হিংসা-বিদ্বেষ উপড়ে ফেলতে হবে

হাসান আজিজুল হক:  হিংসাশ্রয়ীদের ছোবল পড়ল রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়া গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর। ফেসবুকে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, অঘ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে রামু ও নাসিরনগরের সেই নৃশংসতার অধ্যায়। এই মর্মন্তুদ ঘটনায় ইতিমধ্যে প্রশাসনিক দুর্বলতার কথা উঠেছে। ৫৭ ধারায় তড়িঘড়ি করে মামলা গ্রহণের বিষয়েও উঠেছে কথা।

ইসলাম ধর্মের অবমাননার অভিযোগ এনে রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামে যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে, তা এই রক্তস্নাত বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত হলেও এ রকম ঘটনা সুযোগ-সন্ধানীরা সুযোগ পেলেই ঘটিয়ে ফায়দা লুটে নিতে চাচ্ছে। কেউ যদি অন্য কারোর ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে থাকে, তবে অবশ্যই এর কঠোর প্রতিকার হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ের আগেই হিংসাশ্রয়ীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। আমরা বলব না যে, সরকার এসব ব্যাপারে সজাগ নয় কিংবা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কিন্তু আরও কঠোর হতে হবে এবং সব নাগরিকের অধিকার যাতে নিশ্চিত থাকে তা লক্ষ্য রাখা দরকার।

ধর্ম নিশ্চয়ই মানুষকে হিংসাশ্রয়ী করে তোলার অনুপ্রেরণা জোগায় না। ফেসবুকে কথিত ধর্মীয় কটূক্তির জের ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ইতিমধ্যে কম ঘটেনি। কিন্তু কোনো একটি ঘটনার যেমন দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিশ্চিত করা যায়নি, তেমনি এসব ঘটনা থেকে এই সমাজ কোনো শিক্ষাও নেয়নি। সরকার অবশ্যই প্রত্যেকটি ঘটনার পর পদক্ষেপ নিয়েছে; কিন্তু সবকিছু এক পর্যায়ে গিয়ে থেমে আছে। মামলা হয় কিন্তু এর অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় না!

গত ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায় যা ঘটেছে তাতে অনেকেরই ধারণা, এটি কোনো পরিকল্পিত পরিকল্পনার দুঃসহ ক্ষত। বাড়িঘর-মন্দিরসহ সংখ্যালঘুদের অন্যান্য সম্পদে আগুন দিয়েই স্বার্থান্বেষী মহল, দুর্বৃত্তচক্র নিবৃত্ত হয়নি, তারা লুটপাটও করেছে সমান্তরালে। এই সহিংস ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের উৎস খুঁজে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার বরাবরের মতোই আমরা প্রত্যাশা করি বটে; কিন্তু একই সঙ্গে হতাশার ছায়াও দেখি। জানা গেছে, ওই ঘটনায় কয়েকজন ‘ইন্ধনদাতা’কে পুলিশ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে, বেশ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে এবং এর প্রতিকারে যথাযথ পথ অনুসরণ করা হয়েছে।

গ্রেফতার করা হয়েছে সেই অভিযুক্ত টিটু রায়কেও। গঙ্গাচড়ায় মানবতা পুড়েছে, এটিই হলো সত্য। বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টার অংশ হতে পারে এমন ঘটনা। যদি এই হয় অবস্থা, তাহলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এখনই সতর্কতা অবলম্বন অধিকতর জরুরি। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে যদি কেউ এ রকম ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্র তৈরি করতেই থাকে, তাহলে কীভাবে এর স্থায়ী প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়, তাও ভাবতে হবে দায়িত্বশীল সবাইকে নির্মোহ ও সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান নিয়ে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, রামু ও নাসিরনগরের ক্ষত এখনও শুকায়নি। রংপুরের ক্ষতও সহজে শুকাবে না, যদি বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী, হিংসাশ্রয়ীদের শিকড়-বাকড় সমূলে উৎপাটন করা না যায়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতিতে যারা বারবার কলঙ্ক লেপনে বিভিন্ন অজুহাতে তৎপর হয়ে ওঠে, তারা দেশ-জাতির গুরুতর শত্রু। প্রশ্ন হচ্ছে, রংপুরের গঙ্গাচড়ার অঘটনটি কি হঠাৎ করেই ঘটেছে? যখন এ রকম বৈরী হাওয়া বইছিল, প্রশাসন তখন কেন যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি? প্রশাসন যদি আগাম যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তাহলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব না-ও হতে পারত। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে এবং ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ফেসবুকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে স্ট্যাটাস দিয়ে স্বার্থান্বেষীরা যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল- দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, কোনো ঘটনায় এখন পর্যন্ত অপরাধীরা শাস্তি পায়নি সরকারের তাৎক্ষণিক তৎপরতার পরও।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঘটনাটি এখন পর্যন্ত রহস্যাবৃত। গঙ্গাচড়ার আক্রান্তরাই শুধু নয়, শান্তিপ্রিয় সবাই সন্ত্রস্ত। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুরপাড়া গ্রামে আতঙ্ক এখনও কাটেনি। কাটার কথাও নয়। যারা নানা অজুহাতে কিংবা কারও হীন চক্রান্তের কারণে বারবার আক্রান্ত হচ্ছে, সর্বস্ব হারাচ্ছে, ক্ষতের ওপর ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রশক্তিকে আরও কর্তব্যপরায়ণ হতে হবে। ক্ষত উপশমের স্থায়ী দাওয়াই প্রয়োগে ব্যর্থতার খেসারত যাতে সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়, তা নিশ্চিত করতেই হবে।

আমাদের অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে যে, গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করেই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা যায় না। রাষ্ট্র কীভাবে চলবে তা শেষ পর্যন্ত স্থির হয়ে যায় সমাজের প্রকৃতি ও বিন্যাস দিয়েই। উল্লেখ্য, ভারতের সংবিধান গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষও বটে। তবুও সেখানে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনা ভারতীয় সংবিধানের উলঙ্গ লঙ্ঘন ঘটিয়েছিল। সংবিধান মাফিক সেক্যুলার রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও চরম সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড ভারত ঠেকাতে পারেনি। তবে এটা ঠিক যে, সংবিধান যতদিন গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে, ততদিন ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের পক্ষের শক্তির একটা আলাদা জোর থাকবে।

সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ না হলে এই জোরটা পাওয়া সহজ নয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর বাংলাদেশে পৌঁছতে না পৌঁছতে এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে হামলা হয়েছিল, সেই কলঙ্কের দাগ আমরা আমাদের দেশের ইতিহাস থেকে কোনো দিন মুছে ফেলতে পারব না। সংবিধানের কথা থাক, অত্যন্ত সাদামাটা যুক্তিতেও ওই ঘটনা ঘটার পক্ষে কোনো অজুহাত খাড়া করা যাবে না। বিভিন্ন দেশের মৌলবাদী শক্তি একই কাজ করে। বস্তুত পৃথিবীর সব মৌলবাদী শক্তি এক এবং অভিন্ন।

দেশে দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তিই আসলে নিজ নিজ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত হয়। আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক নীতি হিসেবে কিছুকাল ছিল, এখন নেই। কাজেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে লুণ্ঠন ও তৎসঙ্গে বর্বরোচিত তাণ্ডব চালানো হয়, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার সময়েও সাংবিধানিকভাবে জোরদার অভিযোগ তোলা যায় না।

প্রকৃতই যদি রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়, তাহলে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আরও বেশি জোরালো হতে বাধ্য। গণতন্ত্র অবশ্য আমাদের সংবিধানে মৌলিক নীতি হিসেবে আছে। সে জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা যায়। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার কারণেই একজন নাগরিক সর্বস্ব হারাবে; কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট অত্যাচারের কোনো প্রতিকার সাংবিধানিকভাবে হবে না, এমনটি অনাকাঙ্ক্ষিত। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আমাদের দেশে গণতন্ত্রের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার সহাবস্থান রয়েছে। আমরা তো জানি এবং প্রতিনিয়ত প্রমাণও পাচ্ছি যে, প্রচণ্ড বর্ণবৈষম্য এবং সেই কারণে দারিদ্র্য, কর্মহীনতা দেশকে পঙ্গু করে দেওয়া, বেকারত্ব ইত্যাদি সবই গণতন্ত্রের সঙ্গে গলায় গলায় মিশে সহাবস্থান করছে।

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকুক আর না থাকুক, আমাদের সমাজ যদি প্রকৃতই সুস্থ ও গণতান্ত্রিক হতো, তাহলে রামু, নাসিরনগর ও ঠাকুরপাড়ার মতো ঘটনা অশুভ শক্তি ঘটাতে পারত না। আর তারা যে সেটা ঘটাতে পেরেছে তার একটা কারণ, আমাদের এই বিকার হওয়া অসুস্থ সমাজ তো বটেই; অতিরিক্ত কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রশ্রয় পাওয়ার প্রত্যাশা। কারণ রাষ্ট্র তো ধর্মনিরপেক্ষ নয়। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর কী ঘটেছিল তাও সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। সে জন্য গণতন্ত্রের নীতি যে দুই-চার-দশ গজ যেতে পারত, তার বাইরে শত শত মাইল বিস্তীর্ণ বাংলাদেশে অশুভ শক্তিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া সহজেই সম্ভব।

সংবিধানের এই ফাঁকটাকে অবলম্বন করে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি নিজেকে বাড়াবার এবং অসম সমাজ ব্যবস্থার শিকার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ও সমাজবিরোধী মাস্তান শক্তি এবং বিপথগামী যুব সম্প্রদায়কে অপশক্তির সঙ্গে জুড়ে দিতে বাড়তি বল পেয়ে যাচ্ছে। অন্তত সংবিধানে যদি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থাকত, তাহলে এই বাড়তি জোর আসার উৎস থাকত না। তারপর গোদের উপর বিষফোঁড়া হচ্ছে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে সংযোজিত করা। যারা এটা করলেন তারা ইসলামের ইতিহাসই ভুলে গেছেন। রংপুরের ঠাকুরপাড়া, চট্টগ্রামের রামু কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্নেষণ করে সেই নিরিখে আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এই জরুরি কাজটি করতে হবে নির্মোহ অবস্থান থেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে কালক্ষেপণ না করে।

ক্ষমতা থাকে, আবার থাকে না। এই আসে, এই যায়। কিন্তু দেশ থাকে। বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে এই কথা অবশ্যই বলার বিষয় যে- দেশ থাকে। ক্ষমতায় বসা তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ। মানুষকে মুক্তি দেওয়া, সমাজকে মুক্তি দেওয়া, বুদ্ধি-বিবেচনা, বিচারশক্তি পরিচালনার সুযোগ দেওয়া যখন ক্ষমতায় বসার উদ্দেশ্য হয়, তখনই ক্ষমতা ব্যবহারের একটা অর্থ দাঁড়ায়। বাংলাদেশে তা কবে ঘটবে? জয় হোক মানবতার। সভ্যতার বড়াই করার ভিত যেন দুর্বল না হয়, তা নিশ্চিত করা সচেতন ও দায়িত্বশীল সবার কর্তব্য।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক