২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং তারপর…

রহমান মুস্তাফিজ: ২০০৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে দীর্ঘদিন চ্যানেল আই’তে নির্দিষ্ট কেউ চিফ রিপোর্টার ছিলেন না। পালা করে দায়িত্ব পালন করা হতো। হিসেবটা ছিল এমন, সপ্তাহে দু’দিন করে Ruhul Amin Rushd, Sontosh Mondol (প্রয়াত) ও আমি দায়িত্ব পালন করতাম। বাকি একদিন একেকজন পালন করতাম। অধিকাংশ সময়ই আমার ভাগে পরতো তিনদিন।

মনে আছে, ২০ আগস্ট পরের দিনের অ্যাসাইনমেন্ট শিট আমি তৈরি করেছিলাম। আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলাম Ashraful Alam Khokan-কে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব) ও ক্যামেরাম্যান আলীকে (বর্তমানে ইটিভিতে)।

আমি তখনো মাঠে কাজ করি। সিনিয়ররা নাইট ডিউটিতে যেতেন না। তবে আমি দিনের পাশাপাশি নাইট ডিউটিও করতাম। তাতে দিনে একজন বাড়তি রিপোর্টার পাওয়া যেত। ২০ আগস্টও রাতে ছিলাম। সকালে ৯টার দিকে বাসায় ফিরে ঘুম দিলাম। উঠলাম বিকেল ৪টার দিকে। রেডি হয়ে সোজা আঁলিয়স ফ্রাঁসেস-এ। ক্যাফেতে খাবারের কথা বললাম। খাবার টেবিলে আসার আগেই ইন্টার্ণ রিপোর্টার মারুফ (এখন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) ফোন করলো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালো গ্রেনেড হামলার কথা। জানালো খোকনের আহত হওয়ার কথা। খাবার মাথায় উঠলো। কাউন্টারে এসে জানালাম খাবার না দিতে। কাউন্টারের সামনে টুলে বসা ছিলেন বরেণ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা কাউসার চৌধুরী ভাই। তাকে জানালাম হামলার কথা।

একটা রিকশা নিয়ে সোজা ঢাকা মেডিকেল। পথে টেলিফোনে কথা বললাম প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহ আলমগীর (Shah Alamgir) ভাইয়ের সাথে। জানালাম মেডিকেলে যাওয়ার কথা। আলমগীর ভাই জানালেন, ওখানে কয়েকটি টিম আছে। কাজটা গুছিয়ে করার কথা বললেন। হাসপাতালের গেটেই পেলাম দু’টি টিম। ভিতরে আরেকটি। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি টিম পাঠালাম ইমার্জেন্সির গাড়ি বারান্দার ছাদে। একটি গেটে, আরেকটি পাঠালাম হাসপাতালের ভিতরে। তখনো আহত-নিহতদের আনা হচ্ছে রিকশায়-ভ্যানে করে। চারদিকে হতবিহ্বলভাব আর আহাজারি।

হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে স্তম্ভিত হলাম। এ কি করে সম্ভব? মনে হলো রক্ত দরকার, প্রচুর রক্ত। রক্ত দিতে আসছেন অনেকেই। কিন্তু বিশৃঙ্খলা সেখানেও। সাথে সাথেই একটা অ্যাজ লাইভ দিলাম ব্লাড ব্যাংকের সামনে থেকে। সেটা পাঠিয়ে দিলাম অফিসে। রক্তের আহ্বান জানানো এবং শুধু একটি ব্লাড ব্যাংকে যেন সবাই ভিড় না করেন এমন আহ্বান ছিল। তথ্য ছিল আর কোথায় কোথায় রক্ত দেয়া যাবে সে বিষয়ে। যা বারবার প্রচার হলো স্পেশাল বুলেটিনে।

৩২ নাম্বার ওয়ার্ডে গিয়ে পেলাম অনেককে। একটা খাটে শুয়ে আছেন আদা চাচা (করিম। তিনি আদা শুকিয়ে সাথে রাখতেন। আমরা অ্যাসাইনমেন্টে গেলে সে আদার ভাগ আমরাও পেতাম। আদা বিলি করতে করতে তার নামই হয়েগিয়েছিল আদা চাচা)। সেখানেই পেলাম তিন চারজনের মরদেহ। যাদের পরিচয় পেলাম, তাদের পরিচয় এসএমএস করে জানিয়ে দিলাম আলমগীর ভাইকে।

সেখান থেকে গেলাম ওটিতে। সেখানকার অবস্থাও ভয়াবহ। রক্তে ভেসে গেছে পুরো ফ্লোর। ভিতরে ঢুকলাম। পিছন থেকে ডাক শুনলাম। দেখলাম স্পোর্টস রিপোর্টার এহসানকে (বর্তমানে একাত্তর টিভিতে)। জানালো তার কাজিন ভিতরে আছে কিনা দেখতে। নানাজনের বিচ্ছিন্ন হাত-পা সরিয়ে জায়গা করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হঠাৎ পা হড়কালো। মাটিতে পড়ে রক্তে মাখামাখি হলাম। খেয়াল করলাম কারো মগজে (ব্রেইন) পা পড়ে পিছলা খেয়েছি। সেখানকার ফুটেজ এবং আরও কয়েকজনের পরিচয় নিয়ে অফিসে এলাম। আলমগীর ভাই মেডিকেলের অবস্থা নিয়ে রিপোর্ট করতে বললেন।

সে রাতে নাইট ডিউটি ছিল চকোর মালিথার। সেটাই তার প্রথম নাইট শিফটের ডিউটি। বেচারি নতুন। একা সামলাতে পারবে না বলে আমিও থেকে গেলাম। ক্যামেরাম্যান করিমকেও রেখে দিলাম। রাতে ড্রাইভার একজন। তাকে দিলাম চকোরের সাথে, বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে আহতদের খোঁজ নিতে। রাত ১টার দিকে আমি যখন বের হবো তখনও আলমগীর ভাই অফিসে। জানতে চাইলেন গাড়ি ছাড়া মুভ করবো কি করে। বললাম, রিকশায়। টেনশন করবেন না, আজকের রাতে কোন ছিনতাইকারী রাস্তায় থাকবে না বলে আশ্বস্ত করলাম।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গিয়ে পেলাম ভিন্ন চিত্র। সেই রাতেই মহানগর পাঠাগারের পাশে গ্রেনেড ফাটানো হলো, যা বিকেলে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ফাটেনি। নিঃশ্চিহ্ন করা হলো হামলার আরেকটি আলামত।

রাতে গেলাম ধানমণ্ডিতে সুধা সদনে, সেখানকার অবস্থা দেখার জন্যে। সাথে ছিলেন মামুনুর রহমান খান, তারিকুল ইসলাম মাসুম, মাহবুব মতিন (প্রয়াত)।

সুধা সদনের সামনে তখন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পপির নেতৃত্বে কর্মীরা বসে আছেন। খবর এলো, হাওয়া ভবন থেকে শোকবাণী নিয়ে লোক আসবে। আগেই পৌছে গেছেন বিটিভির সিনিয়র ক্যামেরাপার্সন (পিএম কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত) জাহিদ ভাই। কর্মীরা বিটিভির ক্যামেরা দেখে উত্তেজিত হলেন। তাদের শান্ত করর চেষ্টা করলাম। বললাম, তিনি সরকারি চাকুরে। পেশায় আমাদের সিনিয়র। আমাদের না মেরে জাহিদ ভাইয়ের গায়ে হাত তোলা যাবে না। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আমাদের কথা বুঝলো এবং শুনলো।

একদিন পর, ২৩ আগস্ট নৃশংস-জঘন্য (আসলে কোন বিশেষণই পুরোটা অর্থ বহন করে না) গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে হরতাল। আমার দায়িত্ব ৩২ নম্বর ও আশপাশের এলাকা। সকাল ১০টা দিকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা সংসদ ভবন থেকে মিছিল নিয়ে এলেন ৩২ নাম্বারে। সেই মিছিলে হামলা হলো।

সোহেল তাজ ও আমি আহত হলাম। আহত হওয়া খবর অফিসে জানালাম (সেটা ভিন্নকাহিনী, আরেকদিন বলা যাবে সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতা)। রিপ্লেসমেন্ট এলো না। খুড়িয়ে খুড়িয়ে আরও ঘন্টা চারেক ডিউটি দিলাম। দুপুরের খানিক পর আরেকটি বেশ বড়ো মিছিল এলো মোহাম্মদ নাসিম ভাইয়ের নেতৃত্বে। সেই মিছিলে আবার পুলিশী হামলা। নাসিম ভাই আর আমি আহত হলাম। এ দফায় পুলিশের মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। শুধু জ্ঞান হারাবার আগে শার্টের ভিতরে কিভাবে যেন বুমটা (মাইক্রোফোন) ঢুকিয়ে ছিলাম।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সহায়তায় ক্যামেরাম্যান Fuad Hossain (এখন মাছরাঙা টিভিতে) শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে গেল। এর অনেক্ষণ পর এলেন স্পোর্টস রিপোর্টার শামীম ভাই (Mahmudul Hasan Shamim, এখন দেশ টিভির বার্তা সম্পাদক)। তারপরের কয়েকটা দিন কেটে গেল বিছানাতে।

লেখক: সাংবাদিক