তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা

নিউজ ডেস্ক: গত ৪ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের রাজু আহমেদ নামের এক ব্যক্তি সেখানকার থানায় যান অভিযোগ নিয়ে। তার দাবি ছিল, ওই এলাকার বাসিন্দা টিটু রায় তার ফেসবুক আইডি থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর কার্টুন ও লেখা পোস্ট করেছেন। এরপর গঙ্গাচড়া থানা পুলিশ বিষয়টি আমলে নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলার প্রক্রিয়া শুরু করে। মামলার অনুমতি চেয়ে বিষয়টি ফ্যাক্সে পাঠানো হয় পুলিশ সদরদপ্তরে। ৬ নভেম্বর টিটুকে আসামি করে মামলা দায়ের হয়।

এমন স্পর্শকাতর অভিযোগের ব্যাপারে কেন আরও নিবিড় তদন্ত ও যাচাই-বাছাই ছাড়া পুলিশ দ্রুত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা নিল- এই প্রশ্ন উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫৭ ধারার মামলা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে গত আগস্টে পুলিশ সদরদপ্তরের এক নির্দেশনায় বলা হয়, পুলিশ সদরদপ্তরের পরামর্শ ছাড়া এ ধারায় মামলা করা যাবে না। ওই নির্দেশনার পর অনেককে মামলার অনুমতির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রংপুরের ঘটনায় কীভাবে এত দ্রুত মামলা রুজু হলো? এমনকি আগে থেকে এ বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও কেন ১৪৪ ধারা জারি করা হয়নি, উঠেছে সেই প্রশ্নও।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, টিটুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার পর থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনকে চাপে রেখেছিল স্থানীয় একটি বিশেষ মহল। তাই তাড়াহুড়ো করে ৫৭ ধারায় মামলা নিয়ে চাপমুক্ত হতে চেয়েছিল পুলিশ।

গতকাল রাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, ফেসবুকে বিতর্কিত বিষয় ছড়ানোর অভিযোগ তুলে এর আগেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে। তাই রংপুরে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশের আরও যাচাই-বাছাই করে মামলা দায়ের ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সেই সাবধানতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেই আরেকটি তাণ্ডব হলো। রংপুরে সামনে নির্বাচন রয়েছে। এমন সময় এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটিয়ে কেউ সুবিধা নিচ্ছে কি-না তাও তদন্ত করা উচিত।

এর আগে ২০১৬ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে নিরীহ ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে কথিত ফেসবুক আইডি থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার কথা প্রচার করে একটি মহল পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলে। পরে তদন্তে দেখা যায়, দুটি এলাকায় যে দুই যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তারা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। নিকট অতীতে ভার্চুয়াল জগতে অন্যকে ফাঁসিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের এমন নজির থাকলেও কেন টিটু রায়কে আসামি করে তড়িঘড়ি মামলা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোতোয়ালি, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ থানার পুলিশ গিয়ে শটগানের গুলি ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে। এ সময় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাত পুলিশ সদস্যসহ ২৫ জন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, টিটুর নাম ব্যবহার করে ফেসবুকের যে কথিত আইডি থেকে ধর্ম অবমাননাকর কার্টুন ও পোস্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেই আইডি গত সেপ্টেম্বরে খোলা। ‘মো. টিটু’ নামে ফেসবুক আইডি খোলা হলেও গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা টিটুর প্রকৃত নাম টিটু রায়। গতকালও রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার ফেসবুক সচল ছিল। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটে মো. টিটু নামের কথিত ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম অবমাননাকর ওই কার্টুন ও পোস্ট দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের পোস্ট ও কার্টুন ওই দিন ৯টা ৪ মিনিট, ৯টা ৭ মিনিট, ৯টা ৩০ মিনিট, ৯টা ৩১ মিনিট, ৯টা ৩২ মিনিট, ৯টা ৩৩ মিনিটে দেওয়া হয়। ২৭ অক্টোবরও একই ধরনের একটি পোস্ট রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, টিটু রায় কেন ‘মো. টিটু’ নামে ফেসবুক আইডি খুললেন। এ ছাড়া ওই নামের আইডিতে বেশকিছু অশ্নীল ছবি পোস্ট করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত মো. টিটু নামের আইডি থেকে বিতর্কিত ওই পোস্ট ও কার্টুন সরানো হয়নি।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, টিটু রায়কে গ্রেফতার করলে জানা যাবে, আসলে তার ফেসবুক আইডির কন্ট্রোল কার কাছে রয়েছে। যিনি মামলার বাদী, তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি গোপনে জামায়াত-শিবির করছেন কি-না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। টিটু রায়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে মনে হচ্ছে। ষড়যন্ত্র হলে এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হবে। ফেসবুক থেকে ওই পোস্ট সরানোর জন্য বিটিআরসিকে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কেন এতদিনেও তা সরানো হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই টিটুর ফেসবুক পেজে তা দৃশ্যমান ছিল না। দু-একদিন ধরে তা আবারও দৃশ্যমান হয়েছে। কেন কীভাবে এটা হলো, তা বের করতে সাইবার ক্রাইম বিভাগের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। টিটুর মোবাইল ফোন বর্তমানে বন্ধ।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তা সরিয়ে ফেলতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। আশা করছি, ফেসবুক দ্রুত সাড়া দেবে।

গঙ্গাচড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিন্নাত আলী সমকালকে বলেন, ৬ নভেম্বর রাজু আহমেদ নামে একজন বাদী হয়ে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে টিটুকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘তিনি ইসলামকে অবমাননা করে ফেসবুকে কটূক্তি করেছেন।’

মামলা রুজুর আগে সত্যি সত্যি টিটুর ফেসবুক পেজ থেকে এসব করা হয়েছে কি-না, তা সন্দেহাতীতভাবে তদন্ত করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে জিন্নাত আলী বলেন, নিয়ম মেনে মামলা করা হয়েছে। তবে কী কী নিয়ম মেনে মামলা করা হয়েছে, তা জানতে চাইলে ওসি ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানান।

টিটু রায়ের মা জিতন বালা বলেন, পাওনাদারের জ্বালায় সাত বছর ধরে তার ছেলে বাড়িছাড়া। তার ছেলে বেশি লেখাপড়া করেনি। কোনোমতে নিজের নামটা লিখতে জানে। টিটুকে ফাঁসিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

পুলিশের সাইবার ক্রাইমের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, রংপুরের ঘটনায় সত্যি সত্যি টিটু নাকি অন্য কেউ জড়িত, তা নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান চলছে। টিটু রায়ের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেই মো. টিটু নামে ফেসবুক আইডি খোলা হয়েছে। তবে মোবাইল নম্বর মিললেই আইডির মালিকানা সব সময় প্রমাণ হয় না। কোনো কারণে তার মোবাইল চুরি হতে পারে বা কোনো জায়গায় ফেসবুক খুললেও ‘লগআউট’ না করলে কেউ তাকে ফাঁসাতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা ধারণা করছেন টিটুর নাম দিয়ে আইডি খুলে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তবে তদন্ত শেষে সন্দেহাতীতভাবে পরিস্কার হবে, টিটু না-কি অন্য কেউ দায়ী।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরে উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও ২৬টি বসতঘরে অঘ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরের হরিপুরে রসরাজ দাস নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মন্দির ও বাড়ি ভাংচুর করা হয়।