বড় ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো

নিউজ ডেস্ক:  ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহক নয়, বড় গ্রাহকদের কাছেই যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা বলছে, ২০১৬ সাল শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৪৮ শতাংশই দেয়া হয়েছে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণধারী গ্রাহককে। কিন্তু সময়মতো টাকা ফেরত না আসায় বড় এসব ঋণ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় ব্যাংকগুলো। বড় গ্রাহকদের নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুশ্চিন্তার কথা স্বীকার করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরাও।

গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, বড় ঋণ যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তা আর ফেরত আসছে না। ফলে এসব ঋণ আদায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর দুশ্চিন্তাও বাড়ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও সোনালী ব্যাংক আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এবং সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান আশরাফুল মকবুলও এতে উপস্থিত ছিলেন।

বিআইবিএমের ‘ক্রেডিট অপারেশনস অব ব্যাংকস-২০১৬’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করেছেন, এমন গ্রাহকের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মাত্র ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ ঋণ দিয়েছে। ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন, এমন গ্রাহকদের কাছে ১৭ শতাংশ এবং ১ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন, এমন গ্রাহকদের কাছে ২১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। অথচ ব্যাংকগুলোর ৪৭ দশমিক ৯২ শতাংশ ঋণ রয়েছে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণকারী গ্রাহকদের কাছে। যদিও ২০১৫ সাল শেষে এ শ্রেণীর গ্রাহকদের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ ছিল ৪৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী। ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৭০ শতাংশই রয়েছে মাত্র ১২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ২০১৬ সাল শেষে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। যদিও এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির শীর্ষ ১২ গ্রাহকের মধ্যে আটটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণগ্রহীতা বেসরকারি খাতের চার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে— বেক্সিমকো, হল-মার্ক, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স ও থার্মেক্স গ্রুপ।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। এর বাইরে স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য হয়ে যাওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ। ফলে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বা অর্ধেকই খেলাপির খাতায় চলে গেছে।

বড় গ্রাহকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকও। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে শীর্ষ ১২ গ্রাহকের কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। যদিও একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৩৬ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। জুন শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ১৩ গ্রাহকের কাছে ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১১২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বড় গ্রাহকদের কাছে বন্দি রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকও। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ১৭ জন শীর্ষ গ্রাহকের কাছে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে মোট ১৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকটি। জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বড় গ্রাহকদের কাছে বেশি ঋণ দিয়ে বিপাকে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক, বিডিবিএল ও কৃষি ব্যাংক। গুটিকয়েক গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সবক’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহকদের প্রায় সবাই একাধিক ব্যাংকের বড় গ্রাহক।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় গ্রাহকের কাছে বড় অংকের ঋণ যেমন যাচ্ছে, তেমনি তা খেলাপিও হচ্ছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে ৭০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। শুধু ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকিং খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণের মধ্যে ৫১ শতাংশই করেছে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো। বাকি ৪৮ শতাংশ করেছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আটটি ব্যাংক।

জানা গেছে, কয়েক দফা পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়েও আদায় না হওয়ায় ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়। ২০১৫ সালে অবলোপন করা হয় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বড় ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ দেখিয়ে ২০১৫ সালে বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ শোধে বিশেষ নীতিমালা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় ১১ শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ঋণ ব্যাংক খাতে প্রকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ছোট ঋণের তুলনায় বড় ঋণের টাকা আদায় কম হচ্ছে। এছাড়া নির্দিষ্ট খাত ও গ্রুপের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। ঋণ বিতরণে এখনই বৈচিত্র্য আনার কোনো বিকল্প নেই।  ঋণ আদায়ে ব্যাংক সফল হলেও বড় অংকের ঋণগ্রহীতাদের কাছে ব্যাংক অসহায়। এজন্য স্বতন্ত্র আদালত গঠন করা দরকার।