শুভ জন্মদিন : মার্কসবাদী দার্শনিক যতীন সরকার

দীপংকর গৌতম : যতীন সরকার। একজন মার্কসবাদী চারণ দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক এবং দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী। কত পরিচয় দেব আমাদের যতীনদা’র। আমার বাবা ন্যাপ করতেন। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ন্যাপের মধ্যে কাজ করে। আমাদের বাড়িটা ছিলো কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের মতো। একতা, উদয়ন, নতুন বাংলা, হাতিয়ারসহ অনেক পত্রিকা ও পুস্তিকা আসতো সেসময়। যতদূর মনে পড়ে যতীনদা’র লেখা প্রথম আমি পড়ি ‘একতা’য়। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার শক্তি দেখে সেই স্কুল জীবন থেকেই আমি দাদার ভক্ত হয়ে যাই। এবং তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক হয়ে যাই মনের অজান্তেই।

তাঁর দেখার শক্তি ও বিশেষণ আজও আমাকে মুগ্ধ করে। যতীনদা’র লেখার ভিন্নতা ও বিষয় বৈচিত্র্য সম্পূর্ণ আলাদা। এ ছাড়াও তাঁর বিষয় বিশেষণের শক্তি এতোটা প্রখর এবং ভিন্ন যে তার তুলনা হয় না। সর্বোপরি জাতীয় বিষয়ের মতো লোকায়ত বিষয় সম্বন্ধে তার প্রজ্ঞা আমাদের অবাক না করে পারে না। তাঁর একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে তাঁকে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো অনেক আগে থেকেই। তারপর একবার ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলনে আসার সৌভাগ্য হলো। এ সময় শুনলাম যে, কাউন্সিল শুরু না হওয়া পর্যন্ত যে দুই ঘণ্টা সময় আছে সে সময় বক্তৃতা হবে।

বক্তা যদি বাগ্মী হন, কথায় যদি যুক্তি থাকে, নতুন ভাবনার খোরাক থাকে তাহলে বক্তৃতা শোনার মতোই বটে, কিন্তু ২ ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা- এতো রীতিমতো অত্যাচার! মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলাম। কিন্তু করার কিছু ছিল না। সুতরাং বক্তৃতাপর্ব শুরু হলো। হল সরগরম। হঠাৎ লক্ষ করলাম সাদাসিধে একটি মানুষ কাউন্সিল ভবনে ঢুকলো। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরো হল নিরব হয়ে গেল। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ধারালো মুখাবয়বের মানুষটি মঞ্চে এসে বসলেন। বক্তৃতার আগে তাঁর নাম ঘোষণা করা হলো। আমি জানলাম, তিনিই যতীনদা- মানে যতীন সরকার।

মনে পড়ে, খুব শিহরিত হয়েছিলাম তাঁকে দেখে। তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন। শুধু আমি নই, হল ভর্তি মানুষ সেই বক্তৃতা শুনল। শুনে আমি বুঝলাম একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠেন এবং পাণ্ডিত্য মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়। দুই ঘণ্টা কখন কোথা দিয়ে চলে গিয়েছিল জানি না। তবে তাঁর বক্তৃতা সেদিন আমাকে নতুন এক দিকের সন্ধান দিয়েছিলো। তারপরে ‘আজকের কাগজ’-এ চাকরি করা অবস্থায় তিনি আমাদের সাপ্তাহিকে লিখতে শুরু করলেন। ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যুর দর্শন’ ছিল শিরোনাম। আমি অপেক্ষায় থাকতাম তার পর্ব কবে আসবে। কম্পোজ হলেই পড়ে ফেলতাম। এই লেখাটিকে স্মৃতিকথা বলা যেতে পারে। স্মৃতির আধারেই বিধৃত হয়েছে ইতিহাস। এ ইতিহাস কোনো বইয়ে পাওয়া যাবে না। মানুষের মনোলোকের ইতিহাস উঠে এসেছে এখানে। এ বইয়ের ‘দর্শন’ শব্দটি ‘দেখা’ ও ‘ফিলসফি’-দুটো অর্থই ধারণ করেছে।

পাকিস্তানের জন্ম ও মৃত্যু লেখক যেভাবে দেখেছেন তার বর্ণনা যেমন আছে এ বইয়ে, তেমনই আছে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম ও মৃত্যুর পেছনে সক্রিয় ছিল যে দর্শন তারও অনুপুঙ্খ বিশেষণ। পাকিস্তানের জন্মের দর্শনটি ছিল একান্তই অপদর্শন। অপদর্শন ছিল বলেই পাকিস্তানের মৃত্যু ছিল অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্মের যে দর্শন, সেই দর্শনের মধ্যেই নিহীত ছিল পাকিস্তানের মৃত্যুর দর্শন। পাকিস্তানের এই জন্মমৃত্যুর দর্শন সম্পর্কে এ রকম মনোগ্রাহী বিশেষণ আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

ধর্মতন্ত্র এবং প্রগতিশীলতা সম্পর্কে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম একদিন। বললেন, ‘এখানে আমি বর্তমান সময়ের এ অবস্থার জন্যে, একেবারে পরিষ্কারভাবে শিক্ষিত প্রগতিশীল মুসলমানদের দোষ দেই। খ্রিস্টানরাও তো এমন ছিল, তারা তিনশ বছর ক্রুসেড করেছে। তারপর এখন খ্রিস্টানরা হইছে কি, বাইবেল যে কোনোভাবে পড়তে পারে। এখন তারা যে কোনো রকম ইন্টারপ্রেট করতে পারে। এখন আর জেলেও নেয় না, ফাঁসিও দেয় না, পুইড়াও ফালায় না। কতো রকমের ইন্টারপ্রিটিশন হইতাছে। কারণ, এই রেসপন্স থেকে আর কি। হিন্দুদের ধর্মে, মানে রিলিজিওনে অনেক সমস্যা আছে।

রিলিজিওনকে আমি ধর্ম বলি না। কারণ রিলিজিওন আর ধর্ম এক জিনিস না। রিলিজিওনের মধ্যে হিন্দুরা হচ্ছে পৃথিবীতে সবচাইতে পশ্চাৎপদ। জাতভেদ প্রথার মতো পৃথিবীর সবচাইতে ঘৃণ্য একটা প্রথা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করে রাখছে। পৃথিবীর আর কোনো রিলিজিওনে এইরকম নাই। সেইটা হইল এক দিক। কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টাদিকে আরেকটা ব্যাপার আছে, রিলিজিওন সম্বন্ধে চিন্তা করার সুযোগ, ভাষ্য তৈরি করার, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা চিন্তা করার স্বাধীনতাটা এইখানে আছে। আর আমাদের এইখানে যারা প্রগতিশীল নামে পরিচিত হয়, মানে মুক্তবুদ্ধির নামে যে কাজ করে, তাতে মুক্তবুদ্ধির চর্চার সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। এই হইল এখন মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির অবস্থা।’

একজন মার্ক্সবাদী হিসেবে সমাজে তাঁর পরিচয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ঘিরে তাঁর যেমন বক্তব্যের শেষ নেই তেমনি বর্তমানে যে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র চলছে তাতে কি জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষিত হচ্ছে? এ বিষয়েও তাঁর বক্তব্য সুস্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন ‘এ প্রশ্নটি উঠেছিল অনেক আগে। ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিক ভিত্তিটি রচনা করে দিয়েছিলেন যিনি, সেই রুশোই প্রশ্নটি উঠিয়েছিলেন। রুশো অবশ্যই আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা বিজ্ঞান ও আগামী সমাজ এবং গণতন্ত্র ও বিচ্ছিন্নতা শীর্ষক দুটি প্রবন্ধ পাঠ করে [ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যত (কলকাতা ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৬-৬৩]

গণতন্ত্রের স্ববিরোধিতা যে রুশোর চিন্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, সে বিষয়টির প্রতিই এ যুগের পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ডাক্তার গঙ্গোপাধ্যায় রুশোর লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি চয়ন করেছিলেন- `Sovereignty…cannot be represented, it lies essentially in the general will and does not admit of representation.` অর্থাৎ প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌমত্ব কোনো মতেই নিশ্চিত হতে পারে না, কারণ সর্বসাধারণের ইচ্ছার ভেতরেই তো গণতন্ত্রের অন্তঃসার নিহিত।

প্রয়াত ডাক্তার ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১১-৯৮) দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদভিত্তিক মনোবিজ্ঞানের আলোকেই সব সামাজিক প্রপঞ্চের বিচার-বিশ্লেষণ করতেন। বিশেষ করে আদিম সাম্যবাদী সমাজ ভেঙে যাওয়ার পর শ্রেণিবিভক্তির সূচনাকাল থেকেই মানবসমাজে যে বিচ্ছিন্নতার বিস্তার ঘটে চলেছে, সে বিষয়টিই

ছিল তাঁর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কার্ল মার্কসের ১৮৪৪ সালের অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পা-ুলিপি থেকেই তিনি বিচ্ছিন্নতার ধারণাটি গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই ধারণার ওপরই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদভিত্তিক মনোবিজ্ঞানের আলো ফেলে সমাজ বিশ্লেষণে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর মতে-বিচ্ছিন্নতা কথাটি বোধ হয় প্রথম ব্যবহার করেন রুশো। জনসাধারণের মনোনীত প্রতিনিধি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকেই বিচ্ছিন্নতার সূচনা। শ্রেণিবিভক্ত সমাজের সূচনায় সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয় দসামনদ বা পুরোহিত শ্রেণির হাতে। তবে সে সময়ে বিচ্ছিন্নতা খুব প্রকট হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীকালে সামন্ততন্ত্রের যুগে জনগণ-প্রতিনিধি ঈশ্বরের প্রতিনিধিতে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে শাসক শ্রেণি থেকে জনগণের বিচ্ছিন্নতা প্রকটতর রূপ ধারণ করে।

এরপর সমাজে ও রাষ্ট্র বিধানে ধনতন্ত্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত হলো যখন, তখন ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারপ্রাপ্তির কোলাহলে মুখরিত মানুষ আপনাকে আপন ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক ভেবে পরম আত্মতুষ্টিতে উল্লসিত হয়ে উঠল। প্রকৃত প্রস্তাবে এ রকম আত্মতুষ্টি ও উল্লাস নিতান্তই ভ্রান্তিবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। ধনতন্ত্রের যুগে প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে মানুষ তার অন্নবস্ত্র আলোর সংস্থান করতে শিখেছে বটে, কিন্তু ডাক্তার গঙ্গোপাধ্যায় দেখিয়েছেন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের ফলে ভোগ্যপণ্য থেকে মানুষ অধিকতর বিচ্ছিন্ন।

উৎপাদন ও বণ্টনের পণ্যভিত্তিক অবজেকটিভে আইনের নাগপাশে সে বাঁধা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যান্ত্রিক ও বিধ্বস্ত। এ হলো একদিকের বিচ্ছিন্নতা। অন্যদিকে, নির্বাচনের অধিকার পুরোপুরি নিজস্ব হওয়া সত্ত্বেও, নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে সে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের হাতে অবাধ ক্ষমতা, প্রতিনিধি ও জনগণের সংযোগ নেই, অতিঢঙ্কা-নিনাদিত ব্যক্তিস্বাধীনতাও বিপন্ন। অনেক দিন আগেই এই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন রুশো। গণতন্ত্রের স্ববিরোধিতা তাঁর চিন্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাতা খুলে এ বিষয়টিকে একটু পরখ করে নেওয়া প্রয়োজন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে, ইউরোপে ধনতন্ত্রের বিস্তৃতি লাভের যুগে, রুশোর (১৭১২-৭৮) অগ্রজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মন্টেস্কু (১৬৮৯-১৭৭৫) প্রতিনিধিশাসিত গণতন্ত্রে ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে আসেন। এই নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের ক্ষমতা তিন ভাগে বিভক্ত- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। তিনটি বিভাগ স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে স্ব স্ব কর্ম সম্পাদন করে গেলেই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হবে এবং জনগণের প্রতিনিধিরাও জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ করে নিতে পারবেন না- এ রকমই মন্টেস্কুর প্রত্যয়।

অনেক পূর্বকাল থেকেই অবশ্য রাষ্ট্রচিন্তকরা ক্ষমতার পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভেবে এসেছেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল, রোমান আইনপ্রণেতা সিসেরো ও পলিবিয়াস এবং মধ্যযুগের মার্শিলিও পদুয়ার কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা হয়ে থাকে। তবে সপ্তদশ শতকে ধনতন্ত্রের ঊষালগ্নেই জন লক প্রমুখ কয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটান এবং অষ্টাদশ শতকে মন্টেস্কুর লেখাতেই এটি পূর্ণাবয়ব ধারণ করে। রোমের মহিমা ও পতনের কারণ বিষয়ে ভাবনা এবং তাঁর প্রধান গ্রন্থ আইনের মর্মার্থতেই মন্টেস্কুর মতের স্পষ্ট অভিব্যক্তি ঘটেছে।

প্রজাতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী- এই তিন ধরনের শাসনব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রজাতান্ত্রিক শাসন, যাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে সমগ্র জনগণ কিংবা তার অংশের হাতে; রাজতান্ত্রিক শাসন, যাতে শাসন করে একজন লোক, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত অপরিবর্তনীয় আইনের মাধ্যমে; স্বৈরাচারী শাসনে সব কিছু চলে আইন ও নিয়মের বাইরে, একজন ব্যক্তির মর্জি ও স্বেচ্ছাচার অনুসারে। এরপরই তাঁর বক্তব্য- সর্বোচ্চ ক্ষমতা যদি থাকে সমগ্র জনগণের অধিকারে, তাহলে এটা হলো গণতন্ত্র। যদি তা থাকে জনগণের একাংশের হাতে, তাহলে এরূপ শাসন ব্যবস্থাকে বলা হয় অভিজাততন্ত্র।

পাঠক ভেবে দেখুন, কত গতিশীল লেখা যতীনদা’র। এ ছাড়াও তরুণদের তিনি যেভাবে গ্রহণ করেন তাতে এক ধরনের বন্ধু বাৎসল্য গড়ে ওঠে যার কোনো তুলনা নেই। হলরুম ভরা সহস্র মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা কতটা অসম্ভব তা সবাই জানেন। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন যতীন সরকার। আমাদের যতীনদা। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যিনি সারা দেশে অগ্রগণ্য। দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী যে যার মতো সুবিধা নিচ্ছেন বা নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যে কয়জন আছেন, তাঁদের মধ্যে যতীনদা অগ্রগণ্য। সামান্য ভণ্ডামি বা সুবিধাবাদী প্রবণতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দেখতে দেখতে তাঁর বয়স বাড়লেও তারুণ্যে ঘুণ ধরেনি। যতীনদা আমাদের গর্ব-অহংকার।

যতীন সরকার ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয় রামপুর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৫৪ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্র পড়িয়ে টাকা জমিয়ে ১৯৫৫ সালে আইএ-তে ভর্তি হন নেত্রকোনা কলেজে। এ সময় নেত্রকোনা কলেজের ছাত্রসংসদে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে বিএ পরীক্ষা দিয়েই জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতা শুরু করেন নেত্রকোনার আশুজিয়া হাইস্কুলে। ১৯৬১ সালে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে এমএ পাস করেন ১৯৬৩ সালে। এ বছরই তিনি যোগ দেন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর হাইস্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে।

১৯৬০-এর দশক থেকে যতীন সরকার ময়মনসিংহ শহরের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য তিনি দ্রুত সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্ট পার্টি এবং শ্রেণি সংগ্রামের প্রতি আজীবন উৎসর্গিত এই প্রবীণ কমরেড মফস্বলে থেকেও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১০ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্যের অধিকারী আমাদের শ্রদ্ধার বাতিঘর যতীন সরকারের শতায়ু কামনা করি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট