পুলিশের চাল পোকায় খাওয়া

নিউজ ডেস্ক: সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে ৪৪০ কোটি টাকার চাল ও গম কিনে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। বাহিনীর সদস্যদের রেশন দেওয়ার জন্য খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাল-গম কিনে থাকে তারা। কিন্তু এ বছর পুলিশের ১২২টি ইউনিটের মধ্যে ১২০টি থেকেই ওই চাল-গমকে নিম্নমানের ও খাওয়ার অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ওই চাল থেকে রান্না করা ভাত এবং গম ভাঙিয়ে তৈরি রুটি পুলিশ সদস্যরা খেতে পারছেন না। সেগুলো দুর্গন্ধযুক্ত, নিম্নমানের এবং খাওয়ার অনুপযোগী। এসব অভিযোগ তুলে পুলিশ ও র‍্যাবের বিভিন্ন ইউনিট থেকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ওই ভাত ও রুটি নিয়ে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের মতামত জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। আমাকে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন করবেন না।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

বাংলাদেশ পুলিশের প্রধান কার্যালয় থেকে সরকারি গুদামের ওই চাল ও গমের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, পুলিশকে সরবরাহ করা চাল ও গমে প্রচুর ময়লা ও ছত্রাক পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় ওই চাল দিয়ে রান্না করা ভাত অল্প সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশ এ বছর সরকারি গুদাম থেকে ৩৭ টাকা ৯ পয়সা কেজি দরে ৬৭ হাজার ৮১৭ মেট্রিক টন চাল এবং ৩০ টাকা কেজি দরে ৬০ হাজার ৬৭৮ টন গম কিনছে। ইতিমধ্যে ওই বরাদ্দের অর্ধেক চাল ও গম পুলিশ সদস্যরা সরকারি গুদাম থেকে উত্তোলন করেছেন। কিন্তু সব ইউনিট থেকে ওই খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক বিভাগ পড়েছে বিপদে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ বাহিনীর একেকজন সদস্য চাকরির সুবিধার শর্ত অনুযায়ী পরিবারের আয়তনভেদে মাসে ১১ থেকে ৩৫ কেজি পর্যন্ত চাল এবং ১২ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত গম রেশন হিসেবে পান। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (লজিস্টিকস) রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সব ইউনিট থেকে সরকারি গুদামের চাল-গম নিয়ে আপত্তি আসায় আমরা তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’

১৪ ধরনের অভিযোগ

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে রেশনের চাল সম্পর্কে ১৪ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় ওই চাল দিয়ে রান্না করা ভাত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অধিকাংশ সময় পোকায় খাওয়া চাল পাওয়া যায় এবং চালে পোকা পাওয়া যায়। অধিকাংশ সময় চালে ছত্রাক, ময়লা ও কাঁকড় থাকে। এ ছাড়া সরবরাহ করা চালে মড়া চাল বেশি থাকে।

গম সম্পর্কে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ গম লালচে রঙের এবং পোকা থাকে। গমেও প্রচুর ছত্রাক ও ময়লা পাওয়া যায়। ময়লা ও কাঁকড়যুক্ত ওই সব গম ভাঙানোর পর যে আটা তৈরি হয়, তাতে ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া যায়। ওই আটা থেকে যে রুটি হয়, তা কালো রং ধারণ করে। ওই রুটি খেতে তিতা স্বাদের হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকেও রেশনের ব্যাপারে প্রায় একই অভিমত দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ চিঠি এখনও আমার কাছে আসেনি। এলে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রুটি টেনে ছেঁড়া যায় না

রাজশাহীর র‍্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন-৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম পিএসসি পুলিশ সদর দপ্তরে একটি চিঠি পাঠান। তাতে বলা হয়, ওই চাল গন্ধযুক্ত হওয়ায় তা থেকে রান্না করা ভাত র‍্যাব সদস্যরা তৃপ্তিসহকারে খেতে পারছেন না।

বরিশাল পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ওই চাল দিয়ে ভাত রান্না করলে টক বা অম্লজাতীয় গন্ধ আসে। তাই খাদ্য গ্রহণে অরুচি দেখা দেয় এবং কর্মস্পৃহা কমে যায়।

গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বলা হয়, দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় রেশনের চালের ভাত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ভালোভাবে খেতে পারছেন না। তাই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অসন্তুষ্ট। রেশনের গমের রুটি ফেটে যায় এবং গন্ধ হয়ে যায়। কিছু সময় পর ওই রুটি এমন শক্ত হয় যে তা টেনে ছেঁড়া কষ্টসাধ্য।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যেসব কাজ করে থাকেন, তার জন্য তাঁদের অনেক বেশি দৈহিক ও মানসিক শক্তির দরকার হয়। তাঁদেরই নিম্নমানের খাবার দেওয়া হলে তা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।