২১ কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি ক্রয়: নাহী

মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় থাকা নাহী অ্যালুমিনাম। আইপিও প্রসপেক্টাসে (কোম্পানির বিবরণী) গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ নামে এক কোম্পানির কাছ থেকে ২১ কোটি টাকা মূল্যের মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনার তথ্য দিয়েছে নাহী। অথচ অনুসন্ধানে গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। গত ২৭ জুলাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকে আইপিও প্রক্রিয়ায় দেড় কোটি শেয়ার বিক্রি করে ১৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন পায় নাহী। ইতিমধ্যে শেয়ার বিক্রি শেষ করেছে কোম্পানিটি। এখন তালিকাভুক্তি ও লেনদেন শুরুর অপেক্ষায় আছে।

প্রসপেক্টাসে এমন মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণ কী হতে পারে- এমন প্রশ্নে বিশ্নেষকরা জানান, নিজেদের বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখানোর জন্য উদ্যোক্তারা এমন জালিয়াতি করতে পারে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী কোম্পানির ক্ষেত্রে এটি বেশি হয়। পুঁজিবাজারে আসার আগে ভুয়া বিনিয়োগ দেখিয়ে নিজেদের শেয়ারের অংশ বাড়িয়ে নেন তারা।

নাহী এমনটি করে থাকলে তা বড় ধরনের জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত হবে মনে করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের বিজনেস অনুষদ বিভাগের ডিন মোহাম্মদ মূসা। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার অর্থ হলো ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর ও আন্ডাররাইটাররা (আইপিওতে বিক্রীত শেয়ার কেনার নিশ্চয়তা প্রদানকারী) তাদের দায়িত্ব পালন করেনি বা তারা এ কাজে অযোগ্য। অথবা টাকার বিনিময়ে অসততা করেছে। ঘটনাটি সত্য হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে লাইসেন্সও বাতিল করতে পারে বিএসইসি।’

আমদানি ও রফতানি নিবন্ধক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কোম্পানি নিজ কারখানার জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করলে, তার শুল্ক্ক মাত্র এক শতাংশ। আর দেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানি করলে তার ওপর শুল্ক্ক ও ভ্যাট ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। একান্ত বাধ্য না হলে বা অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া পুরনো কোম্পানি সরবরাহকারীর কাছ থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনে না।

নাহী অ্যালুমিনাম বিবিএস গ্রুপের একটি কোম্পানি। ২০১৪ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আসে তারা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে উদ্যোক্তা-পরিচালক ও তাদের নিকটাত্মীয়রা প্রাইভেট প্লেসমেন্টে ২৩ কোটি টাকার নতুন শেয়ার নেন। এতে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি থেকে বেড়ে ৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। পাঁচ উদ্যোক্তা-পরিচালক ১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার মোট ১২ কোটি টাকায় কেনেন। বাকি ১ কোটি ১০ লাখ শেয়ারের সিংহভাগই দিয়েছেন নিকটাত্মীয়দের নামে।

নাহী অ্যালুমিনামের আইপিও প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোম্পানিটি ২০১৩ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের মে পর্যন্ত ২৫ দফায় মোট ৩৫ কোটি ২৬ লাখ টাকায় ৩২ ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি ক্রয় করে। মূলধনী যন্ত্রের চারটি ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে চীনা কোম্পানি সেনজেন জুন্টু থেকে ১৪ কোটি ২২ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির বাকি ২৮টিই ২০১৩ সালের মার্চ থেকে গত বছরের মে মাসের মধ্যে কেনা হয়েছে দেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ থেকে। যার দাম ছিল মোট ২১ কোটি ৪ লাখ টাকা। এমনকি ২০১৪ সালের ৩ জানুয়ারি একই দিনে চীন থেকে আমদানি ও গ্লোরীর কাছ থেকে মেশিন ক্রয়ের তথ্য রয়েছে।

প্রসপেক্টাসে গ্লোরী এন্টারপ্রাইজের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাড়ি। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ওই ভবনের পুরোটায় কাজী সালাউদ্দিন পিন্টু নামে এক ব্যক্তি ‘হোটেল এয়ার ইন’ নামে হোটেল ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে এ বাড়িটি আবাসিক হোটেল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ নামের কোনো কোম্পানির অফিস এ ভবনে ছিল না।’ তবে অনুসন্ধানে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরের ৩২২/১ সেনপাড়া পর্বতার ঠিকানায় গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই কোম্পানির মালিক রেজাউল হক মানিক জানান, তিনি শুধু গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ আমদানিকারক ও সরবরাহকারকের ব্যবসা করেন। নাহী নামে কোম্পানিকে চেনেন না।

নামের সঙ্গে কিছুটা সঙ্গতিপূর্ণ আরও এক কোম্পানির সন্ধান মিলেছে। জেএম করিম নেওয়াজ নামের এক ব্যক্তির গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ (বাংলাদেশ) লিমিটেড নামে কোম্পানি আছে। তারও ব্যবসা শুধু গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজের। রাজধানীর ফকিরাপুলের আলিজা টাওয়ারে তার অফিস। এ ছাড়া ঢাকার মতিঝিলে গ্লোরী নামে একটি ব্যবসায়িক গ্রুপ আছে। তবে গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ নামে বা মূলধনী যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোনো কোম্পানি নেই এ গ্রুপের।

মূলধনী যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী গ্লোরী এন্টারপ্রাইজ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাহী অ্যালুমিনামের কোম্পানি সচিব জহুরুল ইসলাম শেখ আইপিও প্রসপেক্টাসে দেওয়া ঠিকানাটি উল্লেখ করেন। ওই ঠিকানাটি ঠিক আছে কি-না তা নিশ্চিত করতে বললে দুই সপ্তাহেও তা জানাতে পারেননি। এমনকি গেল্গারীর টেলিফোন নম্বর চাইলে বলেন, ওই নম্বরটি এখন খালি। এক সপ্তাহ আগে কোম্পানি সচিব জানিয়েছিলেন, তার কোম্পানির এমডি আবু নোমান হাওলাদার এ নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি ১৯ নভেম্বর (গতকাল) কথা বলবেন। গতকাল যোগাযোগ করা হলে সচিব সাড়া দেননি। এমডিও কথা বলতে রাজি হননি।

শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান বেনকো ফাইন্যান্স আইপিও প্রসপেক্টাসে প্রদত্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে এর সত্যতা নিশ্চিত করে সনদ দিয়েছে। অন্তত এক মাস ধরে এ ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে যোগাযোগ করা হলেও এই ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠানটির এমডি মোহাম্মদ হামদুল ইসলাম সাড়া দেননি। নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জোহা জামান কবির রশীদ অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার মো. ইকবাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘নাহীর এমডি বলেছে, তারাই এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবে।’

বিএসইসির শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, সত্যি যদি এমনটা ঘটে থাকে তবে তা ভয়াবহ প্রতারণার শামিল। বিষয়টি কমিশন খতিয়ে দেখবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দোষী প্রমাণ হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে। এমনকি এ ঘটনায় সংশ্নিষ্ট ইস্যু ম্যানেজার, বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এবং আন্ডাররাইটারদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।’

গ্রুপের অন্য কোম্পানিতেও একই ঘটনা : অস্তিত্বহীন কোম্পানির কাছ থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ক্রয় দেখানো এই ব্যবসায়ী গ্রুপের জন্য নতুন কিছু নয়। নাহী অ্যালুমিনামের আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বিবিএস কেবলসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, বিবিএস কেবলসের মূলধনী যন্ত্রপাতির সিংহভাগ কেনা হয়েছে গোমতী ট্রেডার্স নামের দেশি কোম্পানির কাছ থেকে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন ও ভারতে তৈরি ১২৪টি মূলধনী যন্ত্রপাতির মধ্যে ৯৬টিই এ কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোমতী ট্রেডার্স বিবিএস কেবলসের পরিচালক আশরাফ আলী খানের। গত ১২ বছরে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম নেই। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোথাও ভুল হচ্ছে। বহু বছর গোমতীর কার্যক্রম, এমনকি লাইসেন্সও নেই। কেউ হয়তো ভুল করে আইপিও প্রসপেক্টাসে এ তথ্য দিয়েছে।’

আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোম্পানির সংশ্নিষ্ট কারও সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘রিলেটেড পার্টি ট্রানজেকশন’ নামে পৃথক ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিবিএস কেবলস এ তথ্যও গোপন করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, সংশ্নিষ্ট ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর বা আন্ডাররাইটার কেউই এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি।