কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল: বিপ্লব স্পন্দিত জীবনের রেলগাড়ি

বৃত্বা রায় দীপা:  অগ্নিযুগের বিপ্লবী, অনলবর্ষী বক্তা জসিম উদ্দীন মণ্ডল ২ অক্টোবর জাগতিক সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। এই সাতানব্বই বছরের জীবনে এক দিনের জন্যও আদর্শ থেকে একচুলও নড়েননি। কোনো প্রলোভন তাঁকে আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। এমন মানুষ আজ বড়ই বিরল।

জসিম মণ্ডল ১৯২০ সালে কুষ্টিয়া জেলার কালীদাশপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাউসউদ্দীন মণ্ডল রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির সুবাদে অবিভক্ত ভারতের নানা জায়গা ঘুরে কলকাতার নারকেলডাঙা রেল কলোনিতে বসবাস শুরু করেন তিনি। মাত্র ১৩-১৪ বছরের দুরন্ত কিশোর জসিম মণ্ডল লাল ঝান্ডার মিছিলে যোগ দিয়ে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। চল্লিশ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ পান। একই বছর পনেরো টাকা বেতনে রেলশ্রমিক হিসেবে চাকরি পান। ১৯৪২ সালে তাঁর প্রমোশন হয় রেলের সেকেন্ড ফায়ারম্যান হিসেবে।

দেশ বিভাগের পর জসিম মণ্ডল বদলি নিয়ে চলে আসেন পার্বতীপুর। ১৯৪৯ সালে রেলশ্রমিকদের রেশনে চালের বদলে খুদ সরবরাহ করলে জসিম মণ্ডলের নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলন দানা বাঁধে। পুলিশি দমন-পীড়নের পর গ্রেপ্তার হন জসিম মণ্ডল। শুরু হয় জেলজীবন, দফায় দফায় মোট ১৭ বছর কারাভোগ করেন তিনি।

শ্রমিকের সন্তান জসিম মণ্ডল মেহনতি মানুষের যন্ত্রণা বুঝতেন। খুব ভালো করে বুঝতেন গরিবের খিদের জ্বালা। খিদে লাগলে পেটের কোনখানে তীব্র ব্যথা করে, তিনি তা জানতেন। মানুষের ভাগ্যে তাঁর একচুল বিশ্বাস ছিল না। জাতপাতে তাঁর কোনো আস্থা ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, দুনিয়াতে দুটি জাত। একটি ধনী, অপরটি গরিব। গরিবকে বঞ্চিত না করে কেউ ধনী হতে পারে না, এ ছিল তাঁর জীবন থেকে নেওয়া পাঠ।

গরিব ধান ফলাবে অথচ আধপেটা খাবে। শ্রমিক বস্ত্র তৈরি করবে অথচ ছেঁড়া কাপড় পরবে। শ্রমিক বহুতল নির্মাণ করবে অথচ ঝুপড়িতে থাকবে। এই বৈষম্যের সমাজ তিনি ভাঙতে চেয়েছেন। এ সমাজ ভাঙা ছাড়া, সমাজতন্ত্র কায়েম ছাড়া মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়, তিনি তা জানতেন। তাই সেই উদ্দীপনায় মেহনতি মানুষকে জাগানোর ব্রত নিয়েছিলেন তিনি। কিশোরবেলাতেই জীবন ঘষে যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতায় সেই আগুনই ঝরে পড়ত।

আমার সৌভাগ্য, শৈশব থেকে জসিম মণ্ডলের স্নেহময় পরশ পেয়েছি। আমার বাবা প্রসাদ রায়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও পরম বন্ধু বলে ছিলেন তিনি। ছিলেন আমাদের পরিবারেরই একজন। জসিম মণ্ডল ও প্রসাদ রায় দুটি নাম প্রায় একসঙ্গেই উচ্চারিত হতো। জেলেও বহুবার, বহু বছর একসঙ্গে কেটেছে তাঁদের। মণ্ডল কাকার কাছে শুনেছি, ১৯৪৭ পূর্ব হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ঘটনা। জসিম মণ্ডল তখন রেলের সেকেন্ড ফায়ারম্যান। ট্রেন ছেড়েছে কলকাতা থেকে, গন্তব্য জলপাইগুড়ি হয়ে দার্জিলিং।

ট্রেন চালাচ্ছিল সাহেব ড্রাইভার। মাঝপথে দেখা গেল হিন্দু-মুসলিম দুই দল দাঙ্গাবাজ ট্রেন আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ খুন করার জন্য অস্ত্র হাতে তেড়ে আসছে এবং ট্রেন থামানোর হুমকি দিচ্ছে। ট্রেন চলছিল কিছুটা ধীরগতিতে। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলেন জসিম মণ্ডল। সাহেব ড্রাইভারকে বললেন ট্রেনের গতি চার গুণ বাড়াতে। সাহেব বললেন এটা অসম্ভব। কয়লার ইঞ্জিনে চলা ট্রেনের গতি বাড়াতে হলে চার গুণ বেশি কয়লা দিতে হবে ইঞ্জিনে।

এটা কী করে সম্ভব? এই অসম্ভবের দায়িত্ব নিলেন জসিম মণ্ডল। বয়লার রুমে ঢুকে বেলচার পর বেলচা কয়লা মারলেন ইঞ্জিনে। বয়লার রুমের তাপমাত্রা দাঁড়াল আশি ডিগ্রিতে। ট্রেনের গতি বাড়ল চার গুণ। দাঙ্গাবাজদের ওপর দিয়ে ছুটে চলল দার্জিলিং মেল। বেঁচে গেল ট্রেনভর্তি অগণিত মানুষ। পিছে পড়ে রইল কতিপয় অমানুষের লাশ। ক্লান্ত-শ্রান্ত জসিম মণ্ডল শুয়ে পড়লেন বয়লার রুমের দরজার সামনে।

জেলখানায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জসিম মণ্ডলের নাম দিয়েছিল ‘ডেঞ্জারাস প্রিজনার’। রাজশাহী জেলে সাধারণ কয়েদিকে জেল পুলিশের পেটানো দেখে পুলিশের লাঠি কেড়ে নিয়ে পুলিশকে বেদম প্রহার করেছিলেন। শাস্তি জুটল ডবল ডান্ডাবেড়ি। উলঙ্গ করে কনডেম সেলে ঢোকানো হলো জসিম মণ্ডলকে। মাঘ মাসের শীতে সেলের মেঝেতে ঢেলে দেওয়া হলো ঠান্ডা পানি। এতেই ক্ষান্ত না, জেলারের হুকুমে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হলো বরফের চাঙর।

চেপে থাকা ডান্ডাবেড়িতে চামড়া উঠে রক্ত ঝড়তে থাকল। জসিম মণ্ডল অবিচল! বহু নিপীড়ন, বহু প্রলোভনেও কমিউনিস্ট আদর্শে অবিচল ছিলেন আজীবন। সারা জীবন ধরেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি বলতেন, আমি কমিউনিস্ট পার্টি করি। জেনে বুঝেই করি। অঙ্ক কষেই করি। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া গরিবের অবস্থা পরিবর্তনের কোনো উপায় নেই।

গত বছর ঢাকায় আমার বাসায় এলেন এপ্রিলের মাঝামাঝি। আমাকে ডাকতেন ‘কুড়ানি মেয়ে’ বলে। আমাদের সঙ্গে থাকলেন ২০ দিন। প্রত্যেক দিন ছুটে বেড়ালেন নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে। মে দিবসে ভোরে গেলেন একটি টিভির লাইভ প্রোগ্রামে। সেখান থেকে ফিরে সকাল দশটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বক্তব্য দিলেন। শহীদ মিনার থেকে সরাসরি চলে গেলেন আশুলিয়ায় শ্রমিক সমাবেশে। ভয় পাচ্ছিলাম, এই বয়সে এত ধকল সইবে তো? রাতে আশুলিয়া থেকে ফিরলেন, যেন তরতাজা চব্বিশ বছরের যুবক!

গত বছরই এক ভিন্ন রকম ঘটনার মুখোমুখি হলাম। জসিম কাকা একটি পাঞ্জাবি পরেছেন, বেশ পুরোনো। বুকের জায়গায় সুতো উঠে গেছে। আবার লম্বায়ও খানিকটা বড়। তিনি একটি বড় অনুষ্ঠানে যাবেন সেই পাঞ্জাবি পরেই। আমি বাধা দিলাম। কাকা বললেন, জানো এ পাঞ্জাবি কার? আমি চেয়ে থাকলাম। তিনি বললেন, এটা প্রসাদের (আমার বাবা) পাঞ্জাবি। ওর মৃত্যুর পর এটা আমি রেখে দিয়েছি। যখন কোনো বড় অনুষ্ঠানে যাই, এটা তখন পরি। আর সে সময় মনে হয় প্রসাদ আমার বুকে জড়িয়ে আছে।’

বাবা মারা গেছেন ১৯৯৬ সালে। সে সময় থেকে জসিম কাকা এ পাঞ্জাবি রেখে দিয়েছেন। এ কথা শোনার পর আমি হু হু করে কেঁদে ফেললাম। কান্নায় ভেঙে পড়লেন কাকাও। জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।

জসিম কাকাকে ঘিরে অজস্র স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা বলি। ছোটবেলায় পাবনার টাউন হলে কাকার বক্তৃতা শুনে আমি ও আমার ছোট ভাই অঞ্জন বাড়িতে এসে সেই ভাষণ নকল করতাম। আমি সাজতাম জসিম মণ্ডল আর ভাই সাজত শ্রোতা।

জসিম মণ্ডলের ভাষণ, তাঁর দৃঢ়চেতা অভিব্যক্তি আমার স্মৃতিতে জাগরূক সব সময়।
মৃত্যুশয্যায় শুয়েও শীর্ণ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে গেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ! এমন কলিজার জোরওয়ালা মানুষ আর কোথায় পাব? এক বীরের জীবনাবসান হলো। তাঁর মৃত্যুতে সমাপ্ত হলো একটি অধ্যায়। আমি আবার পিতৃহারা হলাম! শুধু মুখের বুলিতে বিপ্লবী হওয়া যায় না। সমস্ত জীবনাচরণের মধ্যে বিপ্লবকে ধারণ করতে হয়। জসিম মণ্ডল ছিলেন তেমনই একজন ত্যাগী বিপ্লবী।

অশ্রুতর্পণে আজ তোমাকে বিদায় জানাই কমরেড! তোমার কথামতো,‘গরিবের জন্য সুদিন আসিবেই। আসিতেই হইবে। ইহা বিজ্ঞান, ইহা অঙ্ক। এই অঙ্ক শিখিতেই হইবে।’

লালসালাম কমরেড জসিম মণ্ডল!

(লেখক উন্নয়নকর্মী, রাকসুর সাবেক মহিলা সম্পাদিকা)