কোরবানির পশুর বর্জ্য রপ্তানিতে হাজার কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন

এজাজ রহমানঃ পবিত্রকোরবানির পশুর চামড়া এবং মাংস ছাড়া অন্যান্য অংশ নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথা নেই কোরবানিদাতাদের। তাই গরু বা খাসি জবাইয়ের পর অবশিষ্টাংশ যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, একই সঙ্গে দেশ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করে এ খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করে, কোরবানির পশুর ফেলে দেওয়া বর্জ্যকে যদি যথাযথভাবে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা যায় তাহলে এ খাত থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা রপ্তানি আয় করা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা।

এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি আয়ে বড় অবদান রাখতে পারে কোরবানি পশুর ফেলে দেওয়া বর্জ্য। এদিকে সম্প্রতি রাজধানীর হাজারীবাগের হড্ডিপট্টিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া পশুর হাড়, শিং, পিত্ত (যৌনাঙ্গ), অন্ডকোষ, ভুঁড়ি, মূত্রথলি, গোর্দা (পাকস্থলি) এবং চর্বি উন্মুক্ত পরিবেশে গুদামজাত করছে হাড় সংগ্রহকারীরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হয়েছে হাড়ের বস্তা। আর নোংরা পরিবেশে শুকানো হচ্ছে পশুর যৌনাঙ্গ।

এর ফলে আশপাশের এলাকায় যেমন দম বন্ধ করা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে হাঁড় পঁচা থেকে পোঁকা বের হয়ে কিলবিল করতে দেখা গেছে পুরো এলাকায়। এ ছাড়া উন্মুক্ত পরিবেশে সংগৃহীত চর্বি জ্বাল দেওয়ার ফলে উদ্ভট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এলাকায়। ডিএসসিসির অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে ঈদের সময় পশু কোরবানির পর হাড় সংগ্রহ করে টোকাইরা। তারা হাড় ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে।

পরে সেই উচ্ছিষ্ট যায় হাজারীবাগের হাড্ডিপট্টির আড়তে। প্রকারভেদে প্রতি টন হাড়ের মূল্য ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার এলাকা থেকে গরু ও মহিষের যৌনাঙ্গ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর প্রতিটির রপ্তানি মূল্য পাঁচ থেকে ছয় ডলার। তিনি বলেন, কোরবানির পশুর বর্জ্য মানুষ ফেলে দেয়। কিছু কুকুরে খেয়ে ফেলে। আবার অনেক বর্জ্য পচে গলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। অথচ দুই মণ ওজনের প্রতিটি গরু থেকে প্রাকৃতিক সার তৈরির জন্য ২০ কেজি বর্জ্য তৈরি হয়। গরুর গোল্লা প্রতি পিস রপ্তানি মূল্য ১০-১২ ডলার।

এ প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, ‘দেশের গবাদি পশুর শরীরের কোন অংশই ফেলনা নয়। মাংস এবং চামড়ার কদর জানা। কিন্তু কোরবানির পশুর অবশিষ্টাংশ আমরা ফেলে দিই। এসব অংশ রপ্তানি করে হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। যদিও বর্তমানে এসব পণ্যের স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।’ তিনি আরো বলেন, বর্তমানে তাঁরা মোট বর্জের মাত্র ২০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পরেন।

আর এ থেকে গত অর্থ বছরে ১৭০ কোটি টাকা রপ্তানি আয় করা সম্ভব হয়েছে। পুরো বর্জ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা গেলে এ থেকে বছরে এক হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া চলতি অর্থ বছরে ২৫০ কোটি টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ীবৃন্দ। পশুর হাড় দিয়ে ঔষুধ ক্যাপসুলের কভার, মুরগি ও মাছের খাবার, জমির সার, চিরুনি ও পোশাকের বোতাম তৈরি হয়। নাড়ি দিয়ে অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে সাবান, পায়ের খুর দিয়ে অডিও-ভিডিওর ক্লিপ ও অন্ডকোষ দিয়ে চায়নিজরা তৈরি করে বিশেষ সুপেয় স্যুপ।

তিনি বলেন, সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও গরুর হাড় ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া জার্মানি ও ইতালিতে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পশুর শিং সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর বিভিন্ন বর্জ্য কোরবানির পশুর বর্জ্য বিক্ষিপ্তভাবে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করার ফলে অর্থ এবং সময় দুইই অপচয় হচ্ছে। তাই এই খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে এ খাতকে কুটির শিল্পে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা সরকার ভাবতে পারে। এর ফলে পরিবেশ দূর্ষণ কমে আসবে এবং বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি আয়ও বাড়তে পারে।

তিনি প্রাথমিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া পল্লীতে তিন থেকে পাঁচ কাঠার জমিতে ৫০-৬০টি কারখানাকে জমি বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এ রাজধানীর পরিষ্কার পরিচ্ছনতা কমে যাবে পাশাপাশি শিল্প ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের সরকার দায়িত্ব নিলে খাত পরিপূর্ণতা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ছাড়া সরকারের পাশাপাশি ঔষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠাগুলো এগিয়ে এলে পশুর বর্জ্যে দূষণ মুক্তির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।