গণধর্ষণ নাকি অন্য কিছু? গৌরীপুরে নবদম্পতির খোঁজ মিলছেনা

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি ঃ
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে স্বামীকে বেঁধে নববধূকে ধর্ষণের ঘটনায় এলাকা জুড়ে চলছে তোলপাড়। ঘটনার পর থেকে স্বামী সোহেল মিয়া ও তাঁর কথিত নববধূর কোনো খোঁজ মিলছে না। গা ঢাকা দিয়েছে ধর্ষণের সাথে জড়িতরাও। গত ১১ অক্টোবর উপজেলার সহনাটি ইউনিয়নের গিধাউষা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ গত ৬দিনেও নির্যাতনের শিকার দম্পতি ও জড়িত কাউকে খোঁজে বের করতে পারেনি। ফলে বিষয়টি গণধর্ষণ নাকি অন্যকিছু এ নিয়ে বিভিন্ন মহলের সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সঠিক রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে স্থানীয় গ্রামবাসীর দাবি লোকলজ্জা ও হুমকির ভয়েই দরিদ্র দম্পতি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। আর এর বাইরে যদি অন্য কোনো ঘটনা ঘটে থাকে তবে পুলিশ প্রশাসনের উচিত সেই ঘটনার তদন্ত করে সঠিক রহস্য উদঘাটন করা।
গত ১৬ অক্টোবর সোহেলের প্রথম স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমার স্বামী রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। গত বুধবার থেকে স্বামীর কোনো খোঁজ পাচ্ছিনা। স্বামীর নতুন বিয়ে ও ধর্ষণের বিষয় আমরা কিছুই জানিনা। তবে পুলিশ এসে বাড়িতে খোঁজখবর নিয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, আমি সোহেলের সন্তানের মা হতে যাচ্ছি। আপনারা আমার স্বামীকে এনে দিন। স্থানীয় ও পরিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সহনাটি ইউনিয়নের পেঁচাঙ্গিয়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে সোহেল কয়েক বছর আগে মাওহা গ্রামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী এখন অন্তঃসত্ত্বা। সম্প্রতি সোহেল ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মনকান্দা গ্রামের এক তরুণীকে বিয়ে করে। গত বুধবার রাতে সোহেল তাঁর নববধূ ও একবন্ধুকে নিয়ে সহনাটি যাওয়ার পথে গিধাউষা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দুবৃর্ত্তরা গতিরোধ করে। সোহেল নিজেদেরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেও দুবৃর্ত্তরা তাঁদেরকে মারধর করে। এক পর্যায়ে সোহলেকে বেঁধে তাঁর চোখের সামনেই নববধূকে রাতভর গণধর্ষণ করে দুবৃর্ত্তরা। এসময় সোহেলের সাথে থাকা ওই বন্ধু তাঁদেরকে বাঁচাতে গিধাউষা গ্রামের এক জুতা ব্যবসায়ীকে ডেকে আনেন। ওই ব্যবসায়ীও তাদেরকে রক্ষা না করে ধর্ষণের অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যায়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত রোববার গিধাউষা গ্রামে সালিশ ডাকলেও অভিযুক্তরা কেউ সালিশে আসেনি। পরে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ওই জুতা ব্যবসায়ী ও অভিযুক্ত অপর যুবকের দুটি দোকান তালাবদ্ধ করে দেয়। এলাকাবাসী জানান, পুলিশ দম্পতিকে উদ্ধার ও ঘটনার সাথে জড়িত ২/১ জনকে ধরলেই মূল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
সোহেলের মা জানান, পেচাঙ্গিয়া গ্রামের খাইরুল গত বুধবার রাতে সোহেলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরের দিন বৃহস্পতিবার খাইরুল বাড়িতে এসে আমাকে বলে আপনার ছেলেকে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় গিধাউষা গ্রামে ফেলে রেখেছে। সোহেল আগুন নিয়ে খেলা শুরু করেছে তাঁর পরিণতি খুব খারাপ হবে। পরে সোহেলের বাবা গিধাউষা গ্রামে গিয়ে সন্তানের কোনো খোঁজ পায়নি। গ্রামে বলাবলি হচ্ছে সোহেল নাকি এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। তবে সে কখনো তার নতুন বউকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসেনি। আমরা তাঁর মোবাইল ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাইরুল বলেন, সোহেলের পরিবারের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সোহেলের নতুন বিয়ে, স্ত্রী ধর্ষণ ও নিখোঁজ হওয়ার বিষয় আমি কিছুই জানিনা।
সহনাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার পর নববধূর পরিবারের লোকজন আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলো। নিখোঁজ দম্পতিকে খোঁজে বের করতে চেষ্টা চলছে। ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
গৌরীপুর মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি আইনজীবি আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, নবদম্পতি নিখোঁজের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। ঘটনা যাই হোক পুলিশের উচিত দ্রুত নির্যাতনের শিকার দম্পতিকে উদ্ধার করে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করা।
উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি রাবেয়া ইসলাম ডলি বলেন, ভিকটিম উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ওই রাতে আসলে কি ঘটেছিলো তা সঠিক বলা যাচ্ছেনা। তবে ঘটনার ৬দিন পরও পুলিশ এখনো তাঁদের উদ্ধার করতে পারেনি বিষয়টি দুঃখজনক। আর গ্রামে যেহেতু নির্যাতনের বিষয়টা বলাবলি হচ্ছে সেক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের উচিত তদন্ত করে প্রকৃত সত্যটা প্রকাশ করা।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার আহম্মদ জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ওই দম্পতিকে উদ্ধার করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তাঁদের উদ্ধার না করা পর্যন্ত এ বিষয়টি গণধর্ষণ নাকি অন্য কিছু সেটা সঠিক যাচ্ছেনা।