সাংবাদিকই সংবাদ যেখানে

ইমতিয়ার শামীম: একজন সাংবাদিক নিখোঁজ রয়েছেন মাসখানেক হতে চলল; এখনও তার নিরুদ্দেশে থাকার নাকি কোনও ক্লু-ই মিলছে না। তার স্কুল শিক্ষক বাবা কাঁদছেন, মা কাঁদছেন, বন্ধুরা তার জন্মদিনে তার অনুপস্থিতিতে শোকার্ত হচ্ছেন; কিন্তু চারপাশ বড্ড নির্লিপ্ত, বড় নিস্পৃহ, মানুষের চোখ নেহাৎই মৃত মাছের মতো। আমাদের নীরবতার একটাই অনুবাদ— উত্তেজিত হবেন না, এ দেশে এরকমই হয়, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সহৃদয় পুলিশ তদন্তে কী না কী পাচ্ছেন, নিখোঁজের স্বজন-বন্ধুদের কাছে খবর পাঠাচ্ছেন, পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে তাকে; তার পরই আবার সংশোধনী পাঠাচ্ছেন, না, সংবাদটি সঠিক ছিল না। তার মোবাইল ফোনও কদাচিৎ খোলা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সেই মোবাইলের অবস্থান নাকি শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

কয়েক দশক আগে মোবাইল ফোন ছিল না, প্রযুক্তির এত অভাবনীয় বিকাশও হয়নি। তার পরও একমাস ধরে এভাবে কোনো নাগরিক সাংবাদিক নিরুদ্দেশে থাকলে শুধু মানববন্ধন আর সংবাদ সম্মেলনকেই মানুষজন যথেষ্ট মনে করত না। তোলপাড় শুরু হতো, প্রতিবাদের ঝড় উঠত, পত্র-পত্রিকায় তথ্যানুসন্ধান শুরু হতো। এখন তথ্যপ্রযুক্তির এত বিকাশ ঘটেছে যে, অন্তত মোবাইলবাহী কারও পক্ষে নিখোঁজ থাকা সম্ভব নয়। তার মোবাইল ফোন শেষ কোন অবস্থানে ছিল, একই অবস্থানে বা আশপাশে আর কোন কোন মোবাইল ছিল; নিরুদ্দেশ ব্যক্তির মোবাইলে শেষ কথা কার সঙ্গে হয়েছে, সেই মোবাইল নম্বরের অবস্থান তখন এবং এখন কোথায় আছে— এরকম সব হিসেব-নিকেশ থেকে সহজেই আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তার পরিণতি চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও আমরা কোনো আশার আলো দেখছি না।

তা হলে কী হবে উৎপল দাসের? তিনিও কি সেইসব মানুষদেরই একজন, যাদের কোনো সন্ধান মিলছে না? তাদের সঙ্গে উৎপলের পার্থক্য কি শুধু এ টুকুই যে, অন্যদের তা-ও কেউ না কেউ গাড়িতে বা জিপে তুলে নিতে দেখেছে; কিন্তু উৎপলকে নিখোঁজ করার কাজটি এতই নিখুঁত যে, কেউ-ই দেখেনি? প্রশংসাই কি করব তবে এমন সফলভাবে কাজটি করেছে বলে? সংবাদকর্মীরা স্বীকার করুন বা না করুন, সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠকদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এখন প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছেন। আর এ রকম ধারণা যে একেবারে ভুল নয়, তা বোঝার জন্য বোধকরি দু-একটি তথ্যই যথেষ্ট— বাংলাদেশের অবস্থান এখন সাংবাদিক হত্যায় বিচার না হওয়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দশম। তা ছাড়া ৫৭ ধারায় মামলার মুখোমুখি হওয়াই এখন নিয়তি তাদের। অস্বাভাবিক মৃত্যু ও বিচারহীনতাই যদি অনুসন্ধিৎসু ও বিশ্লেষক সাংবাদিকের পরিণতি হয়, ৫৭ ধারা যদি তাদের সামনে দিনরাত ঝুলিয়ে রাখা হয়, তা হলে চাপমুক্ত থাকার বোধকরি একটিই পথ খোলা থাকে— দায়িত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার অজুহাতে নিজে থেকেই সযত্নে সংবাদ ও সংবাদভাষ্য সেন্সর করে চলা।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এই অসহায়তার চিত্র তুলে এনেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। গত পহেলা নভেম্বর সংগঠনটি ‘গেটিং অ্যাওয়ে উইথ মার্ডার’ নামে যে প্রতিবেদন ছাপিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যায় বিচারহীনতার এ চিত্র উঠে এসেছে। গত বছরও সংগঠনটির এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান দশমই ছিল। দশ বছরের সাংবাদিক হত্যা ও হত্যা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার দৃষ্টান্ত অনুসন্ধান করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এ তালিকায় শুধুমাত্র সেইসব দেশকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেগুলোতে অন্তত পাঁচজন বা তারও বেশি সংখ্যক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। চলতি বছর এটি প্রণয়ন করা হয়েছে ২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

একদিকে হত্যা, আরেকদিকে নিখোঁজ হওয়া, মামলার চাপে পর্যুদস্ত হওয়া আমাদের সংবাদপত্র শিল্পকে বোধকরি আরও ভঙ্গুর করে তুলছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে সাংবাদিক লাঞ্ছনা, হয়রানি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে ১১৭টি; আগের বছর ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল আরও বেশি ২৪৪টি। এ বছরের ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আর্টিকেল-১৯ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে নির্যাতন ও সহিংসতা চলেছে ১৪১ জন সাংবাদিকের ওপর। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রকাশনা কর্মীসহ ১৪৭টি ইস্যুতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩২০টি। লেখাই বাহুল্য, এসব পরিসংখ্যান সব সময়ই অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে। ২০১৭ সালের এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান এখনও আমাদের হাতে আসেনি; তবে সারা বছরের ছাড়া-ছাড়া অভিজ্ঞতার আলোকে খোলাখুলিই বলা যায়, এ দেশের ২০১৭ সালের সাংবাদিকতার ইতিহাস জ্বলজ্বল করবে বোধকরি ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগের কারণে। আইসিটি আইনে সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো মামলা হয়েছে, তার প্রায় সবই হয়েছে এই ৫৭ ধারাতে। চলতি বছর এই ধারায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও ১৯টিরও বেশি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১১ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মন্ত্রী-সাংসদদের ঘনিষ্ঠজনরা। সরকারি দল আওয়ামী লীগ অবশ্য ইতিমধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, দলের কেউ যদি এ ধারায় মামলা করতে চান, তা হলে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি নিতে হবে। ঠিক একইভাবে পুলিশের আইজিপি-ও ঘোষণা দিয়েছেন, এই ধারায় মামলা গ্রহণ করতে হলে পুলিশ সদর দফতরের পরামর্শ লাগবে। তা হলে কোন পরামর্শ বা অনমুতির ছোঁয়ায় এই ৫৭ ধারা কয়েকদিন আগে এমনকি সাংবাদিকদের ভাগ্যাকাশে দেখা দিল নিজেদের মধ্যে কাঁদা ছোড়াছুড়ির হাতিয়ার হয়ে? খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাংবাদিক সুব্রত কুমার ফৌজদারের বিরুদ্ধে একই এলাকার বাস্তুহারা লীগের সাধারণ সম্পাদক জয়দেব কুমার মণ্ডল বাদি হয়ে কীভাবে মামলা করলেন এ ধারাতে। খুব বেশিদিন আগে নয়, গত আগস্টের প্রথম দিকে এই সুব্রত কুমার ফৌজদারকেই তো দেখা গিয়েছিল ডুমুরিয়ার আরেক সাংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়লের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করতে!

আইনের এমন ব্যবহার ঘটছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বছরের পর বছর ধরে লালন করা হচ্ছে, উৎপলের নিরুদ্দেশযাত্রা এসবেরই ধারাবাহিকতার ফসল। উৎপলের বয়স মাত্র ২৯; কিন্তু ২৯ কিংবা ৪৯ নয়, ৪৯ কিংবা ৭৯ নয়, যে কারও জন্যেই এমন ঘটনা ভবিতব্য হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, কেবল উৎপলের বাবা-মা’র চোখ থেকেই জল ঝরছে, সারা জীবন নির্বিরোধজীবন যাপনকারী এক স্কুল শিক্ষককেই হয়তো সন্তানের খোঁজে পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে; কিন্তু বাস্তবতা হলো, সারা বাংলাদেশই কাঁদছে এখন। কারণ সাংবাদিকরা তো সব সময়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকেন; কিন্তু যখন চূড়ান্ত নিরাপত্তাহীনতার খপ্পরে পড়েন, যখন সেল্ফ-সেন্সরের ফাঁদে আটকা পড়েন, তখন আসলে সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিকতা নয়, যাবতীয় সাফল্য নিয়েও একটি দেশ আসলে ভয়ংকর এক গহ্বরের দিকে হাঁটতে থাকে।

লেখক: সাংবাদিক