সাবিনার জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি

সৈয়দ আবুল মকসুদ:  গতবারের আগেরবার প্রথম আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর থেকে মেয়েদের ফুটবল টিমটি নিয়ে আসা হয়েছিল। দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে জমজমাট অনুষ্ঠানে মেয়েরা মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ায়। যেন একগুচ্ছ সদ্য প্রস্ফুটিত ফুল। প্রত্যন্ত পল্লি থেকে এলেও আত্মপ্রত্যয় ওদের চোখেমুখে। ওদের মুখেই শোভা পায়: আমরা করব জয় একদিন।

কলসিন্দুরের মেয়েদের ফুটবল দলেরই একজন সাবিনা ইয়াসমিন। জাতীয় দলের নারী ফুটবলার। অনূর্ধ্ব–১৪ ফুটবল ক্যাম্প থেকে ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হয়। ২৭ তারিখ তার ঢাকায় আসার কথা ছিল। ২৬ তারিখ ধোবাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে। বাংলাদেশ যদি একটি বাগান হয়ে থাকে, তাহলে তার একটি ফুল ঝরে পড়ল।

শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। যে মারা যায়, তার শ্রেণিগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ওই মৃত্যু কতটা শোকের। সাবিনার মৃত্যুর খবরটি পরদিন ঢাকার দু-একটি কাগজে একটুখানি এসেছিল। কারও চোখে পড়ার মতো নয়।

সাবিনা ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ রানীপুর গ্রামের মৃত সেলিম মিয়ার মেয়ে। সে কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখায় নবম শ্রেণিতে পড়ত। বাবা ছিলেন গ্রামের অসচ্ছল মানুষ। মা এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে কোনো রকমে সংসার চালান। তিন ভাইবোনের মধ্যে সাবিনা ছিল দ্বিতীয়।

বাংলাদেশের জাতীয় দলের নারী ফুটবলার হিসেবে সাউথ এশিয়া গেমসসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়ে সাবিনা কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর যশোরে অনূর্ধ্ব–১৪ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে দলের সঙ্গে ঢাকায় ফেরে সাবিনা। ঢাকা থেকে যায় বাড়িতে মায়ের কাছে। বিধাতা তাকে তার মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে তাঁর নিজের কাছে নিয়ে গেলেন।

পড়াশোনা, খেলাধুলাসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখন ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ভালো করছে। মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে ধর্মান্ধরা হুংকার দিয়েছিল। রাস্তায় মিছিলও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা তারুণ্য রোধ করতে পারেনি। তারুণ্যের অগ্রযাত্রায় বাধা দেওয়া যায়, তাকে রোধ করা যায় না।

সাবিনা এমন এক পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। কলসিন্দুর থেকে প্রথম আলোর অনুষ্ঠানে এসে তারা বলে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের গ্রামের মানুষ টেলিভিশন দেখতে পারে না। তারা বিভিন্ন জায়গায় খেলে, কিন্তু তাদের বাড়ির লোকেরা তাদের সেই খেলা উপভোগ করতে পারে না। সে কথা শোনার পর জনপ্রিয় কথাশিল্পী আনিসুল হক প্রথম আলো থেকে উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে দিয়ে তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেওয়ান। শত শত শতাব্দীর অন্ধকার দূর করে আলোকিত হয়ে ওঠে গ্রাম। বাস্তবের অন্ধকারের সঙ্গে দূর হলো মনোজগতের অন্ধকার। অবরোধবাসিনী মেয়েরা শুধু রাজধানীতে নয়, বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের ভেতরের অপরিমেয় সুপ্ত ক্ষমতা সদ্ব্যবহারের সুযোগ পায়। জাতির জন্য তা খুব ছোট ব্যাপার নয়।

দারিদ্র্য প্রতিভা বিকাশের পথে বাধা। সরকারের দিক থেকে এখন আনুকূল্য পাওয়া যায়। সরকারের বাইরে থেকেও কিছু অনুপ্রেরণা ও সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। শুনেছি প্রথম আলো ট্রাস্ট থেকে এসব প্রত্যন্ত পল্লির, বিশেষ করে অনগ্রসর এলাকার ছেলেমেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হয়। সাবিনাও একটি এক হাজার টাকার মাসিক বৃত্তি পাচ্ছিল।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলে তিনজন সাবিনা। আর দুজনের একজন সাতক্ষীরার, একজন যশোরের। নানা কারণে, বিশেষ করে আমাদের মতো বয়স্কদের দোষে বাংলাদেশের মুখ বিশেষ উজ্জ্বল নয়। সেই অবস্থায় সাবিনাদের মতো ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। পৃথিবীর মানুষ পরিচয় পাচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রতিভা ও মেধার। ক্রিকেটে আমাদের ছেলেদের সাফল্য গৌরবে। সারা দুনিয়ার লোক জানে বাংলাদেশের ছেলেরা অপরাজেয়।

মেয়েরা পিছিয়ে থাকতে পারে না। ফুটবলে তারাও এখন এগিয়ে চলেছে। ২০১৫-তে আমাদের সাবিনারাই নেপালে গিয়ে শক্তির পরিচয় দিয়েছে। ২০১৬-তে তাজিকিস্তানে ফুটবল কাপ অনূর্ধ্ব–১৪ খেলায় অসামান্য সাফল্যের পরিচয় দেয়। অস্ট্রেলিয়া, উত্তর কোরিয়া, জাপানের মতো পুরোনো শক্তিশালী দলগুলোকে মোকাবিলা করে। অনেক খেলায় বিজয় ছিনিয়ে আনছে।

আগামী বছর উরুগুয়েতে অনূর্ধ্ব–১৬ বিশ্বকাপ খেলায় উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিরুদ্ধে লড়বে আমাদের মেয়েরা। বুক ভরে যায় যখন লোকে বলে এশিয়ার সেরা ১০টি দলের একটি বাংলাদেশের এই দলটি। এভাবে এগোতে থাকলে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশের টিমই হবে এশিয়ায় এক নম্বর।

সাবিনার অকালমৃত্যুতে শুধু ব্যথা ও শোক নয়, কিছু প্রশ্ন জেগেছে আমার মনে। দীর্ঘ রোগভোগের পর সাধ্যমতো চিকিৎসা নিয়ে মারা যাওয়া এক কথা। সাবিনা মারা গেছে আড়াই দিনের জ্বরে। এ কেমন জ্বর? মুঠোফোনে সয়লাব দেশ। দুই দিনের মধ্যে কেউ তার খোঁজ রাখল না? ঢাকা থেকে ধোবাউড়া কত দূর? তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা গেল না?

সাবিনা কী ধরনের জ্বরে মারা গেল তা জানা যায়নি। এটা কি সাধারণ ঠান্ডা লাগা জ্বর? নাকি মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া? মশা তো ছড়িয়ে আছে সারা দেশেই। একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের মৃত্যুতে যখন জাতীয় পত্রিকাগুলোর দু-একটি ছাড়া প্রতিবেদন করে না, সেখানে কত অজ্ঞাত মানুষ ওই মশার কামড়ে মরছে প্রতিদিন, কে তার খোঁজ রাখে?

প্রযুক্তির কারণে মফস্বল সাংবাদিকেরা মহানগরের সাংবাদিকদের মতোই এখন দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের কাজ শুধু রাজনৈতিক নেতা, ডিসি, এসপি বা দারোগা-পুলিশের সংবাদ করা নয়। মফস্বল সাংবাদিকদের অনেকে আজকাল খুবই ভালো করছেন। আমাদের বন্ধু মোনাজাত উদ্দিনের কথা মনে পড়ে। তাঁর সময়ে মুঠোফোনও ছিল না, এখনকার মতো উন্নত প্রযুক্তিও ছিল না। কী কষ্ট করে অসামান্য সব প্রতিবেদন পাঠাতেন। সাবিনার এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরটি দেশবাসীকে জানাতে তাঁদের ব্যর্থতা আমায় পীড়া দিয়েছে।

৫০ বছর যাবৎ মফস্বল সাংবাদিকেরা আমার খুবই আপনজন। তাঁরা ছোট জায়গায় থাকলেও কোনো ছোট সাংবাদিক নন। আমি খুব গর্ববোধ করি সত্তর ও আশির দশকে আমার হাতে যাঁরা জেলা ও উপজেলায় সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ ঢাকায় এসে খুব ভালো করেছেন। খুব বিনয়ের সঙ্গে বলছি, তাঁরা কেউ কেউ সংসদ সদস্য, এমনকি মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। তাঁদের নাম বলতে এখন সংকোচ হয়। দেখা হলে তাঁরা অবশ্য তাঁদের অতীত সাংবাদিক জীবনের স্মৃতিচারণা করেন।

আমাদের পত্রপত্রিকা খেলাধুলার খবর খুবই গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করে। খেলাধুলার পাতাগুলোর বাইরে বড় ঘটনার প্রথম পাতায়ও সচিত্র সংবাদ হয়। তবে আমাদের জাতীয় খেলা ফুটবলের প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাঙালির ফুটবলের খ্যাতি ছিল সমগ্র উপমহাদেশে।

সাবিনারা মাত্র তিনজন নয়, বাংলাদেশে হাজারো সাবিনা পল্লির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। দরকার তাদের আদর করে তাদের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা। আনুকূল্য ছাড়া প্রতিভা ও মেধা বিকশিত হতে পারে না। প্রতিভার অনাদর জাতিকে নিঃস্ব করে। সাবিনার মতো মেয়ে বা ছেলেদের এভাবে অনাদরে ও বিনা চিকিৎসায় চলে যাওয়ায় শুধু তাদের মায়ের বুক খালি হয় না, দেশের বুকও খালি হয়। সাবিনার জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।