ইতিহাস বিকৃতিকারীরা যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশে আর যেন রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, যুদ্ধাপরাধী, খুনি ও ইতিহাস বিকৃতিকারীরা ক্ষমতায় আসতে না পারে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলবোই। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় গতকাল শনিবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক উপস্থিতিতে সমাবেশটি জনসমুদ্রে রূপ নেয়। রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারিভাবে শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালিত হয়। সারাদেশেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ মেতে উঠেছিল এক অন্যরকম উল্লাসে। রাজধানীর আনন্দ শোভাযাত্রা পরবর্তী সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই শাহবাগ মোড়, রমনা পার্ক, হাই কোর্ট মোড়, দোয়েল চত্বর, টিএসসি এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিকাল ৩টা বাজার ৫ মিনিট আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাবেশস্থলে পৌঁছেন। এ সময় উপস্থিত লাখো জনতা একযোগে করতালি ও ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ গগণবিদারী স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা তার ২২ মিনিটের বক্তৃতায় ঐতিহাসিক ৬ দফা, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। ৪৬ বছর আগের এই ভাষণটিকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তর পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর যে ঐতিহাসিক ভাষণটি ক্ষমতা দখলকারীরা নিষিদ্ধ করেছিল, আজ সেই ভাষণটিই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চলে আসা রাজাকার, আল-বদরদের মন্ত্রী করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলন, ‘পঁচাত্তরে কেবল জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়নি, যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই আদর্শকেও ভূলুণ্ঠিত করে রাজাকার আল-বদরদের ক্ষমতায় বসানো হয়। তারা ইতিহাস বিকৃত করে। জাতির পিতার ভাষণ নিষিদ্ধ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু দেশবাসীকে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাংলার মানুষের সঙ্গে জাতির পিতার একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। সেজন্য তিনি সম্বোধন করেছিলেন ভাইয়েরা আমার বলে। তিনি বলেছিলেন, তোমাদের যা যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। আরো বলেছিলেন— ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। এখনো বারবার মনে পড়ে সেই দিনের কথা। শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা জানতেন এই ভাষণের পর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, তাকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে। সে জন্যই তিনি বলে গিয়েছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি… আমাকে যদি হত্যা করা হয়…’। এত দূরদর্শী ভাষণ বিশ্বে আর একটিও নেই।’ শেখ হাসিনা বলেন, এত দূরদর্শী ও এত নির্দেশনা বিশ্বের আর কোনো ভাষণে নেই।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই ভাষণটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আগেও যুক্তরাজ্যের একজন লেখক আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য নিয়ে একটি সংকলন বের করেন। সেখানে ৪১টি শ্রেষ্ঠ ভাষণ স্থান পায়, যার মধ্যে জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণটি গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। শিগগিরই এই জাতি অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে। ২০২১ সালে এ দেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশ।

পুরো অনুষ্ঠানকেই সাজানো হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ২৩ বছরে লড়াই-সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের সেই বীরত্বগাথা ইতিহাসের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াসে। নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি উপভোগ করেন আগত অতিথিরা। এদিকে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শোভাযাত্রা নিয়ে সরকারি চাকুরেরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যেতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশাত্মবোধক নাচ-গান ও অন্যান্য উপস্থাপনা উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। লেজার শোর মাধ্যমে শেষ হয় আনন্দ শোভাযাত্রার এ সমাবেশ।

পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয় আবৃত্তিকার হাসান আরিফ এবং জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা শমী কায়সার। শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনায় প্রথমেই ‘ধন্য মুজিব ধন্য, বাংলা মায়ের জন্য’ গানের তালে তালে কোলাজ নৃত্য পরিবেশন করেন ছোট্ট সোনামণিরা। সবশেষে মঞ্চে উঠে আসেন দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সর্বস্তরের

মানুষের শ্রদ্ধা

বেলা ১২টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে সরকারিভাবে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের স্বীকৃতির এ উদযাপন শুরু হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এরপর বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, আইজিপি একেএম শহীদুল হকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। পরে সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শুরু হয় শোভাযাত্রা। পরে একে একে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, বিআইডব্লিউটিসি, পর্যটন কর্পোরেশন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

আনন্দ শোভাযাত্রাকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে বর্ণাঢ্য আলোকসজ্জা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর রঙ-বেরঙের ডিসপ্লে ছাড়াও ব্যানার, ফেস্টুন এবং শত শত পোস্টার লাগানো হয়। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এ শোভাযাত্রাকালে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশজুড়ে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার, আলোকচিত্র, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ নানা অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে।