আনন্দমোহন বসু ১৭০ তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য

স্বপন পাল: শিক্ষার শহর ময়মনসিংহে সগৌরবে শত বছরের অধিককাল ধরে আলো ছড়িয়ে যাওয়া প্রধান প্রতিষ্ঠানের নাম আনন্দমোহন কলেজ। এই কলেজটির সাথে যে মানুষটির নাম জ্বলজ্বল করছে, তিনি হলেন আনন্দমোহন বসু। আনন্দমোহন বসু যে শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলেই তাঁর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমনটি ভাবলে উনার কর্মকে শুধু খাটো করাই হবেনা, ইতিহাসের অনেককিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এবং আমাদের অজানা থেকে যাবে ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়,যা জানা না থাকলে, আমরা আমাদেরকেই বঞ্চিত করবো এক আলোছড়ানো কীর্তিমান মানুষের দীপ্তি থেকে। উনি শিক্ষায় অসামান্য অবদান রাখার পাশাপাশি সমাজ, রাজনীতি, নারীর অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘ইতিহাস হলো মানুষের আত্ম-আবিষ্কারের ইতিকথা’। তাই নিজেকে আবিস্কারের পর্যায়ে আরো একটু এগিয়ে নিতেই, এই মানুষটি সম্পর্কে কৌতুহলী হয়েছিলাম। কালোত্তীর্ণ এই মানুষটির জীবন ও কর্মকে যতোটুকু জেনেছি, সেটুকু কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে আনন্দমোহন বসু’র ১৭০ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করছি।

জীবন:

আনন্দমোহন বসু বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার (তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা) ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের এক ভূস্বামী পরিবারে ১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা পদ্মলোচন বসু ও মাতা উমা কিশোরী দেবী। পিতা পদ্মলোচন বসু ছিলেন ময়মনসিংহ জজ আদালতের পেশকার।

আনন্দমোহন বসু’র প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ময়মনসিংহেই। মেধাবী আনন্দমোহন বসু ১৮৬২ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় মেধা তালিকায় নবম স্থান অধিকার করেন। পরে কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ এবং বিএ উভয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করে উত্তীর্ণ হন। এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তিনি ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তি পাওয়ার সুবাদে তিনি উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি দশ হাজার টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ইংল্যান্ডে ক্যাম্ব্রিজ এর ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে তিনি উচ্চতর গণিত বিষয়ে লেখাপড়া করেন। ১৮৭৪ সালে সেখানে গণিত বিষয়ক সর্বোচ্চ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনটি বিষয়ে প্রথম শ্রেণি অর্থাৎ সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘র‌্যাংলার’ (তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম এবং একমাত্র) উপাধি লাভ করেন আনন্দমোহন বসু। ওই বছরই বার-এট-ল ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন এবং আইন ব্যবসা শুরু করেন। এর পূর্বেই ছাত্রাবস্থায় তিনি তৎকালীন হার্ডিঞ্জ স্কুলের (বর্তমান ময়মনসিংহ জিলা স্কুল) প্রধান শিক্ষক ভগবান চন্দ্র বসুর কন্যা অর্থাৎ বিজ্ঞানাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর বোন স্বর্ণপ্রভা দেবীকে বিয়ে করেন। ১৮৭৪ সালে তিনি আইন ব্যবসা শুরু করেন।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আনন্দমোহন বসু:

ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে ১৮৬৯ সালে ব্রাহ্ম ধর্মমত গ্রহণ করেন আনন্দমোহন বসু । দেশে ফিরে কেশবচন্দ্র সেনের পরিচালনাধীন ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেন। ১৮৭৮ সালে নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মসমাজে ফাটল সৃষ্টি হয়। বিরোধের বিষয়গুলোর একটি ছিল কেশবচন্দ্র সেনের নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে কুচবিহারের রাজার নাবালক ছেলের বিয়ে। এ ক্ষেত্রে আনন্দমোহন ভিন্ন মতাবলম্বীদের নেতৃত্ব দেন এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ নামে একটি নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।

নতুন ব্রাহ্মসমাজের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এর কর্মকাণ্ড ব্যবস্থাপনা ও আন্দোলনকে এগিযে় নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো গডে় তোলেন। ১৩ বছর ধরে তিনি সভাপতি ছিলেন। এ সময়ে ব্রাহ্মসমাজের জন্য অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে বিস্তৃত একটি পাকা চত্বরও (কমপ্লেক্স) ছিল। ব্রাহ্ম প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রদের শারীরিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য ঘনিষ্ঠতম সহযোগী পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর সাহায্যে ‘স্টুডেন্টস উইকলি সার্ভিস’ নামে একটি নৈতিক শিক্ষা কোর্স চালু করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন এ বিষযে়র বক্তা।

রাজনীতির ক্ষেত্রে আনন্দমোহনের দুটি উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনিই সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন, ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে সমাজের সর্বাপেক্ষা সচেতন শ্রেণী ছাত্র সমাজকে অবশ্যই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভৃমিকা পালন করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে তাদের নিজস্ব একটি সংগঠন থাকা উচিত। এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ১৮৭৫ সালে ‘ক্যালকাটা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এর প্রথম সভাপতি হন। পরের বছর ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিযে়শন’ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা। ১৮৮৩ সালে সংগঠনটি একটি জাতীয় আলোচনা সভা আহ্বান করে। পরে এটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে পরিণত হয়। তিনি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৮৫ সালে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’র প্রতিষ্ঠাকালে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সঙ্গে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি । ১৮৯৮ সালের মাদ্রাজ অধিবেশনে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি দু-দুবার ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আনন্দমোহন বসু ১৮৮৪, ১৮৯০ এবং ১৮৯৫ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গবিরোধী এক সভায় সভাপতিত্ব করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে আনন্দমোহন বসু:

সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আনন্দমোহন বসুর বিশেষ অবদান রয়েছে। নারীশিক্ষা ও সমাজ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য সামাজিক কর্মসূচি প্রণয়ন করতে তিনি সকলকে উদাত্ত আহ্বান জানান। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তিনি বিদ্যালয়টিকে বেথুন স্কুলের সঙ্গে একীভূত করেন। ১৮৭৯ সালে কলকাতায় সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ময়মনসিংহের বাড়িতে সিটি কলেজের একটি শাখা খোলেন, যা কালক্রমে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে আনন্দমোহন কলেজ নামে পরিচিত।

সফল শিক্ষাজীবন ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৮৮২ সালে ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশনের (হান্টার কমিশন) সদস্য করে। এর পর একে একে বঙ্গীয় আইন সদস্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও ‘ফেলো’ মনোনীত হন তিনি। তাঁর চেষ্টায় ‘ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট অব ইনকরপোরেশন’ সংশোধন করা হয়। এতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা থেকে পরীক্ষা গ্রহণকারী ও শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। ১৮৯২ সালের ভারত আইনের অধীনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গীয় আইন পরিষদে একজন সদস্য নির্বাচন করার অধিকার পায়। আনন্দমোহন বসু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদে প্রথম প্রতিনিধি।

আনন্দমোহন বসু এবং আনন্দমোহন কলেজ:

নিজ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু ১৮৮৩ সালে ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরের রাম বাবু রোডে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ময়মনসিংহ ইন্সটিটিউশন’(বর্তমান সিটি কলেজিয়েট স্কুল)। প্রতিষ্ঠাকালে এ বিদ্যালয়ে শহরের সর্বাধিক ছয়শত নয়জন ছাত্র ছিল। ময়মনসিংহে কোন কলেজ না থাকায় ১৮৯৯ সালে ‘ময়মনসিংহ সভা’ ও আঞ্জুমানিয়া ইসলামিয়া’ আনন্দমোহন বসুর কাছে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবী জানায়। এ দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের তৎকালীন সভাপতি আনন্দমোহন বসু ১৯০১ সনের ১৮ জুলাই ‘সিটি স্কুল’টিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজে উন্নীত করেন এবং একে কলকাতার সিটি কলেজের সাথে যুক্ত করেন। প্রাথমিক অবস্থায় কলিকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের আর্থিক সহযোগিতায় ময়মনসিংহ সিটি কলেজ পরিচালিত হতো, পরের বছর ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে এটি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ইতোমধ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের অর্থ সাহায্যে কলেজের পুরোভাগে রাস্তার পাশে কলেজের জন্য পাকা ভবন নির্মিত হয়।

১৯০৬ সালে আনন্দমোহন বসুর মৃত্যুর পর ময়মনসিংহ সিটি কলেজ নানা সংকটের সম্মুখীন হয়। প্রথমত কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিল অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে ময়মনসিংহ সিটি কলেজকে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিযুক্তকরণের জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট দাবী পেশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮ সালের ৩১ মার্চ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কলিকাতা সিটি কলেজ থেকে ময়মসসিংহ সিটি কলেজের সংযুক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এই অবস্থায় কলেজের কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন প্রিন্সিপাল বৈকুন্ঠনাথ চক্রবর্তী কলেজটির পুনর্গঠনের উদ্যোগে নেন এবং তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. জে. আর. ব্ল্যাকউডের শরণাপন্ন হন। মি. জে. আর. ব্ল্যাকউডের স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও উদ্যমী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিটি গঠন করে ‘ময়মনসিংহ কলেজ’ নামে কলেজটিকে পুনুজ্জবীত করেন। এ কমিটি কলেজের পরিচালনা ও যাবতীয় খরচের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং কলেজের জন্য তহবিল ও নতুন জায়গা সংগ্রহের জোরালো প্রচেষ্টা গ্রহন করে। তৎকালীন ভারত সরকারের গ্রান্ট-ইন-এইড এর আওতায় অর্থ সাহায্য প্রাপ্তির জন্য বিভাগীয় কমিশনার এর সাথে কমিটি সাক্ষাৎ করে।

বিভাগীয় কমিশানার কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ৫৫,০০০/-(পঞ্চান্ন হাজার) টাকা বরাদ্দ দেন। পাশাপাশি কলেজের সার্বিক উন্নতির জন্য স্থানীয় কয়েকজন জমিদার ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগতভাবে ১,১৮,৩৯৫/- (এক লক্ষ আঠার হাজার তিনশত পঁচানব্বই) টাকা এককালীন অনুদান প্রদান করেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন, মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী (মুক্তাগাছা), রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী (রামগোপালপুর), রাণী দিনমনি চৌধুরাণী (সন্তোষ), বাবু হেমচন্দ্র চৌধুরী (আম্বারিয়া), রাজা জগতকিশোর রায় চৌধুরী (গৌরীপুর), বাবু প্রমথনাথ রায় চৌধুরী (সন্তোষ), রাণী হেমন্ত কুমারী দেবী (পুটিয়া), শ্রীমতি বামা সুন্দরী দেবী (ভবানীপুর) প্রমুখ।

আনন্দমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁর ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য তিনি হলেন, ময়মনসিংহ জেলার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী, আনন্দমোহন বসুর কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের সহপাঠী বন্ধু, আঞ্জুমানে ইসলামিয়া – এর সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ। তিনি কলেজের জন্য কাঁচিঝুলীতে ২৬ বিঘা জমি দান করেন এবং বন্ধু আনন্দমোহন বসুর নামে কলেজটির নামকরণের প্রস্তাব করেন। মৌলভী হামিদ উদ্দিন ছাড়াও তাঁর জমির পাশ্ববর্তী আরো কয়েক বিঘা জায়গা স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কলেজের জন্য দান করেন। সরকারি-বেসরকারি নানা উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থ এবং জমি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কলেজটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। নতুন ভবন নির্মানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে ১৯০৮ সালের শেষের দিকে “ময়মনসিংহ কলেজ” এর নাম পরিবর্তন করে মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর প্রস্তাবমতো কলেজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন বসুর নামানুসারে ‘আনন্দ মোহন কলেজ’ রাখা হয় এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই এটি প্রথম শ্রেণীর একটি কলেজে উন্নীত হয়। ফলে ১৯১৪ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে প্রথম গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কালের পরিক্রমায় আজো স্বমহিমায় বাংলাদেশের একটি অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আনন্দমোহন কলেজ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

নারীর অগ্রযাত্রায় অবদান:

পশ্চাদপদ নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় ১৮৭৬ সালে কলিকাতায় স্থাপন করেন ‘বঙ্গমহিলা মহাবিদ্যালয়। যা পরে বেথুন স্কুলের সঙ্গে একীভুত হয়। আনন্দমোহন বসু ও দুর্গামোহন দাসের ঐকান্তিক চেষ্টায় বেথুন স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণীর দু’ছাত্রী কাদম্বিনী বসু ও সরলা দাস কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার উপযুক্ত বিবেচিত হন। ১৮৭৮ সালে কাদম্বিনী বসু প্রথম এন্ট্রান্স পাস মহিলা হবার গৌরব অর্জন করেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়।

কেবল তাই নয়, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের আন্দোলনে ১৮৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভের দাবি মেনে নেয় এবং ১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু প্রথম মহিলা স্নাতক হবার সম্মান অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি ‘বেঙ্গল প্রভিনসিয়াল কমিটির মাধ্যমে ১৮৮১-৮২ সালে ছাত্রীদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করেন।

প্রগতিশীল সমাজকর্মী, নিবেদিত প্রাণ শিক্ষানুরাগী, বিচক্ষণ কর্মযোগী, রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর উত্তরণে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন আনন্দমোহন বসু, যার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কালোত্তীর্ণ এক মানুষ।

১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট কলিকাতাস্থ জগদ্বীশ চন্দ্র বসুর বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি। মৃত্যুকালে তিনি কোনো বংশধর রেখে যাননি।

আনন্দমোহন বসুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষার দাবী:

ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা উপমহাদেশের প্রথম এবং একমাত্র র‌্যাংলার আনন্দমোহন বসুর পৈত্রিক ভিটার এখন বেহাল দশা। বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম স্থপতি বিখ্যাত এই সমাজ সংস্কারকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি অবৈধ দখলদারদের কবলে। জানা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা আর ভূমি বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় লিজের নামে বাড়িটি নিজের দখলে রেখেছেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবার।

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে আনন্দমোহন বসুর এই পৈত্রিক ভিটাটি সংরক্ষণের জন্য এলাকাবাসী ও সুধীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে অরক্ষিত ভিটায় অযত্ন-আর অবহেলায় ধ্বংস হতে চলেছে সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপত্য শৈলীর অনুপম নিদর্শন এ বাড়িটি। কয়েক একর আয়তনের বাড়িটিতে রয়েছে কয়েকটি বিশাল ভবন, খোলা মাঠ ও একাধিক পুকুর। বিশাল বসতবাড়িটি পরিণত হয়েছে পরগাছা উদ্ভিদের বাসস্থানে। চারদিকে নির্মিত প্রতিরক্ষা দেয়ালের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের অনেক জায়গার ইট-পাথর দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে গেছে। আনন্দমোহন বসুর আতুড়ঘরটিকে বানানো হয়েছে গোবরের গর্ত। এ অবস্থায় ঐতিহ্যের নিদর্শন এসব স্থাপনা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সরকার চাইলে প্রাসাদতুল্য বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে নিয়ে এটাকে সংরক্ষন করতে পারে, যা কিনা প্রাচীন নির্মানশৈলির একটি স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কীর্তিমান এই মানুষটির স্মৃতি সংরক্ষনে এক সময় এলাকার কিছু শিক্ষিত যুবক মিলে গড়ে তুলেছিলো বসু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। তাদের দাবী ছিলো এই বাড়িটিতে যেন একটি কলেজ নির্মান করা হয়।

সচেতন মানুষের একটাই দাবী, আনন্দমোহন বসুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করে আনন্দমোহন বসুর স্মৃতি রক্ষায় সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

লেখকঃ স্বপন পাল, কবি ও উন্নয়ন কর্মী।