জগৎ সভায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ

আবুল হাসান চৌধুরী:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে নিজ দেশে, নিজ ঘরে ফিরতে পারে, সে জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। এ জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সমস্যাসহ বিভিম্ন জরুরি ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান। তিনি বিশ্বসংস্থায় বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে বক্তব্য রেখেছেন বিশ্বনেতার মতোই। তিনি সংকটের সময়ে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনকে সঠিকভাবেই কাজে লাগাতে পেরেছেন। জগৎসভায় বাংলাদেশ যে আর পিছিয়ে থাকবে না, সেটা নিশ্চিত হয়ে গেল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষে।

রোহিঙ্গা সমস্যা নতুন না হলেও বর্তমানের তীব্রতা অনেক বেশি। ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নানারকম উৎপীড়ন-নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের, যাদের সিংহভাগই মুসলমান, তারা বারবার বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। নব্বইয়ের দশকে আলোচনার মাধ্যমে তাদের একটা বড় অংশকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এবার যে পৈশাচিক বর্বরতার শিকার প্রায় পাঁচ লাখ শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে তার জন্য আন্তরিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে হয়। বলা যায় যে, পৃথিবীর সব জনগণকে দক্ষিণ আমেরিকায় রেখে দিলেও ঘনবসতির দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে তাদের অবস্থান অনেক ভালো থাকত।

এ বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়াটা নৈতিক দিক থেকে সঠিক হয়েছে এবং পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ এই উদারনীতিকে সমর্থন জানিয়েছে। একদিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি এক মারাত্মক হিংসাযজ্ঞে মেতে ওঠা সামরিক জান্তার পোস্টার গার্লে পরিণত হয়েছেন, অন্যদিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও বিশ্ব জনগণকে তার গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে অবহিত করেছেন যে, বাংলাদেশ একটি উদার শান্তিকামী এবং মানবতার পক্ষের শক্তি।

প্রধানমন্ত্রীর এটা ছিল জাতিসংঘে চতুর্দশ ভাষণ। তিনি অনতিবিলম্বে শরণার্থীরা যেন নিরাপদে এবং শান্তিতে ফেরত যেতে পারে সে দাবি তুলেছেন। এই দাবির ব্যাপারে আমি আশা করব, জাতিসংঘ দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে আমাদের তিন বন্ধুরাষ্ট্র চীন-ভারত-রাশিয়ার ভূমিকা শুধু হতাশই করেনি, বেদনাও দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরকালে জঙ্গিবাদের কথা বলেছেন; কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের ব্যাপারে মুখ খোলেননি। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রশংসিত অবস্থানের কারণে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং জাতিসংঘেও তিনি কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে চীন মিয়ানমারের পাশে থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের সাধারণ প্রস্তাবে গতবারের মতো এবার ভেটো দেয়নি। আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু রাশিয়ার দৃষ্টি কূটনৈতিকভাবে আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি প্রস্তাব- অবিলম্বে জাতিসংঘের একটি দল বাংলাদেশে প্রেরণ করা হোক। আমি আশা করব, সেই দলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যাদের মধ্যে রাশিয়া ও চীনও আছে এবং তাদের প্রতিনিধিরা আসবেন ও বর্তমান দুর্বিষহ অবস্থা অনুধাবন করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক আমাদের ওপর নির্যাতনের কথা আছে। আমরা এক কোটি মানুষ সেদিন শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তিনি যেটা ব্যক্ত করেছেন সেটা হচ্ছে, শরণার্থী হওয়ার দুঃখ-বেদনা প্রত্যেক বাংলাদেশি হূদয় দিয়ে অনুভব করে। এ ছাড়াও আছে ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড।

সমগ্র দেশের কাছে এটা একটা চিরন্তন বেদনা। এই স্ট্মৃতি গভীরভাবে তাড়িত করে শেখ হাসিনাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তার মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী ওআইসির সদস্য দেশগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ পুনর্গঠনের সভায় তিনি রোহিঙ্গাদের কথা তুলে ধরেছেন। আইওএস প্রধানের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তার কথা হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মিয়ানমারের সমালোচনা করেছেন। জাতিসংঘের এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আমার দৃষ্টিতে এটাকে সঠিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী কাজে লাগিয়েছেন।

আমি আশা করব, প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসার পর অতি শিগগির চীন-ভারত-রাশিয়া সফর করবেন এবং আসিয়ানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করবেন।
প্রতিটি বিষয়ে আসিয়ান একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে থাকে। বর্তমানে মিয়ানমার কর্তৃক সৃষ্ট সংকটে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া আসিয়ানের এই দুই প্রভাবশালী দেশ আমাদের প্রতি যথেষ্ট নমনীয়। তাদের দিয়েও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভারতকে বোঝাতে হবে বিশেষ ও ঐতিহাসিক বন্ধু বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের বর্তমান অবস্থানের কারণে এ ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

চীনের এখন সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হচ্ছে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-অবোর (OBOR)। এই সংযোগ পরিকল্পনা একটা অস্থিরতার ভেতর কোনোদিনই কার্যকর করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যে কোনো রকমের সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জিরো টলারেন্সের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান অতি দ্রুত না হলে আমাদের সংকট বাড়বে। যদি এ রকম একটা সমস্যা আমাদের এই অঞ্চলে মাথাচাড়া দেয় তাহলে জাতিসংঘসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যেসব উম্নতশীল দেশ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তাদেরই দায়ভার বহন করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী সেফ জোনের উল্লেখ করেছেন। এর দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

আমাদের দেশ একটি উদার অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই পরিস্থিতির যেন কোনো পরিবর্তন না হয়। ধর্মীয় আবেগ আছে এবং থাকতেই পারে; কিন্তু সবার ওপরে যে কথাটা উপলব্ধি করতে হবে তা হলো, রোহিঙ্গারা মানুষ এবং সেভাবেই মানবতাবোধ নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল এ বিষয়ে বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করেছে এবং আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এই কাউন্সিলের একটা বিশেষ বৈঠকের অনুরোধ জানাবেন।

সবশেষে একটি নিবেদন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার মধ্যেও যেভাবে মানবিকতার অতু্যজ্জ্বল নজির স্থাপন করেছেন, যেভাবে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে ঘোষণা করেছেন, ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও খাদ্য জোগাতে পারব এবং প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে খাদ্য ভাগাভাগি করে নেব- তা সর্বত্রই নন্দিত হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশকের সীমান্ত জটিলতা এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে সমস্যার যেভাবে শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করেছেন, তা বিশ্ববাসীর নজর এড়ায়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি মানবিক মনোভাব। তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার কিন্তু পেতেই পারেন।