বছরই হতে থাকে। সে দেশে অনেক উন্নতি ঘটেছে, যার সম্পর্কে দেশের শাসকরা বড় গলায় কথা বলতে পারেন। যেমন— সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। সুপেয় পানি সরবরাহে লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। একসময় কৃষিতেও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। এখন সে উন্নয়ন অবশ্য আগের মতো নেই। সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একসময় প্রায় তলানিতে ছিল। পরবর্তীকালে তা বেড়েছে। অনেক লোক চাকরি বা কাজ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, দেশের প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ বিদেশে। সুতরাং বিদেশ থেকে প্রচুর রেমিট্যান্স বা অর্থ আসে। সে অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাজকোষাগারে জমা থাকে। যেহেতু বিপুলসংখ্যক লোক বিদেশে থাকে, সেহেতু এ রিজার্ভের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।

স্বাধীনতার প্রত্যুষে রঙিলা পুরী একটি গতানুগতিক অর্থনীতি পেয়েছিল। একে হয়তো স্থবির অর্থনীতি বলা ঠিক হবে না। গতানুগতিক বলছি এ কারণে যে, তখন দেশের মানুষ নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন বা সক্রিয় ছিল না। পণ্যের দাম কম ছিল। খাদ্যপণ্যের দাম আরো কম ছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা খুব একটা টানাটানিতে ছিল না। তাদের ওপর আর্থিক চাপ তেমন ছিল না। স্বাধীনতার দুই বছরের মাথায় দেশে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ হয়। সে দুর্ভিক্ষের সময় অনেক লোক না খেয়ে মারা যায়। সচ্ছল পরিবারও দুবেলার পরিবর্তে একবেলা খেয়েছে। এই চরম অর্থনৈতিক চাপ দেশের মানুষের চোখ-কান খুলে দেয়। তারা ধরে নেয় যে, আগের গতানুগতিক ধারায় অভ্যস্ত হলে তাদের খুব একটা আয়-উন্নতি হবে না। তারা একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য নানা রকম পন্থা খোঁজ করতে থাকে। কেউ দেশের মধ্যে কৃষিজ অর্থনীতিতে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে। কেউ আবার নতুন ধরনের সংগঠন বা এনজিও খোলে, বিদেশীদের সাহায্য নিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে। এককথায় দুর্ভিক্ষ তাদের মনমানসিকতায় বড় রকমের ঝাঁকুনি দেয়। সেই ঝাঁকুনিতে তারা সম্বিত ফিরে পায়। বুঝতে পারে, যেভাবেই হোক নতুন নতুন ক্ষেত্রে তাদের যেতে হবে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় তারা এও বুঝতে পারে যে, শুধু দেশের সীমার মধ্যেই তাদের বাঁচার সুযোগ সীমিত নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তাদের কর্মসংস্থান ও আয়-উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তারা সেসব দেশে যেতে পারে। এভাবে তাদের সমৃদ্ধির দুয়ার বিস্তৃত হয়। আগে দেশটি যখন উপনিবেশের (কলোনি) মতো ছিল, তখন এসব চিন্তা তাদের মাথায় আসেনি। তারা (সাবেক) দেশের উন্নত অংশে চলে যেত এবং সেখান থেকে সামান্য কিছু বাড়তি সম্পদ বা আয় নিয়ে খুশি মনে নিজ জায়গায় ফেরত আসত। এতে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হতো না। এখন তারা বুঝতে পেরেছে যে, সারা পৃথিবীতেই কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ রয়েছে। সুতরাং তারা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, বৈধ ও অবৈধ সব উপায়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। যারা একটু শিক্ষিত, তারা বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে চেষ্টা করে। সেখানে দক্ষ শ্রমিক অথবা যাকে আমরা ‘হোয়াইট কলার কর্মী’ বলি, সেই ধরনের কাজ খোঁজ করে পায়। দেখা যায় যে, বিদেশী আয়ের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে তারা অপ্রত্যাশিত পরিমাণ ধনসম্পদের মালিক বনে যায়। সুযোগ পেলে তারা বিদেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানে পড়ায় এবং সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ মা-বাবার জন্য পাঠায়। দেশে তাদের পরিবার কম কাজকর্ম করেও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার সুযোগ পায়। যারা অশিক্ষিত কিন্তু গায়ে-গতরে শক্তি আছে, তারা বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শক্ত কাজ করতে থাকে। এতে তাদের যে আয়-উপার্জন হয়, সেই অর্থ দিয়ে তারা দেশে বেশ ভালো সম্পদের মালিক হতে পারে। একশ্রেণীর লোক ইউরোপে বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে চলে যায়। সেখানে তারা বুদ্ধি খরচ করে নিজেরা দোকানপাট খোলে, ছোটখাটো ব্যবসা করে পাউন্ড-ইউরো অর্জন করতে থাকে। অন্যরা দেখতে পায় যে, কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের টাকায় দেশে থাকা পরিবার-পরিজনরা সমৃদ্ধির সন্ধান পায়। আরো লোক পাঠায় এবং দেশের মধ্যে ঘরবাড়ি, জমিজমা কিনতে থাকে। নতুন নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে থাকে। পরিষ্কার বোঝা যায়, তাদের অবস্থা চোখে পড়ার মতো ভালো হয়েছে। এ উন্নতি দেখে অন্যরাও বিদেশ গমনে আকৃষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, প্রায় ৪০ বছরে দেশের প্রায় ১০ শতাংশ লোক বিদেশে গেছে।

রঙিলা পুরী স্বাধীন হওয়ার পর আরো একটি বড় সুযোগ আসে। বহু বিদেশী সংস্থা ও দেশ এ দেশের মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। এখানে লাখ লাখ কোটি টাকা আসে এবং এর কিছু অংশ সত্যিকারভাবে উন্নয়নকাজে খরচ হয় আর বাকি অংশ এর-ওর পকেটে চলে যায়। ফলস্বরূপ একটি মধ্যবিত্তশ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে এবং এ মধ্যবিত্তশ্রেণী আবার কিছু কাজকর্ম বাড়ানোয় নিম্নবিত্তরাও উপকৃত হয়। তারা এ উন্নয়নের ছিটেফোঁটা পায় এবং এর ফলে দেখা যায় যে, ৩০-৪০ বছর পার হওয়ার পর রঙিলা পুরীর বিত্তহীন নিম্নবিত্ত হয়েছে। নিম্নবিত্তরা নিম্নমধ্যবিত্ত হয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্তরা মধ্যবিত্ত হয়েছে এবং মধ্যবিত্তশ্রেণীর একাংশ উচ্চবিত্তে রূপান্তর হয়েছে। সুতরাং লক্ষাধিক কোটি টাকা যেহেতু দেশে সাহায্য হিসেবে এসেছে, যারা এর খুব ক্ষুদ্র অংশেরও ভাগীদার হতে পেরেছে, তাদের অবস্থা ভালো হয়েছে। ফলে দেশের মধ্যে কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। বলা যায়, আগের তুলনায় দেশের মানুষ খেয়ে-পরে একটু ভালো আছে।

দুঃখের বিষয়, রঙিলা পুরীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সে দেশের মানুষ খেয়ে-পরে আগের তুলনায় ভালো থাকলেও চলাফেরায় ভালো নেই। কারণ নাগরিকদের ঘর থেকে বেরিয়ে যে অলিগলি, সড়কগুলো দিয়ে চলতে হয়, সেগুলো খানা-খন্দে ভরা। সেখানে তাদের বাহন ঝুঁকিমুক্তভাবে চলে না। যেখানে ২০ মিনিটে যাওয়ার কথা, সেখানে যেতে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় লাগে। তারা বিরক্ত হয়। কোনো রকমে এ থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এখানে বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যায়। বন্যা হলে রাস্তা ভেঙে যায়। চলাফেরায় কোনো ধরনের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। রঙিলা পুরীর খবরের কাগজ দুর্ঘটনা, গুম-হত্যা এসবে ভর্তি থাকে। খাওয়া-পরার অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও সাধারণভাবে রঙিলা পুরীর অধিবাসীদের জীবনমান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আসেনি।

এর মধ্যে কিছু নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। মাঝে খাদ্যে দেশটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অল্প-স্বল্প চাল নাকি রফতানি করা হয়েছে। কিন্তু সুশাসন না থাকায় আস্তে আস্তে বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজগোষ্ঠী, দখলদারগোষ্ঠীর অত্যাচারে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হওয়ার কারণে তার মূল খাদ্যশস্য চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সাধারণ মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে বেঁচে আছে। তারা এখন ভালো করে চাল-ডাল, তরিতরকারি কিনতে পারে না। তাদের খাওয়ার পরিমাণ কমে গেছে। তারা অনেক হা-হুতাশ করে। পত্রপত্রিকায় বহু লেখা বেরোয়। লেখকদের কোনো শক্তি নেই। একদিকে লেখকরা হয়তো চালের ওপরে লিখছেন, চালের দাম হয়তো ১-২ টাকা কমল, হঠাত্ দেখা গেল চিনির দাম বেড়ে গেছে দেড় গুণ। অর্থাত্ ৪০ টাকার চিনি ৬০-৬৫ টাকা হয়ে গেল। তারপর চিনির দাম একটু কমল কিন্তু ২০ টাকার পেঁয়াজ হয়ে গেল ৮০-৯০ টাকা। একদিন হয়তো বাজারে গিয়ে দেখা যাবে, ৪০-৫০ টাকার কাঁচামরিচ ২০০ টাকা হয়ে গেল। রঙিলা পুরীতে এগুলোর ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সরকারেরও নেই। পুরো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের কাছে সরকার বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে বড় অসহায় মনে হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা, এ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটই ভেতরে ভেতরে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে চালায়। তাদের সঙ্গে এদের যোগসাজশ রয়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে আর্থিকভাবে তারা নানা রকম সমর্থন-সহযোগিতা দেয়। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ চুপ থাকে। হয়তো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকেও কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। তারই অনুসরণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। যত লেখালেখি করা হোক না কেন, পত্রিকায় যত খবর প্রকাশ হোক না কেন কিংবা যত রকম মানববন্ধনই হোক না কেন, ক্ষমতাধররা মনে করেন— এতে কি আসে যায়। এতে তাদের কারো গায়ে আঁচড় লাগে না। যারা ভোক্তা, যারা ক্ষতিগ্রস্ত, যাদের ভোগান্তি বাড়ছে, তাদের শব্দ উঁচু স্তরে অধিষ্ঠিতদের কানে যায় না। কানে গেলেও গায়ে লাগে না। তারা মনে করেন, গরিব লোক চিত্কার করছে, করুক। আমার অসুবিধা কী? আমার তো সকালের নাশতা, দুপুরের খাওয়া ভালোই হবে। রাতের খাওয়া ভালো হবে। সুতরাং যারা সত্যিকারভাবে ক্ষমতাবান, যারা এসব বিষয় ঠিক করতে পারতেন, তাদের সেগুলো ঠিক করার প্রয়োজন নেই। তাদের গাড়ি যেকোনোভাবেই চলে যাবে। অথবা তাদের গাড়ি এত মজবুত ও ভালো যে, ছোটখাটো জলমগ্নতা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। রাস্তায় দেরি হলেও তাদের খুব একটা কষ্ট হয় না। একবার এদের একজনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাস্তায় গাড়িতে যে এতক্ষণ পড়ে থাকেন, আপনার কি খারাপ লাগে না, বিরক্ত লাগে না, আপনার কি গাড়ি ছেড়ে হাঁটতে ইচ্ছা করে না? তিনি খুব বাস্তব উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, বিরক্ত লাগে না। আমি গাড়িতে কিছু গানের ক্যাসেট নিয়ে উঠি, সেগুলো বাজাই এবং কিছু কাগজপত্র পড়ি। এসি চলতে থাকে এবং একবার গাড়িতে বসে গেলে আমি ধরে নিই ঘণ্টাখানেক বা কয়েক ঘণ্টা পরে হোক অবশ্যই গন্তব্যস্থলে পৌঁছব। বাকিটা চালক দেখবে। তেল খরচ কত হলো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এত বড় গাড়িতে তেল এমনিতেই বেশি লাগে। রাস্তার অবস্থা খারাপ বা ট্রাফিক জ্যাম বলে আরেকটু না হয় লাগল। এটি তো আমি হিসাব করি না। সুতরাং মোটামুটি এ পদ্ধতিতে চলছি, অসুবিধা হয় না। আর কোনো কোনো সময় আমার চালক বিভিন্ন কায়দায় তাড়াতাড়ি শর্টকাট পথে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে আমার অত খারাপ লাগে না। আমি ক্লাবে যাই। বড় হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করি। আমার পরিবারের জন্য প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার আসে। বাসায় আছে অনেক কাজের লোক। নামিদামি বাবুর্চি। তারা খাবার রান্না করে, আমি খাই। বাসায় এসে আরামে থাকি।’ বিষয়টি এমন যে, সাধারণ মানুষের কি হলো না হলো, সেটা দেখার সময় নেই। একইভাবে সাধারণ মানুষ যারা রঙিলা পুরীর সরকারকে পছন্দ করে, তারা ভালোই আছে। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংযোগ থাকলে তারাও সুবিধার কিছু ছিটেফোঁটা পেয়ে থাকে। সুতরাং দেশে যা-ই হোক না কেন, তারা সরকারের লাইনেই কথা বলে। আর অন্য সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী। তাদের অবস্থা আগেও খারাপ ছিল, এখন আরো খারাপ হয়েছে। তারা তাদের মতো করে টানাটানির সংসারে বেঁচে আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের অবস্থা খারাপ হলে যারা ক্ষমতাধর বা যারা কর্তৃত্বে আছেন, তাদের কি আসলে কোনো কিছু গায়ে লাগে? তারা আসলে এত সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন যে, সহজে দুঃখকষ্ট তাদের স্পর্শ করে না। তারা যখন বক্তব্য-বক্তৃতা রাখছেন, তখন গরিবদের, নিম্নমধ্যবিত্তদের কথা বলছেন। তারা বারবারই বুঝিয়ে বলছেন, আপনারা ভালো আছেন। আপনারা আসলেই ভালো আছেন কিন্তু বুঝতে পারছেন না।

এক হিসাবে তারা ভালো আছে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর যে অবস্থায় তারা ছিল, হয়তো সেই অবস্থায় নেই। আগে যেখানে না খেয়ে থাকত, হয়তো সেখানে এখন একবেলা খেতে পারে। আবার তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতাবানগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত, তারা কিছু বাড়তি আয় করে। এটি অনুপার্জিত আয়। এ অনুপার্জিত আয়ের একটি মজা আছে, এগুলো খরচ করতে ভালো লাগে। সুতরাং সব মেলালে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে, অর্থনীতি ভালো হলেও চলে, অর্থনীতি খারাপ হলেও যাদের হাতে কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদের কিছু যায় আসে না। যারা লেখালেখি করেন, মানববন্ধন করেন, তারাও কিন্তু আস্তে আস্তে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। যারা টেলিভিশনে কথাবার্তা বলেন, তারাও একসময় নিস্তেজ হয়ে যান। এটিকে ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রে বলে ‘ফেটিগ ফ্যাক্টর’। কত আর বলবেন, কত আর লিখবেন। লিখলে তো কারো কিছু আসে যায় না। লিখলে লিখুক, মাঝে মাঝে বিপক্ষের লেখা পড়তে ক্ষমতাধরদের ভালোই লাগে। খবরের কাগজে লিখেছে, তাতে অসুবিধা কী? খবরের কাগজ কম পড়লে বা না পড়লেই হয়। টেলিভিশনে কথা বললে অসুবিধা কী? তিনি বলছেন, অন্যরা শুনছে। ক্ষমতাধররাও মাঝে মাঝে শুনবেন। তাতে তাদের তো খাওয়া-পরাও কমছে না, আয় উপার্জনও কমছে না। তাদের গাড়ির তেলও শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তাদের যে জনবল আছে, তারও কোনো কমতি হচ্ছে না। ধনবলও ঠিক থাকছে। সুতরাং তারা ভালো আছেন এবং দেশও ভালো আছে। মানুষকে বোঝাতে হবে, আপনারাও ভালো আছেন। সেভাবেই তারা বোঝাচ্ছেন। দেশের মানুষ বুঝে নিচ্ছে। দেশের অর্থনীতি খারাপ হলে আসলে কারো কিছু আসে যায় না। সে কারণে রঙিলা পুরীর ব্যাংক, বীমা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হলেও সে দেশের আর্থিক খাতের বড় কর্তা গা-ঝাড়া দিয়ে বলতে পারেন, “সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় এ টাকা অতীব নগণ্য, ‘পিনাট’। দেশের অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাছাড়া সম্পদ থাকলে এর কিছু অংশ তো লুটপাট হবেই। এতে দেশের কিছু আসে যায় না।”

লেখক: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন