প্যারা কমান্ডোদের সদা প্রস্তুত থাকার আহ্বান প্রেসিডেন্টের

নিউজ ডেস্ক: দেশের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্যারা কমান্ডোদের সদা প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন
প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ আজ আর কোনো একটি দেশ বা জাতির সমস্যা নয়। ধনী-গরিব, উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের জন্যই সমস্যা। বিশ্ব শান্তির জন্যও মারাত্মক হুমকি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এই ব্যাটালিয়নের প্রতিটি সদস্যকে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে।

তিনি গতকাল রাজশাহী সেনানিবাসে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়ার পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এর আগে সেনানিবাসে অবস্থিত শহীদ কর্নেল আনিস প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ ও অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রেসিডেন্ট। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পতাকা দেয়া হয় ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে। দেশপ্রেম আর অসীম সাহসিকতার কারণে এ পতাকা তুলে দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি ইউনিটকে তার অবদান, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সাফল্য অর্জনের জন্য জাতীয় পতাকা দেয়া হয়। এ সম্মান ও স্বীকৃতি একটি ইউনিট নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী আভিযানিক, প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, প্রশাসনিক এবং দেশ উন্নয়নমূলক কাজের জন্য পায়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে উদ্ভূত জিম্মি সংকটে মাত্র ১২ মিনিটে সফল জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন। নিজেদের কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই মোট ১৩ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে তারা। পরবর্তীতে চলতি বছরের মার্চে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় অবস্থিত আতিয়া মহলে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামে চার দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অপারেশন পরিচালনার মাধ্যমে অকৃত্রিম সাহসিকতায় দেশকে আরেকবার সফলতা এনে দেয় চৌকস কমান্ডোরা। পৃথিবীর কাউন্টার টেরোরিজম অপারেশনের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী অভিযান হিসেবে দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ও ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। এই পতাকা প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতার প্রতি রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ আস্থা প্রকাশ পায়। এই ব্যাটালিয়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরব। অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় সেই ঐতিহাসিক দিন থেকে শুরু করে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সেনাবাহিনী আজ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সেনাবাহিনী আজ চৌকস ও পেশাদার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী দেশের আস্থা ও গর্বের প্রতীক। আর স্পেশাল ফোর্সের সদস্যবৃন্দরা এর গর্বিত অংশীদার। ১৯৯২ সালে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্পেশাল ফোর্সের পথচলা। পথ পরিক্রমার ২৫ বছরের পরিসরে এই ফোর্সের সদস্যগণ বহু গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশমাতৃকার সেবায় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্তমান সরকার এই ফোর্সের জনবল বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্রেসিডেন্ট বলেন, গত বছর এডহক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড ও এডহক প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফোর্সের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং তারা দেশ ও জাতির যেকোনো প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। প্যারা কমান্ডোদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্য তথা কমান্ডোরা দেশের চৌকস, সুশৃঙ্খল এবং দুঃসাহসী সেনানী। মাতৃভূমির সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে তারা জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ ও আত্মোৎসর্গ করার সংকল্পে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন বৈদেশিক মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের আত্মত্যাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ তথা বাঙালি জাতির জন্য বয়ে আনছে সম্মান ও মর্যাদা। সেবা ও কর্তব্যপরায়ণতার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনগণের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সমগ্র জাতির আস্থা অর্জন করেছে। তিনি বলেন, সামরিক জীবনে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জিত হয় এবং নৈপুণ্য নিশ্চিত করা যায়। সঠিক প্রশিক্ষণ পেশাগত মান বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন বাঙালি জাতির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞাননির্ভর বিশ্বে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যেতে ও উৎকর্ষ অর্জনে নিরন্তর জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বের উন্নত সেনাবাহিনীর মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ান প্রতিষ্ঠা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ান দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ়করণে, দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরুল। তিনি ১৯৯৭ সালের ১১ই ডিসেম্বর ৩৭তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সঙ্গে কমিশন লাভ করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ব্যানসিক-৪ (ইউনামিড) সুদান-এ উপ-অধিনায়ক এবং হিসাব অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। উজ্জ্বল কর্মজীবনের অধিকারী লে. কর্নেল ইমরুল বিশেষ অবদানের জন্য সেনাবাহিনী পদকে ভূষিত হন এবং সেনাপ্রধানের প্রশংসাপত্র অর্জন করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের সবুজ পতাকার উপরে একটি কমান্ডো ছুরির দুইপাশে দুটি প্যারাস্যুট অঙ্কিত রয়েছে। প্যারাস্যুটদ্বয়, প্রধান ও সংরক্ষিত প্যারাস্যুটসহ একটি বিশেষ ফোর্সকে নির্দেশ করে। কমান্ডো ছুরি সাহস এবং বীরত্বেরও বহিঃপ্রকাশ ও সবুজ পটভূমি আমাদের মাতৃভূমির প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতীক। ‘মৃত্যুপণ বিজয়ী’ মূলমন্ত্রে দীক্ষিত এই ব্যাটালিয়ান গর্ব ভরে ধারণ করে চেতনার পতাকা। ক্ষিপ্র ও আত্মপ্রত্যয়ী কমান্ডোদের ছদ্মনাম “চিতা” এবং ইউনিটের স্লোগান ‘লাভ ইট অর লিভ ইট’। এই ব্যাটালিয়ানের ক্যাপ ব্যাচের “শাপলা” জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, “শিকল” আইনকানুন ও শৃঙ্খলার প্রতীক। “চিতা” হিংস্রতা এবং দ্রুততার প্রতীক এবং “শিল্ড” বিজয়-এর প্রতীক। কালো রং ও কুকরি যথাক্রমে দুষ্ট চক্রের প্রতি সতর্কতা ও বীরত্বের প্রতীক।