টেকসই উন্নয়নের কথা শতবর্ষ আগেই রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন – ড. আতিউর রহমান

বিশেষ প্রতিবেদন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি, ঔপন্যাসিক বা শিল্পীই ছিলেন এমন নয়, এসবের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান আর্থসামাজিক উন্নয়ন চিন্তক। আর তাই আজ থেকে একশো বছর আগেই তিনি টেকসই উন্নয়নের কথা ভেবেছিলেন এবং সেজন্য কাজ করে গেছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই তার লেখাতে ‘কাউকে পেছনে ফেলে না এগুনো’র কথা উঠে এসেছে। আর এটিই আমাদের আজকের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজির মূল দর্শন। আজ (১৮ আগস্ট ২০১৭) বিশ্বভারতীর লিপিকা মিলনায়তনে ‘ভিশন অফ ট্যাগোর অন কো-অপারেটিভ সোসাইটি এন্ড কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধনী অধিবেশেনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বভারতীর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক স্বপন কুমার দত্ত। উদ্বোধনের পরপরই কৃষি ও কৃষক বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও কর্ম নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন ড. আতিউর রহমান।

মহাকবির জীবন ও কর্মের অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত দিকগুলো নিয়ে বক্তৃতা কালে ড. আতিউর বলেন রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের নিজ যোগ্যতায় অর্জিত স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি নিজে জমিদারি থেকে অর্থ উপার্জনের কারণে লজ্জিত ছিলেন। উন্নয়নকে রবিঠাকুর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতেন যেখানে মানুষ দু:স্থ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয় এবং বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবসর যাপন বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা উপভোগ করে। কৃষকদের নিজ যোগ্যতায় স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়ায় তিনি নিজেকে তাদের অভিভাবক হিসেবে দেখেছেন, প্রভু হিসেবে নয়। যেসব জমিদাররা প্রজাদের ভালো-মন্দের চেয়ে নিজস্ব ভোগ-বিলাসকে অগ্রাধিকার দিতেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাদের প্রবল সমালোচক।

জমিদারি থেকে রবীন্দ্রনাথ যা আয় করতেন তার একটা বড় অংশই তিনি ব্যয় করতেন প্রজাদের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি সামাজিক সেবা নিশ্চিত করার কাজে। এজন্য তিনি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গড়ে তুলেছিলেন। এমন কি কৃষির সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার জন্য পতিসরে তাঁর উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার প্রসারের লক্ষ্যে কৃষকদের মধ্যে সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে উৎসাহিত করে গেছেন। তিনি চাইতেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদরা যেন গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের সহায়তা করেন। এমন কি তাঁর নিজের ছেলে ও মেয়ে-জামাইকে সে আমলের প্রচলিত ধারা অনুসরণ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে কৃষি বিষয়ে পড়ালেখা করতে পাঠিয়েছিলেন।

মহাজনী সুদের জালে আটকা পড়া কৃষক পরিবারগুলোর দূরবস্থাও তাঁকে ভাবিত করতো, তাই তিনি দরিদ্র কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। শিলাইদহ ও পতিসরে এজন্য সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে আরও পরে শ্রীনিকেতনেও একই রকম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের ‘আত্ম শক্তি’র ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাই বারবার তাদের নিজস্ব পল্লী সাহিত্য ও আচার-অনুষ্ঠান থেকে প্রেরণা নিতে বলে গেছেন। নারীর ক্ষমতায়নকে রবি ঠাকুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তাই তাঁর জমিদারিতে বেশ কয়েকটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কেবল নগরকেন্দ্রিক উন্নয়নকে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট মনে করেননি, তাঁর মতে গ্রামের মানুষের জন্য মৌলিক মানবাধিকার ও সার্বিক উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত না করা গেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষির পাশাপাশি অকৃষি খাতের যে ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের কথা রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন আজকের অর্থনীতিবিদরা সেই চিন্তাকে তাঁর দূরদৃষ্টির পরিচায়ক হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম বিষয়ে ড. আতিউরের বক্তব্য ও নিবন্ধ এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নেয়া দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।