বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য কুশীলবরা এখনো সক্রিয়

আবদুল মান্নান:  কোনো একটি দেশের রাজনীতিবিদ, সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের আততায়ীর হাতে নিহত হওয়া নতুন কিছু নয়। ইসলামের প্রথম যুগে চার খলিফার মধ্যে তিন খলিফাকে ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। তারও আগে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে তাঁর অতি আপনজনরা প্রকাশ্যে হত্যা করেছে। সেটি খ্রিস্টপূর্ব চল্লিশ শতকের ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ডে ৬০ জন রোমান সিনেটর (সংসদ সদস্য) অংশগ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে সিজারের একান্ত আপনজন বলে পরিচিত মার্কাস ব্রুটাসও ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনসহ চারজন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। ভারতের মহাত্মা গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, সেনাশাসক জিয়াউল হক, প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো, চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে, বার্মার (মিয়ানমার) প্রধানমন্ত্রী অং সান (সু চির পিতা), মিসরের আনোয়ার সাদাতসহ আরো অনেকেই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ঘাতকের বুলেট বা বোমার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে দীর্ঘদিনের সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি থাকে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সীমিতসংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততা থাকলেও অন্যদের বেলায় এই সম্পৃক্ততার পরিধি অনেক বিস্তৃত ছিল, যেমনটি দেখা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ করে দিতে প্রস্তুতিটা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং তাতে সম্পৃক্ত ছিলেন খোদ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা কিছু দলীয় নেতা আর প্রবাসী সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা।

তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। এ কাজে তিনি সঙ্গে পেয়েছিলেন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য জহিরুল কাইউম, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, সরকারের আমলা কর্মকর্তা মাহবুব উল আলম চাষী প্রমুখকে। তাঁদের একদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন নিয়ে ছিল সন্দেহ আর অন্যদিকে ছিল দলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আর একদল সামরিক কর্মকর্তা চাইতেন এই যুদ্ধটা একটি সামরিক কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হোক। তাঁদের একটি বড় অংশ চাইত না তাদের ওপর কোনো বেসামরিক সরকার খবরদারি করুক।

এই মুক্তিযুদ্ধ যে একটি জনযুদ্ধ ছিল, তা তাঁরা মানতে নারাজ ছিলেন। মোশতাক মনে করতেন, তাঁকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেও তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছেন না। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মোশতাককে তেমন একটা বিশ্বাস করতেন না, যার কারণে যখন বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে লবি করতে যায় সেই দলে মোশতাককে রাখা হয়নি। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোশতাক জহুরুল কাইউমের মাধ্যমে কলকাতায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের কাছে খবর পাঠান যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে সহায়তা করলে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেবেন। এটি ছিল মোশতাকের একক সিদ্ধান্ত। মার্কিন কনসাল জেনারেল মোশতাকের প্রস্তাবে সায় দেননি, কারণ তিনি জানতেন প্রবাসী সরকারকে ডিঙিয়ে কিছু করার ক্ষমতা মোশতাকের নেই।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মুক্তিযুদ্ধরত সেনাবাহিনীর ভেতরে তাদের নিজস্ব এজেন্ট অনুপ্রবেশ ঘটানোর তত্পরতা শুরু করে, যাতে তারা পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কাজে যেসব সামরিক কর্মকর্তা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তান থেকে এসে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে তাঁরা কেউ যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেননি।

হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশ থেকে কলকাতা আসেন এবং যশোর মুক্ত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। পাকিস্তানফেরত এসব ষড়যন্ত্রকারী ও ঘাতকের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে ফারুক রহমান জিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

জিয়া ফারুককে বলেন, একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরাসরি জড়িত হতে পারবেন না, তবে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারে। জিয়া তখন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এই পদটি জিয়ার জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন। প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে জিয়ার উচিত ছিল ফারুক গংয়ের এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো। আর বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির বাড়িতে জিয়ার অবারিত যাতায়াত ছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১২ তারিখ নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। নতুন মন্ত্রিসভা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করাতে এতই ব্যস্ত ছিল যে দেশে অভ্যুত্থানের যে একটি নীলনকশা প্রস্তুত হচ্ছে সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি। তবে এ বিষয়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ঠিকই খবর রেখেছিল, যা তারা বঙ্গবন্ধুকে একাধিকবার অবহিত করেছিল; তবে তিনি তাতে তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। একই সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ নাজুক হচ্ছিল।

মওলানা ভাসানীর ন্যাপের ছাতার নিচে অতি বাম আর অতি ডানপন্থীরা একত্র হয়েছে। ছাত্রলীগ থেকে বের হয়ে একদল মেধাবী তরুণ ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে’ দীক্ষিত হয়ে গঠন করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। তাদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছেন যুদ্ধদিনের ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল। সঙ্গে আছেন ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, আ ফ ম মাহবুবুল হক প্রমুখ। বঙ্গবন্ধু সরকার যখন দেশ গড়তে ব্যস্ত তখন এসব দল ও গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানা কর্মসূচি পালন করতে শুরু করে।

১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান (তখনো নাম পরিবর্তন হয়নি) কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ‘স্বৈরাচার’ মুজিব সরকারকে উত্খাত করার জন্য অর্থ, অস্ত্র আর বেতারযন্ত্র চেয়ে বার্তা পাঠায়। ভুট্টো তাঁর আস্থাভাজন এক কর্মকর্তাকে আবদুল হককে সহায়তা করার নির্দেশ দেন। এই সময় ইরফানুল বারী সম্পাদিত মওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘হক কথা’, জাসদের মুখপত্র দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ ও কট্টর চীনপন্থীদের সাপ্তাহিক এনায়েতুল্লাহ খানের ‘হলিডে’ পত্রিকা নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কয়েক জায়গায় ১৯৭৩ সালের দুর্গাপূজার সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোরও চেষ্টা করা হয়।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে ছিলেন চরম উদাসীন। মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান ১৯৭১ সালে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি পার্বত্য অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী উবানকে ঢাকা প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল তিনি বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনে সহায়তা করবেন। উবান তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘ফ্যান্টামস অব চিটাগং’-এ লিখেছেন, ‘তিনি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখেন বাড়িটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত এবং সবার জন্য বাড়ির দরজা অবারিত। এ বিষয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, জনগণ আমাকে জাতির পিতা বলে ডাকে। তাদের জন্য তো আমার দরজা খোলা রাখারই কথা। ’

‘র’-এর এককালের শীর্ষ কর্মকর্তা আর কে যাদব তাঁর গ্রন্থ ‘মিশন র’তে লিখেছেন, বাংলাদেশে যে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হচ্ছে তা তাঁরা তাঁদের সোর্স থেকে জানতে পেরেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতি নিয়ে ‘র’-এর অন্যতম নীতিনির্ধারক আর এন কাউ ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বঙ্গভবনে দেখা করে তাঁকে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করলে বঙ্গবন্ধু তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ওরা সবাই আমার সন্তান। ওরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। ’ কাউ হতাশ হয়ে দিল্লি ফিরে যান। ‘র’ ১৯৭৫ সালে সর্বশেষ আরেকজন কর্মকর্তাকে দিল্লি থেকে ঢাকা পাঠায়।

তিনি বঙ্গবন্ধুকে এই সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের ব্যাপারে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রই দেননি, এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা জড়িত তাদের নামও তাঁর কাছে প্রকাশ করেন। কিন্তু ফলাফল একই। তবে বঙ্গবন্ধু জিয়াকে মার্চ মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করেন এবং এটি নির্ধারিত হয় যে জিয়া কোনো একটি দেশে রাষ্ট্রদূত হয়ে চলে যাবেন। জিয়া অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার মাধ্যমে তাঁর বদলির আদেশটি বাতিল করাতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সালে মাহবুব তালুকদার (বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার) বঙ্গবন্ধুর স্পেশাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৫ আগস্টের কয়েক দিন আগে তিনি গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত তাঁর পরিচিত এক কর্মকর্তার কাছ থেকে জানতে পারেন যে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এক গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মাহবুব তালুকদার বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শেখ ফজলুল হক মনিকে অবহিত করেন। মনিও তাঁর মামা বঙ্গবন্ধুর মতো এসব সংবাদ আজগুবি বলে উড়িয়ে দেন।

ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের সব কাজ অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে করে। মার্চ মাস নাগাদ বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁদের পদায়ন করা হয় তাঁরা সবাই পাকিস্তানি ভাবধারার কর্মকর্তা ছিলেন। ১৫ আগস্ট যেসব সেনা অফিসার ৩২ নম্বর বাড়িতে পাহারারত ছিলেন সবাই একসময় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘাতক মেজর হুদা আর মেজর ডালিমের ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সময় তাঁরা তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি ।

ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করলে তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকে টেলিফোন করেছিলেন। জেনারেল সফিউল্লাহ ঘাতকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন। তিনি পরদিন রেডিওতে গিয়ে খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে জাতীয় চার নেতা তা করতে অস্বীকার করলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৩ নভেম্বর কারা অন্তরালে হত্যা করা হয়। এই জাতীয় চার নেতার ইমানের জোর ছিল, যা অন্যদের ছিল না। জেনারেল সফিউল্লাহ সেনানিবাসের বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও তাঁর অধীন সেনা অফিসাররা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ভয়াবহ ঘটনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর তা তিনি জানতে পারেননি এটি রহস্যজনক।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করলেও আসল ক্ষমতা রয়ে যায় জেনারেল জিয়ার হাতে। ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর খন্দকার মোশতাককে জিয়া ক্ষমতাচ্যুত করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে সাক্ষীগোপাল রাষ্ট্রপতি বানিয়ে তিনি নিজে ক্ষমতা দখল করেন। একইভাবে যখন এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তখন তিনিও বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যতবার সেনাবাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে তাকে বৈধতা দিয়েছেন দেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতিরা।

জেল হত্যাকাণ্ডের পর জিয়া ঘাতকদের নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করে দেন। তারা বিশেষ বিমানে ব্যাংকক পাড়ি দেয়। পরে জিয়ার আস্থাভাজন শমসের মোবিন চৌধুরী (বেগম জিয়ার আমলে পরারাষ্ট্রসচিব) তাদের পাসপোর্ট ও অর্থ দিয়ে আসেন। জিয়া ক্ষমতা দখল করে এই ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর পেছনের তারিখ দিয়ে জিয়া নিজেকে লে. জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন।

ঘাতকরা বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তানে রূপান্তর করতে চেয়েছিল। এ জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়া। তা তারা করেছিল এবং তাদের সহায়তা করেছিল আওয়ামী লীগের ভেতরের কিছু মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করেন জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন। তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হয় কালো টাকার মালিক, পেশিশক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা। এক কথায় রাজনীতি চলে যায় দুর্বৃত্তদের হাতে।

১৯৮১ সালে দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় প্রবাসে কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরে রাজনীতিকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন এবং এখনো করছেন। তবে তিনি যে পুরোপুরি সফল হতে পেরেছেন তা কিন্তু নয়। এর অন্যতম কারণ তাঁর চারপাশে কিছু মানুষ একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। এই দেয়াল ভাঙা সহজ নয়। তবে মানুষের বিশ্বাস বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বানানো কারো পক্ষে সম্ভব হলে সেই ব্যক্তিটি হবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দেশের মানুষ তাঁর ওপর যে পরিমাণ আস্থা রাখে তা অন্য কারো ওপর রাখে না। তাঁর ওপর মানুষের এই আস্থা কাজে লাগাতে হলে নিজ দলের ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে। এই ছিদ্র দিয়ে লাগামহীনভাবে অনেক জীবাণু দলে ঢুকে গেছে। সেগুলোর বিনাশ করতে না পারলে ঘটে যেতে পারে অন্য কোনো বিপর্যয়। ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক