আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযুক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে -ড. আতিউর রহমান

বিশেষ প্রতিবেদন : “বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এশিয়ার গুরুত্ব বিগত দশকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সংযুক্তি বৃদ্ধি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু পুরো এশিয়া অঞ্চলের এবং দক্ষিণ এশিয় উপ-অঞ্চলের রাজনৈতিক সংকট এক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর জনস্বার্থে এসব সংকট মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।” বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। আজ নেপাল চায়না ফ্রেন্ডশিপ ফোরামের উদ্যোগে কাঠমুন্ডুতে আয়োজিত ‘কনট্যুরস অফ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) ইনিশিয়েটিভ ফর সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে সম্মেলনের একটি অধিবেশনের সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেপালের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহেন্দ্র বাহাদুর পান্ডে। প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারত, চীন এবং পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা। এদের মধ্যে ছিলেন নেপাল ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. শঙ্কর শর্মা, দিল্লীর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. প্রবীর দে, চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শুচাং হি, এবং ইসলামাবাদের সাংবাদিক শাফকাত মুনীর।

বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাবস্থাতে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ মন্দা মোকাবিলার সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে বলে মত প্রকাশ করেন ড. আতিউর। তিনি বলেন যে বেশ কিছু কাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সহায়তা কমে আসছিলো, আর এই সময়েই চীন একটি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতও বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে ঋণ সহায়তা দিতে শুরু করেছে।এই প্রেক্ষাপটে চীনের নেতৃত্বে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যার মাধ্যমে এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইউরোপের ৬৫টি দেশের ৪.৪ বিলিয়ন মানুষের সংযোগ ঘটবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এই সূবর্ণ সুযোগ নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানো উচিৎ, যাতে করে ইতোমধ্যেই অর্জিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তারা আরও এগিয়ে যেতে পারে। তবে এজন্য চীনকেও দক্ষিণ এশীয় পণ্য তার বাজারে ঢোকার সুযোগ করে দিতে হবে।

ড. আতিউর আরও বলেন, “এ কথা মানতে হবে যে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বেশকিছু পারস্পরিক রাজনৈতিক সংকট রয়েছে যেগুলোর সমাধানের জন্য সুবিবেচনাভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।” উদহারণ হিসেব তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে চলমান সংকট এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার রোহিঙ্গা সংকটের কথা বলেন। “কিন্তু আমরা আশাবাদী যে এক সময় এসব ‘রাজনৈতিক সংকটের’ চেয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ‘অর্থনৈতিক সুফলগুলোই’ আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠবে”- বলেন ড. আতিউর। তিনি আরও বলেন যে চীনের সাথে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক যুক্ততার কারণে অদূর ভবিষ্যতেই ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য’ এমন সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বর্তমানে চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতি বছর ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের পণ্য লেনদেন হচ্ছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সহযোগি এবং শ্রীলঙ্কা ও নেপালের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সহযোগিতা।

ওবিওআর-এর আওতায় যে ধরণের আন্ত:দেশীয় প্রকল্প প্রস্তাব করা হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল দেশের অংশীদারদের মতামত নেয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন ড. আতিউর। বিবিআইএন-এমভিএ (বাংলাদেশ, ভূটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে বাধাঁহীন সড়ক যোগাযোগ বিষয়ক চুক্তি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে সেগুলো এক্ষেত্রে অনুসরণীয়। ওবিওআর-এর মতো আন্ত:দেশীয় যুক্ততা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুবিবেচনাভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজনীয় বলে ড. আতিউর অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশ- ভারত ও চীনকে এক্ষেত্রে উদার কূটনৈতিক জায়গা থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কাজেই চলমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করে যাতে দ্রুত আঞ্চলিক সংযুক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগগুলোকে বাস্তবায়িত করা যায় সে জন্য এই দুটি দেশকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অধ্যাপক শুচাং চীনের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড- কে উদার অর্থনীতি, সাধারণ নিরাপত্তা আর সহযোগিতামূলক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বহুপাক্ষিক উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিশেষে ড. আতিউর এশিয়ার দেশগুলোকে সকলের সাধারণ সমৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। এমন কি অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।