ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন: ভাষার মানুষ, মানুষের ভাষা

মাতিয়া বানু শুকু: ৮ অক্টোবর আমার পরিবারের জন্য একটি স্ট্মৃতিবহ দিন। আমাকেও দু-চার লাইন লিখতে হয় বাবাকে স্ট্মরণ করে। আমার লেখালেখিতে তেমন অভ্যাস নেই, তার ওপরে স্ট্মৃতিচারণমূলক লেখা। আমার বাবা আর দশটা সাধারণ বাবার মতোই একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, সংসারী এবং পিতা ছিলেন, হয়তো কিছুটা উদাসী ছিলেন। তাই বাবা হিসেবে তিনি কেমন, কতটা সেটা নিয়ে লেখার কিছু নেই। কিন্তু তিনি ছিলেন এসবের ঊর্ধ্বে একজন অসাধারণ মানুষ, সমাজসচেতন, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ।

সেখানে তিনি সত্যিই অন্যদের থেকে আলাদা। তাই হয়তো তার গৌণ পরিবারিক জীবন লিখতে আগ্রহ পাই না। সত্যিই যদি ভালো বক্তা হতাম, সমাজসেবী হতাম, জনসেবায় উদ্যমী হতাম, তাহলে হয়তো খুব প্রয়োজনীয় কিছু কথা লিখতেই চাইতাম। আমার বাবা আবদুল মতিন বা তার নিবেদন এবং সময়ের দাবিতে এ জাতির জন্য যে অর্জন বাংলা ভাষা, তার মূল্যায়ন নিয়ে লিখতে চাইতাম।

বাংলা ভাষার অর্জনে বাবার ভূমিকা নিয়ে আমার গৌরব হয়। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয় এমন একজনের সন্তান হওয়ার জন্য। অলিখিতভাবে একটা দায়িত্বও বোধ করি। আমার বাবা তার সময়ে বাঙালি জাতিসত্তা এবং ভাষার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরব হতে পেরেছিলেন। নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাঠে নেমেছিলেন। তার কাছের বন্ধুরা প্রাণ দিয়ে এ ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। আমরা তার পরের প্রজন্ম হয়ে এই ভাষাকে কি সেই মর্যাদা দিতে পারছিঙ্ঘ বা আমার পরের যে প্রজন্ম তাদের কাছে এই ভাষার মূল্যমান কি তুলে ধরতে পারছি? এটা তো আমার দায়িত্ব। তাদের এই ভাষার প্রকৃত ইতিহাস বলা আমার কর্তব্য। সেই জায়গায় কি আমি বা আমার প্রজন্ম ব্যর্থঙ্ঘ

ব্যর্থ আমি বলতে পারি না। আমরা ভাষার স্ট্মরণে বিশেষ দিনটিতে সরকারি ছুটি কাটাই। ফেব্রুয়ারির পুরোটা মাসজুড়ে বইমেলা থেকে শুরু করে নানান সংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকি। আমরা বড়রা বা যারা অল্পবিস্তর লেখাপড়ার সঙ্গে সংযুক্ত তারা কমবেশি জানি দিনটির মাহাত্ম্য, জানি বাংলা ভাষা অর্জনের ইতিহাস। বিশেষভাবে একটি দিন পালন করে আবার ভুলেও যাই। তাই হয়তো আমরা ভাবি না অশিক্ষিত জনগণের কথা। যারা এই বাংলাতেই কথা বলে, যেটা তাদের প্রাণের ভাষা। দেশের স্বাধীনতার আগে যে কোনো এক সময় সেই ভাষা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল, স্বাধীনতার মতো ভাষাটাকেও হারাতে বসেছিলাম আমরা।

এ দেশের কিছু দামাল ছেলে যে সে সময় নিজের প্রাণের বিনিময়ে প্রাণের ভাষাকে ফিরিয়ে এনেছিল, তা কি তারা জানে? জানে কি সঠিক ইতিহাস? একইভাবে ছোট্ট শিশু আমাদের আগামী প্রজন্ম, তারা কতটুকু জানেঙ্ঘ তারা জানে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। আমরা কঠিন দুর্বোধ্য ভাষায় তাদের ভাষা দিবসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করি। সেটা কি সত্যিই তাদের মনে দাগ কাটে? যদি দাগ না-ই কাটে তাহলে এই দিবস বা এই ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা জন্মাবে কী করে?

ভাষা এবং ভাষার ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্বটা ছিল আমাদের। আমরা কি তা করতে পেরেছি? সহজ করে এ জাতিকে বলতে পেরেছি কি সে দিনের কথা? কী তার ইতিহাস। আমি আমার কর্মের জায়গা থেকে দেখি। দেশের অন্যান্য বড় উৎসব আর বিজয়ের অর্জনের দিনগুলোকে কেন্দ্র করে দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেলে নাটক-সিনেমার মতো সহজবোধ্য বিনোদন তুলে ধরা হয় সাধারণ মানুষের সামনে। স্বাধীনতা দিবসেও হয় সে রকম কিছু, যা থেকে আমাদের দর্শক সে সময়ে না জন্মালেও জানে ‘৭১ কীঙ্ঘ জানে, মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাস। ভাষা দিবসের পুরো একটা মাস ধরে টেলিভিশনে চলে আলোচনা, চলে পত্রিকায় লেখালেখি; তারপরেও ক’টা সাধারণ মানুষ এবং ক’টা শিশু এই দিনটি এবং ভাষার ইতিহাস সল্ফপর্কে জানেঙ্ঘ জরিপ করে দেখলে আমি নিশ্চিত, আমরা হতাশ হবো।

বাবার চলে যাওয়ার এই দিনটিতে বড় আফসোসের সঙ্গে ভাবি, আবদুল মতিন এবং তার সমসাময়িক নিবেদিত তরুণদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষা কতকাল থাকবে আমাদের প্রাণে? কবে এটা আপামর জনতার কণ্ঠের ভাষা থেকে হবে

ভালোবাসার ভাষা। তা না হলে অন্য আরও বহুল প্রচলিত, প্রলোভিত ভাষার তোড়ে একদিন এই ভাষাও তার জৌলুস হারাবে। হারিয়ে যাবে চলে যাওয়া মানুষের মতো। ভুলে যাব আমরা। ভুল বুঝব।

চলচ্চিত্র নির্মাতা; ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিনের কন্যা