অবশেষে গ্রেপ্তার নৃশংস খুনী অমিত মুহুরী

রনজিত কুমার শীল, চট্টগ্রাম; চট্টগ্রাম মহানগরীর এনায়েত বাজার এলাকার রানীরদিঘীতে পাওয়া ড্রামের ভেতর থেকে লাশ উদ্ধারের সে রহস্য উদঘাটন হয়েছে। গত শনিবার রাতে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয় নৃশংস খুনী অমিত মুহুরী (৩০)কে। স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্কের সন্দেহে বাল্যবন্ধু ইমরানুল করিম ইমনকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যুবলীগ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী। গত রবিবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমানের আদালতে অমিত জবানবন্দি দেন। তবে হত্যাকান্ডের জন্য গ্রেফতার হওয়া অপর বন্ধু ইমাম হোসেন মজুমদার শিশিরকে বেশী দায় করেছে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী।

সিএমপির সহকারি কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অমিত মুহুরী দন্ডবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সে তার বন্ধু ইমনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে অমিত আদালতকে জানিয়েছে, কিভাবে সে তার বন্ধুকে হত্যা করেছে। তবে সব কিছুর জন্য সে তার অপর বন্ধু গ্রেফতারকৃত শিশিরকে দায়ী করেছে।

সে জানায়, তার বন্ধু শিশির প্রথমে ইমনের গলায় ছুরি দিয়ে আঘাত করে। আমি শুধু ধাক্কা দিয়েছিলাম। এতে পড়ে গিয়ে মাথায় জখম হয় ইমনের। শুক্রবার শিশির আদালতে জবানবন্দি দিয়ে জানিয়েছিল, অমিত মুহুরী ও তার স্ত্রী চৈতি মিলে ইমনকে খুন করে। পরে শিশিরসহ কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় মরদেহ গুম করার চেষ্টা করে। ইয়াবা আসক্ত অমিতের স্ত্রী চৈতিকে ভিকটিম ইমন খারাপ চোখে দেখেন, এমন সন্দেহ থেকেই খুন।

হত্যাকান্ডের পর পালিয়ে যাওয়া অমিত মুহুরীকে শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর উপজেলায় আদর নামে একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে বুধবার রাতে গ্রেফতার করা হয় অমিতের বন্ধু শিশির (২৭) এবং তার বাসার নিরাপত্তারক্ষী শফিকুর রহমান শফিকে (৪৬)।

এদিকে ডিবি পুলিশ জানায়, ইমরানুল করিম ইমনকে খুনের মামলায় গ্রেফতার এড়াতে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী কুমিল্লায় পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করে। কিন্তু কুমিল্লার একটি মাদক নিয়াময় কেন্দ্রে ভর্তি হয়েও পার পাননি যুবলীগ নামধারী এ সন্ত্রাসী। কুমিল্লা শহরের আদর মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে শনিবার তাকে গ্রেফতার করা হয় তাকে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (বন্দর) আসিফ মহিউদ্দিন জানান, মাদকাসক্ত অমিত চুল-দাড়ি কেটে বেশভূষাও পাল্টে ফেলেছিলেন। তবে গলা আর হাতে আঁকা উল্কি দেখে পুলিশ তাকে চিনে ফেলে। রাউজানের ইমন আর অমিত মুহুরি বাল্যকালের বন্ধু। এমনকি তারা একসাথে কিন্ডার গার্ডেনে পড়াশোনা করেছে। রাউজানের একই এলাকায় দুজনের বাড়ী হলেও অমিত থাকতো নগরীর নন্দনকানন এলাকায়। অমিত যেমন ইমনের বাড়ীতে যেতো ইমনও অমিতের শহরের বাসায় যাতায়াত করতো। এতে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের সন্দেহে অমিত বন্ধু ইমনকে খুন করান বলে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দুজন পুলিশকে জানায়।

গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য মতে পুলিশ জানায়, হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে গত ৮ আগস্ট রাতে ইমনকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে যায় অমিত। পরে সেখানে আরো কয়েকজন যুবলীগ সন্ত্রাসী ডেকে নিয়ে ইমনকে রাতভর বাথরুমে আটকে রেখে ভোরের দিকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ ৩ দিন সেখানেই রেখে দেয়। পরে ড্রাম ভর্তি করে মুখ সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে ১২ আগস্ট গভীর রাতে ড্রামটি এনায়েত বাজার (জুবলী রোড়ে ভীতরে) রানীর দিঘীতে ফেলে দেয়।

জানাগেছে রানীর দিঘীতি গভীর রাতে লাশ ভর্তি ড্রামটি ফেলার সময় স্থানীয় ৩ ব্যাক্তি তা দেখে ফেলে। পরদিন তাদের দেয়া খবরের ভিক্তিতে পুলিশ ড্রামটি পুকুর থেকে উদ্ধার করেছিল। পরে পুলিশ তদন্ত করে ইমনের পরিচয় নিশ্চিত হয় এবং শিশির ও শফি নামে দুজনকে গ্রেফতার করে। ৩১ অগাস্ট ওই দুজনকে গ্রেফতারের পর থেকে অমিতকে খুঁজছিল পুলিশ।

পুলিশ জানায়, অমিত নিজেকে যুবলীগ ‘নেতা’ পরিচয় কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী বলে জানায়। তার বিরুদ্ধে সিআরবির জোড়াখুন ও ইমন খুনসহ অমিতের বিরুদ্ধে মোট ১৩ টি মামলা আছে বলে পুলিশ জানায়।

এছাড়া তার গুরু যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর বাবরের সহ তার গ্রুপের সন্ত্রাসীরা ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারী সিআরবিতে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে জোড়া খুনের মামলার আসামি। এসব মামলা যুবলীগের কেন্দ্রীয় উপ-সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন, যুবলীগ ক্যাডার অমিত মুহুরীরসহ ৬২ জনের নামে আদালতে চার্জশীর্ট দাখিল করেছে। এ মামলায় অমিত মুহুরীকে ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর নগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পরে অমিত জামিনে বেরিয়ে আসে।