১০ আসামিকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ

নিউজ ডেস্ক: গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ২০০০ সালের ৭৬ কেজি ওজনের বোমা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে হাইকোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে এই মামলায় এক আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৩ আসামির ১৪ বছর করে কারাদণ্ড এবং অপর ১০ আসামিকে খালাসের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

অন্যদিকে গোপালগঞ্জ সদর থানার ৮০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধারের একটি মামলায় ৯ আসামির ২০ বছর করে কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অপর ৪ আসামিকে খালাসের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

আজ রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকার ২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মমতাজ বেগম এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামি হলেন, ওয়াসিম আকরাম ওরফে তারেক হোসেন ওরফে মারফত আলী (কারাগারে), মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম ওরফে রাশেদুজ্জামান খান ওরফে শিমন খান (কারাগারে), মো. ইউসুফ ওরফে সোহরাব মোড়ল ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান (কারাগারে), হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার (কারাগারে), হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া (কারাগারে), মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই এবং মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আবু ওমর (কারাগারে)।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হলেন, মেহেদী হাসান ওরফে আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে গাজী খান (কারাগারে)। রায়ে এ আসামির একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

১৪ বছর করে দণ্ডিত ৩ আসামি হলেন, মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস (কারাগারে), মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ (কারাগারে) ও সারোয়ার হোসেন মিয়া। এই আসামিদের একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ১ বছর করে কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫ (১) ধারার বিধান মতে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য দণ্ড প্রদান করেছেন।

এছাড়া একই আইনে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাসপ্রাপ্ত ১০ আসামি হলেন, খন্দকার মো. কামাল উদ্দিন শাকের, আরিফ হাসান সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক (কারাগারে), মুন্সি ইব্রাহিম, মো. শাহনেওয়াজ ওরফে আজিজুল হক, মো. লোকমান, শেখ মো. এনামুল হক, মিজানুর রহমান, মাওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির (কারাগারে), মো. মাহমুদ আজহার ওরফে মামুনুর রশিদ ও আবুল হোসেন খোকন (কারাগারে)।

অন্যদিকে ৮০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলায় ২০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামি হলেন, মো. ইউসুফ ওরফে সোহরাব মোড়ল ওরফে আবু মুসা হারুন, মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস (কারাগারে), মেহেদী হাসান ওরফে আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে গাজী খান (কারাগারে), ওয়াসিম আকরাম ওরফে তারেক হোসেন ওরফে মারফত আলী (কারাগারে), মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ (কারাগারে), মো. মাহমুদ আজহার ওরফে মামুনুর রশিদ ওরফে মাহমুদ, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম ওরফে রাশেদুজ্জামান খান ওরফে শিমন খান (কারাগারে), মো. শাহনেওয়াজ ওরফে আজিজুল হক ও শেখ মো. এনামুল হক।

১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৪/৬ ধারায় এ দণ্ড প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় খালাস পাওয়া ৪ আসামি হলেন, মো. হাসমত আলী কাজী (জামিনে), আবুল হোসেন খোকন (কারাগারে), মুন্সি ইব্রাহিম ও মো. লোকমান।

উল্লেখ্য, উভয় মামলার প্রধান আসামি ছিলেন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান। তিনি ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হত্যা মামলায় তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তাকে উভয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তার ভাই মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজের এক মামরায় ১৪ বছর এবং অরেক মামলায় ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর ওই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শামসুল হক বাদল ও ঢাকা মহাগর পাবলিক প্রসিকিউটর খোন্দকার আব্দুল মান্নান খান বলেন, রায়ে তারা সন্তুষ্ট। অনেকদিন পর হলেও তারা মামলা দুইটির বিচার তারা সম্পন্ন করতে পেরেছেন।

তবে রায়ে অসেন্তোস প্রকাশ করে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারুক হোসেন উচ্চ আদালতে আপিল করবেন কলে জানিয়েছেন।

এর আগে গত ১০ আগস্ট মামলা দুইটির যুক্তিতর্কের শুনানির পর ২০ আগস্ট রায় ঘোষণার এ দিন ঠিক করেছিলেন বিচারক।

মামলা দুইটির মধ্যে ৭৬ কেজির বোমার মামলায় ৮৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল।

অন্যদিকে ৮০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলায় ৪৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৯ জন সাক্ষীর সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশ করার কথা ছিল। ওই সমাবেশের প্যান্ডেল তৈরির সময়ে ২০ জুলাই ওই কলেজের পাশ থেকে ৭৬ কেজি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই দিনই গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার এস আই নূর হোসেন একটি মামলা করেন।

পরবর্তীতে রমনা বটমূলে বোমা হামলার মামলায় হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তি করে সে নিজে এবং অন্যান্য আসামিরা এই মামলাগুলোয় জাড়িত মর্মে প্রকাশ করায় সিআইডি পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম মামলা ২টিতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। ওই চার্জশিটে মোট মুফতি হান্নানসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার চার্জশিটে বলা হয়, মুফতি আব্দুল হান্নান আফগানিন্তানে মুজাহিদ ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং সেখানে তিনি তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। তিনি দেশে ফিরে হরকাতুল জেহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশি নামক সংগঠনের সদস্য হন। তার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য গোপালগঞ্জে বিসিক এলাকায় অবৈধভাবে সোনার বাংলা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি সাবানের কারখানা স্থাপন করে। সে কারখানায় আসামিদের নিয়োগ প্রদান করে এবং সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন।

উভয় মামলায় মুফতি হান্নানসহ চার জন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। প্রথমে মামলা দুইটির বিচার গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শুরু হয়। পরে ২০১০ সালে উভয় মামলা রায় ঘোষণাকারী ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।