দেশের পূজা আর প্রবাসের পূজা

নিউটন মুহুরী: প্রতি বছরের মতো এবারও অস্ট্রেলিয়াতে জাঁকজমক ভাবে বাঙালি হিন্দুরা তাদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করলেন। সিডনিতে এ বছর প্রায় ১০ থেকে ১২টি পুজোর আয়োজন হয়েছে বাংলাদেশি ও কলকাতার কমিউনিটির উদ্যোগে। এতসব পুজোর মধ্যে নিউ সাউথ ওয়েলসের গ্লেনফিল্ডে আগমনী অস্ট্রেলিয়া সংগঠন ধর্মীয় তিথি মেনে ২৬ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর দশমীর মধ্যে দিয়ে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করে। আমার জানা মতে বেদান্ত সেন্টার ও রামকৃষ্ণ মিশন (নিউ সাউথ ওয়েলস) ছাড়া অস্ট্রেলিয়াতে এই সংগঠনটির সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির কারণে এ রকম একটি আয়োজন সফল হয়েছে।

এ বছরের পুজোর সময়টা সিডনি ও ক্যানবেরাতে স্কুল হলিডে থাকায় সিডনিতে পুজো শুরু হয় সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ থেকে। আমি কাজের সুবাদে ক্যানবেরাতে থাকলেও এবারের স্কুল হলিডে আর দুর্গাপুজো মিলিয়ে ভাবলাম কিছুদিন সিডনিতে কাটাব। আর সেই জন্য তল্পিতল্পাসহ পরিবার নিয়ে সিডনিতে দিদির বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ২৮ তারিখ সকালে রামকৃষ্ণ মিশনের পুজো দেখার মধ্যে দিয়ে এ বছরের অনুষ্ঠান শুরু করলাম।

পূজামণ্ডপদুর্গাপূজা আমার কাছে নস্টালজিয়া। চট্টগ্রামে কাটানো ছেলেবেলায় বছরের এই সময়টা খুবই আনন্দে কাটত। বাবা খুব বেশি ধার্মিক না হলেও আমাদের সবাইকে নতুন জামা কাপড় কিনে দিতেন। সেই সঙ্গে বাজি আর পটকা ফাটানোর জন্য টাকাও দিতেন। পুজোর চারটা দিন বাড়ি থেকে কখন বেরোচ্ছি আর কখন ফিরেছি সেটা নিয়ে খুব একটা বকাবকি শুনতে হতো না। সেই সুযোগে আমরাও বন্ধুদের নিয়ে সারা বছরের আনন্দ সংগ্রহ করার জন্য নিজেদের ব্যস্ত রাখতাম। এরপর যখন আরও বুঝতে শিখলাম, যখন আরও বন্ধু হলো তখন পুজোর পাশাপাশি ঈদের সময়ও আনন্দে গা ভাসিয়েছি। আমার দেখা সেই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পচনটা আমাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে তখনো এসে পৌঁছায়নি। আর আসেনি বলেই ঈদ, পুজো, নববর্ষ সবকিছুই সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল। আনন্দটা ছিল অমলিন। তখন হয়তো আড়ম্বরটা কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল অফুরন্ত।

হিন্দু মিথলজি অনুযায়ী রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাজা রাম আশ্বিন মাসে দুর্গা আহ্বান করেন। যদিও দুর্গাপূজার সময় হচ্ছে বৈশাখ মাসে। যেটা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। রাজা রাম অসময়ে দুর্গা পূজা করেছিলেন বলে এই পূজাকে অকালবোধন বলা হয়। সময়ের আবর্তনে ও কৃষি প্রধান অঞ্চলে আশ্বিন মাসে যেহেতু কৃষকেরা ফসল পেতেন তখন থেকে এই অকালবোধন প্রতি বছর বাংলাদেশ, নেপাল আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার হিন্দুরা উৎসব হিসেবে পালন করে আসছেন।

পূজা মণ্ডপ ইতিহাস বলছে, দিনাজপুর আর মালদার জমিদার ১৫ শতকে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। আবার কারও মতে নদীয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদার ১৬০৬ সালে প্রথম বাংলায় দুর্গাপূজা আয়োজন করেন। একটা সময় পর্যন্ত এই দুর্গাপূজা শুধুমাত্র জমিদারেরাই আয়োজন করত আর সাধারণের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। ১৭৯০ সালে হুগলিতে বারো বন্ধু মিলে সাধারণের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে প্রথম সর্বজনীন (সবার জন্য) পূজার আয়োজন করেন। বারো বন্ধু মিলে পুজো করেছেন বলে এই পুজো বারোয়ারি পুজো নামে পরিচিত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রতিবাদের ভাষাও অনেক সময় এই পূজার মধ্যে ফুটে উঠেছে। আর সেটাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোম্পানি অডিটর জেনারেল বীরভূম অফিসে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন এবং ১৮৪০ সালে ব্রিটিশ রাজ অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার আগে পর্যন্ত পুজো করে গেছেন।

দেশের পুজো আর প্রবাসের পুজোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। প্রবাসে পুজো করা হয় প্রথমত বছরের একটা দিনে যাতে সবাই মিলে গান-বাজনা, খাওয়া দাওয়া আর আড্ডায় মেতে থাকা যায়। আর দ্বিতীয়ত একটি দিনের জন্য হলেও যাতে দেশের ফেলে আসা দিনগুলো ফিরে পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়াতে দুর্গাপুজোর সময় সব কমিউনিটির লোকজন কমবেশি এই আনন্দ ভাগ করে নেন। যারা এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থেকে ব্যক্তিগত সময়, অর্থ আর শ্রম দিয়ে আমাদের সকলের আনন্দের জায়গা করে দিচ্ছেন তাদের অনেক ধন্যবাদ।

পূজায় সমবেত কয়েকজনঅস্ট্রেলিয়াতে বাঙালি হিন্দু কমিউনিটি এখন অনেক বড়। আর তাই পুজোর সংখ্যাও অনেক বেশি। একেকটি পুজোতে (নিউ সাউথ ওয়েলস) তাই এখন দুপুর আর রাতের খাবারের জন্য হাজারখানিক লোকের রান্না করতে হয়। আয়োজকদের উদ্দেশ্য থাকে কেউ যাতে অভুক্ত ফিরে না যান। তবে কিছু জায়গায় সেটার ব্যতিক্রম হয়েছে। খাবারের আয়োজন ছিল সংক্ষিপ্ত আর কিছু পুজোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল আয়োজকদের পরিবারকেন্দ্রিক। আমার পরামর্শ থাকবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ যাতে কমিউনিটির সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। কেউ যাতে বলতে না পারেন, অনুষ্ঠানে শুধু আয়োজকদের পরিবারের সদস্যরাই অংশগ্রহণ করেছেন। সবাইকে পুজোর সঙ্গে জড়িত করলে, অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে তবেই সেটা সর্বজনীন পুজো হবে। শুধু দায়সারাভাবে যুক্ত করার কথা বলে পাশ কাটালে বছর বছর শুধু পুজোর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সেখানে পুজোর গন্ধ থাকবে না।

নিউটন মুহুরী: সাংস্কৃতিক কর্মী, ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া।