বিদ্যুৎ সংযোগে টাকা আদায়ে দালালদের নাম ফাঁস করায় গৃহবধুকে ধর্ষণের হুমকি

 শফিকুল ইসলাম মিন্টু, গৌরীপুর : ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সহনাটি ইউনিয়নের ভাঙ্গরহাটি, গিধাউষা ও কাশিচরণ তিনটি গ্রামের তিন শতাধিক গ্রাহককে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার নামে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দালাল চক্র। অবৈধ এসব টাকার ভাগ যাচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পকেটে। প্রতি সংযোগের জন্য মোট ৭ হাজার টাকা ধার্য করে সংযোগের কথা বলে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া হলেও এখনো কোনো গ্রাহক বিদ্যুৎ পায়নি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই চক্রের সদস্যরা অনেক গ্রাহকের বাড়ির সামনে স্থাপন করা খুঁটি উঠিয়ে নিয়ে অন্যত্র স্থাপন করেছে।

অবৈধ এসব কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করায় গত শুক্রবার গিধাউষা গ্রামের এক গৃহবধুকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি দেয়। এঘটনায় ওই গৃহবধূ শনিবার গৌরীপুর থানায় জিডি করেছেন। গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার আহাম্মদ জিডির সত্যতা নিশ্চত করে বলেছেন বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ এই কর্মসূচির আওতায় সহনাটি ইউনিয়নের তিন গ্রামে প্রায় পৌনে ছয় কিলোমিটার নতুন লাইন স্থাপন করা হবে।

নতুন লাইনের আওতায় প্রায় তিন শতাধিক পরিবার বিদুত্যের সুবিধা পাবে। প্রতিটি সংযোগ ফি ৭৫০ টাকা। কিন্তু দালাল চক্রের সদস্য সহনাটি ইউনিয়নের মৃত শহর আলীর ছেলে লিটন, লাল মিয়ার ছেলে মেহেদি হাসান, তালেব হোসেনের ছেলে দুদুমিয়া, আবুল হোসেনের ছেলে সেকান্দর ও গফুর মেম্বারের নেতৃত্বে বিভিন্ন গ্রæপ তিন গ্রামের তিন শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে। গত শুক্রবার দুপুরে ঐ তিন গ্রামে সরজমিনে খোঁজ নিলে গ্রামবাসী সাংবাদিকদের কাছে বিদ্যুতের অনিয়ম ও দালালদের নাম প্রকাশ করলে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।

এ সময় গ্রামের এক গৃহবধুকে গিধাউষা গ্রামের আবুল হোসেন ও তার দুই ছেলে বাবু ও সেকান্দর মারধর করতে যায়। একই সময় গ্রামের মৃত আব্দুর রাশিদের ছেলে আবুল হোসেন ওই গৃহবধুকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়। গৃহবধূ বলেন, আমার স্বামী প্রবাসে থাকে। বিদ্যুতের অনিয়ম নিয়ে কথা বলার কারণে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুমকিদাতারা রাতে আমার বাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভয়-ভীতি দেখিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি করার পরও দুই সন্তান নিয়ে আতঙ্কে আছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে গিধাউষা গ্রামের লিটন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন শুরু করে। কিন্তু ইতোমধ্যে কাশিচরণ গ্রামের দুদু মিয়া পৌনে ছয় কিলোমিটার বিদ্যুৎ সংযোগের লাইন অনুমোদন করিয়ে নিয়ে আসলে লিটনের অবৈধ বাণিজ্যে বাঁধা পড়ে।

এরপরে লিটন পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিদ্যুতের খুঁটি এনে গ্রামে স্থাপন করে গ্রাহকদের কাছ থেকে পুনরায় টাকা উত্তোলন শুরু করে। ইতিমধ্যে গিধাউষা গ্রামে ২৮জন, কাশিচরণ, ১৬৬, ভাঙ্গরহাটি ১০২ সহ সর্বমোট ২৯৬ জন গ্রাহকের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৫০০ হাজার টাকা করে নিয়েছে, মেহেদি হাসান, দুদু মিয়া ও লিটনের লোকজন। তবে টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও এখনো কেউ বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সংযোগের নামে টাকা নেওয়ার পর গ্রামে খুঁটি স্থাপনের কাজ শুরু হলে ঠিকাদারকেও টাকা দিতে হচ্ছে। তাদের ফোরম্যান ও লেবারদের খাবার বাবদ টাকা ও চাল দিতে হচ্ছে। ৭৫০ টাকার বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে প্রত্যেক গ্রাহকরেই ৩/৪ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়েছে। এছাড়াও নানা অজুহাতে ধাপে ধাপে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে দালালরা। অথচ বিদুত্যের নামে কোনো খবর নেই। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা দ্রæত প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

ভাঙ্গরহাটি গ্রামের মেহেদি হাসান বলেন, আমি কোনো টাকা নেইনি। দুদু মিয়া গ্রামের ১০২জন গ্রাহকের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৫০০ টাকা নিয়েছে। আমার চারটি মিটারের জন্য ১০হাজার টাকা নিয়েছে দুদু। এখন আবার খুঁটির জন্য প্রতি গ্রাহকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে চাইছে।

দুদুমিয়া বলেন, গ্রামে আমার সহযোগিতায় বিদ্যুৎ আসার ব্যবস্থা হলে লিটনের বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। সে আমার একটি মিলের লাইন করে দেওয়ার জন্য ৬ লাখ টাকা দাবি করে। এখন সে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সংযোগের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। তবে খুঁটি স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে চেয়েছি।
ময়মনসিংহপল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩’র পরিচালক রতন সরকার বলেন, আমি পদত্যাগ করেছি। সংযোগ পেতে ৭৫০ টাকা খরচ হয়। কেউ অতিরিক্ত টাকা আদায় করলে তাদেরকে যেনো আইনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদুৎ সমিতি-৩’র শম্ভুগঞ্জ কার্যালয়ের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার যুবরাজ চন্দ্র পাল বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের নামে এক শ্রেণির প্রতারক সহজ-সরল গ্রামবাসীকে ভুল বুঝিয়ে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। মিটারের কথা বলে কেউ ৭৫০ টাকার অতিরিক্ত চাইলে তাঁকে ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার আহŸান জানাচ্ছি। এ বিষয়ে গ্রামবাসী লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শফিকুল ইসলাম মিন্টু
০১৭১১৪৪১৬৯০