ঢিল ছুড়ে সমঝোতা, এ কি হওয়ার

বিভুরঞ্জন সরকার: সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বিএনপিকে চাঙ্গা করে তুলেছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এখন বিএনপির প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে রাজনীতি, সংসদ, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করা হয়েছে যেগুলো বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সরকার এবং আওয়ামী লীগ এই রায়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। বিএনপি সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে। রাজনীতিতে এ নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে নেই। থাকলে উত্তেজনা আরও বেশি হতো কিনা সেটা নিয়ে অনুমাননির্ভর মতামত না দেওয়াই ভালো। তবে এটুকু বলা যায়, যাই হোক না কেন, রায়ের রাজনীতির সোনালি ফসল বিএনপি ঘরে তুলতে পারবে না। খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

চোখ ও পায়ের চিকিৎসার জন্য গত ১৫ জুলাই লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। কোরবানির ঈদ তিনি এবার পুত্র-পুত্রবধূ-নাতনিদের সঙ্গে লন্ডনেই উদযাপন করেছেন। চিকিৎসা ছাড়াও লন্ডনে অবস্থানরত পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি শলা-পরামর্শ করবেন বলেও জানানো হয়েছে। এর বাইরে লন্ডনে অবস্থানকালে খালেদা জিয়া আর কী করবেন বা করতে পারেন তা নিয়ে গুজব-জল্পনা-কল্পনা চলছে। যারা খালেদা জিয়া এবং তার রাজনীতি অপছন্দ করেন তারা মনে করছেন খালেদা জিয়া চিকিৎসার নামে লন্ডনে গিয়ে আসলে সরকারবিরোধী কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ করতে পারেন। সেখানে তারেক রহমান কয়েক বছর ধরে বসবাস করছেন।

তারেকের মস্তিষ্ক ষড়যন্ত্রের জন্য উর্বর বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, লন্ডন-অভিযান সফল বা বিফলের ওপর নির্ভর করবে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রম। বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, ‘সহায়ক’ সরকারের প্রশ্নে বিএনপি কতটুকু দৃঢ় থাকবে এসব কিছুই নির্ভর করছে লন্ডনে কী হয় না-হয় তার ওপর। খালেদাবিরোধীদের ধারণা, তারেক আগে থেকেই সেখানে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রাথমিক কিছু যোগাযোগ করে রেখেছেন। খালেদা জিয়া সেগুলোতে ফাইনাল টাচ দেবেন। কেউ আবার মনে করেন, ষড়যন্ত্রের বিষয়টি একেবারেই কষ্টকল্পনা। ষড়যন্ত্র করার জন্য লন্ডনে যাওয়ার দরকার হয় না। খালেদা জিয়া ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করেন না। যা ভাবা হচ্ছে সে রকম কিছুই বাস্তবে হবে না। তিনি দেশে ফিরে এসে বিএনপিকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করে তুলবেন।

খালেদা জিয়া যে শেখ হাসিনার সরকারকে একেবারেই বরদাশত করতে চান না বা পারেন নাÑ এতে কোনো মিথ্যা নেই। তিনি আইনি-বেআইনি যে কোনো উপায়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। নির্বাচনে না হলে বল প্রয়োগ করে। সে চেষ্টা তিনি করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার কৌশলের সঙ্গে তিনি পেরে উঠছেন না। নানা কারণে তার ভেতর প্রচন্ড রাগ ও ক্ষোভ রয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনার সরকার তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে, অসংখ্য মামলা দিয়ে তাকে আদালতে যেতে বাধ্য করেছে। তার যে আত্ম-অহমিকা তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বর্তমান সরকার।

সরকারের পতন হবে আশা করে হেফাজতে ইসলাম নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠনের হাজার হাজার সমর্থক মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নিলে খালেদা জিয়া তার দলীয় কর্মীদের হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই সময় যদি সরকারের পতন হতো তাহলে খালেদা জিয়া কি ক্ষমতা পেতেন? অবশ্যই নয়। ক্ষমতা চলে যেত কট্টর ধর্মবাদীদের হাতে। তা জানা সত্ত্বেও তিনি হেফাজতকে সমর্থন দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন না সেটা ভেবেই।

খালেদা জিয়ার প্রবল হাসিনা বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে কেউ যদি তার লন্ডন সফরের পেছনে কোনো রহস্য খোঁজে তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। দেশের মানুষ আশা করছে, খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিয়ে, পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতনিদের নিকটসান্নধ্যে কয়েকটি দিন কাটিয়ে মানসিক স্বস্তি নিয়ে দেশে ফিরবেন এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুকূল সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের রাজনীতিতে সুবাতাস ছড়িয়ে দেবেন।

লন্ডন থেকে খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরবেন না বলে আওয়ামী মহল থেকে এক ধরনের প্রচারণা চালানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খালেদা জিয়ার ফিরে আসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। খালেদা জিয়া দেশে না ফিরলে আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধা হয়। এটা সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের সুবিধা বা লাভ হয় বা হবে এমন কাজ খালেদা জিয়া করবেন সেটা আশা করা কেন? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়া মামলার ভয়ে পালিয়ে গেছেন। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়া পালিয়ে গেছেন, এটা তো আহাম্মকও বিশ্বাস করবে না। ওবায়দুল কাদেরকে একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ মনে করি। কিন্তু সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার আগে এমন ভাষায় তিনি বলতেন না। আমরা বুঝি না, কেন তার এই পরিবর্তন।

আমাদের রাজনীতিবিদরা ভাষা ব্যবহারে সব সময় সীমা মেনে চলতে পারেন না। মির্জা আলমগীরকেও একজন সজ্জন মানুষ মনে করা হয়। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের মানুষ। বিএনপি নেতাকর্মীদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি চোখের পানি সংবরণ করতে পারেন না। কিন্তু তিনিও কি বক্তৃতা দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে সংযম হারিয়ে ফেলেন না? যেমন তিনি সরকারের উদ্দেশে বলছেন, আসুন, কথা বলুন। কীভাবে সেই সরকার (সহায়ক) গঠন করা যেতে পারে, কীভাবে সবাই অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটের অধিকারকে নিশ্চিত করে একটা নির্বাচন করতে পারি।

এ পর্যন্ত ঠিক আছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা-সংকট সমাধান করতে চাওয়া খারাপ কিছু নয়। বরং এটাই হওয়া উচিত। উচিত কাজটি আমাদের রাজনীতিতে হয় না সেটাই হলো খারাপ। কিন্তু আলোচনার আহ্বান জানিয়ে পরে যা বলেছেন, যে হুমকি দিয়েছেন, সেটা কি ঠিক? মির্জা আলমগীর বলেছেন, আলোচনায় না বসলে নাকি সরকার পক্ষ পালানোর পথ পাবে না। এই পালানোর কথা কেন আসে? খালেদা জিয়াও একাধিকবার বলেছেন এই পালানোর পথ না পাওয়ার কথা। এই ধরনের হুমকি কি গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্র সম্পর্কে কত সবক দেয় বিএনপি।

অথচ তাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে চরম ফ্যাসিবাদী মানসিকতা। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হবে এবং বিএনপি জিতবে। তা হলেও আওয়ামী লীগারদের দেশ ছেড়ে পালাতে হবে কেন? গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় তো স্বাভাবিক ঘটনা। পরাজিত পক্ষকে দেশ ছাড়ার হুমকি দেওয়া একেবারেই শোভন ও সমর্থনযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড ভালো নয়। ২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে বিএনপি তার জোটসঙ্গী জামায়াতকে নিয়ে পরাজিত আওয়ামী লীগের ওপর, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত সংখ্যালঘুদের ওপর যেভাবে বর্বর আক্রমণ চালিয়ে তাদের নির্মূল করতে প্রয়াসী হয়েছিল তা ছিল এক কথায় নজিরবিহীন। আওয়ামী লীগের অসংখ্য জনপ্রিয় নেতা নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন।

সরকারের কোনো ধরনের ইঙ্গিত-ইন্ধন না থাকলে ঘাতকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে? টঙ্গীর সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়া, খুলনার মঞ্জুরুল ইমামসহ অনেকেই বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে ঘাতকদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার দায় বিএনপি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না। ওই গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের জীবননাশের আশঙ্কা ছিল। আইভি রহমানসহ ২২ জনের প্রাণ গিয়েছিল।। এখন বিএনপি নেতারা যখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দেশ ছাড়া করার হুমকি দেন তখন শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। তখনই প্রশ্ন আসে, এমন একটি দলকে কি ক্ষমতায় আনা উচিত, যারা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পরিবর্তে তাদের নির্মূল করতেই বেশি উৎসাহী?

এবার পালানোর প্রসঙ্গে একটু নজর দেওয়া যেতে পারে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি কেন পালিয়ে যাবেন? বিএনপি কি তার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ? বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ অতীতে একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ১৫ আগস্টের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার অর্থ বুঝতে খুব কষ্ট হওয়ার কথা কি? না, এটা ১৯৭৫ সাল নয়। তখনকার প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। বর্তমান সময়েও ১৫ আগস্টের চিন্তা যাদের মাথায় ঘোরে তারা রাজনৈতিকভাবে নির্বোধ।

আর একটি কথা। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো সংকটের সময় কি পালিয় গেছেন, না বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন? খালেদা জিয়া বরং রহস্যজনক অন্তর্ধানের খবর হয়েছেন অন্তত দুবার। কাচের ঘরে বাস করে অন্যের দিকে ঢিল ছোড়ার বদঅভ্যাস আমাদের রাজনীতিবিদদের পরিহার করা উচিত।

বিএনপি যে নির্মূলের রাজনীতি পছন্দ করে সেটাও মির্জা ফখরুলের বক্তৃতায়ই স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, আগামীতে সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ নির্মূল হয়ে যাবে। বিএনপির কথা অনুযায়ী সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। নির্বাচনে পরাজিত হলেই কি একটি রাজনৈতিক দল, যার রয়েছে ব্যাপক গণভিত্তি, নির্মূল হয়ে যাবে? বিএনপি নির্বাচনে হেরেছে বলেই কি নির্মূল হয়ে গেছে? এ ধরনের বালখিল্য বক্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকেই কেবল বিষাক্ত করে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগকে নির্মূল করবেÑ এমন কথা মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে বলার পর আওয়ামী লীগ আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুতি না নিয়ে পারে? আওয়ামী লীগ নির্মূলের কী কী হাতিয়ার বিএনপির আছে তা জানার জন্য বিএনপির গতিবিধি যদি কড়া মনিটরিংয়ে আসে তখন বিষয়টি খুব সুখকর হবে কি?

রাজনীতিবিদদের উচিত পরস্পরের প্রতি ঢিল নিক্ষেপের রাজনীতি বাদ দেওয়া। নির্বাচনে জয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই এই ধারণায় অবিচল থাকলে সহায়ক সরকার কেন, কোনো সরকারের অধীনের নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হবে না। পরাজিত পক্ষ বলবে, তাদের ষড়যন্ত্র করে হারিয়ে দেওয়া হয়ছে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এটা আমরা দেখেছি। যারা রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলেন তারা দেশের প্রধান দুই দলের পারস্পরিক অবস্থানের কথা জেনে-বুঝেও কেন তা বলেন সেটা বোধগম্য নয়। এই যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা সাহেব এত আলোচনার কথা বলছেন, কিন্তু তিনি কি আলোচনার পরিবেশ ইতিবাচক করার জন্য শব্দ-বুলেট নিক্ষেপ সাময়িকভাবেও বন্ধ রাখতে পারেন না? কেবল সরকারের কাঁধে সব দায় চাপিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি কিংবা পরিবর্তন করা যাবে না। এক হাতে তো আর তালি বাজে না।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক