আকাশের মতো বড় হও

আলী যাকের:  তখন আমার বয়স ছয় কিংবা সাত বছর। কুষ্টিয়ায় বসবাস। ক্লাস ওয়ানে পড়ি। সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত স্কুল। সূর্য যত মাথার ওপর চড়ত স্কুল ছুটির সুমধুর ঘণ্টার জন্য তত উন্মুখ হয়ে উঠতাম। ঘণ্টা পড়ার শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে না করতেই আমরা সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়তাম। বেরিয়ে তো পড়তাম, তবে সবার গন্তব্য একই দিকে থাকত না। বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে হয় বাবার হাত ধরে কিংবা একা ফিরে যেত যার যার ঘরে। আমি এক দৌড়ে চলে যেতাম গড়াই নদীর পাড়ে। গড়াই নদী যেন আমাকে টানত। এ এক এমন আকর্ষণ যাকে অবজ্ঞা করা যায় না। আমি এখনো ওই আকর্ষণের কারণ বুঝতে অক্ষম।

প্রকৃতি নিয়ে একটা গল্প শুনেছিলাম আমার যৌবনে এক বন্ধুর কাছে। গল্পটা এমনই যে, শুনেই আমার পাঠকরা ভাববেন এ কেমন গল্পরে বাবা? তার চেয়েও বড় কথা, আমার বন্ধুর উদ্দেশে বলবেন এ কেমন মানুষরে বাবা? তবুও বলছি। কেননা আমার পাঠকদের সঙ্গে একটা যোগসূত্র স্থাপন তো আমাকে করতেই হবে। তাই নিজেকে তাদের কাছে মেলে ধরা আমার কর্তব্য। আমার বন্ধুটি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার এক অতিসুন্দরী বান্ধবী ছিল। একই ক্লাসে পড়ত। একবার ওরা দুজন পতেঙ্গায় সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেছে। সাগরের ধারে বসে ওরা। সন্ধ্যার সমুদ্রে সূর্য ডুবছে। হাওয়া বইছে। উন্মাতাল সাগর। বন্ধুটি আমার লাল টকটকে ডুবন্ত সূর্যের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

তার প্রেমিকা বলল, ‘কী দেখছ?’ আমার বন্ধু বলল, ‘ডুবন্ত সূর্য। ভারি সুন্দর দেখতে। তাই না?’ ‘আমি সুন্দর না? আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে না?’ বান্ধবীর প্রশ্ন। বন্ধু বলল, ‘ইচ্ছে করে। তবে উন্মাতাল সাগরে ডুবন্ত সূর্য আরও সুন্দর।’ তার বান্ধবীটি সেই মুহূর্তে ওই নয়নাভিরাম দৃশ্য ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিল। কিছু কিছু সৌন্দর্যে আপস করা যায় হয়তো। কিছু, যা এই আছে, এই নেই, সে ব্যাপারে আপস করা বড় দুষ্কর। হয়তো ওই ডুবন্ত সূর্য, ওই সন্ধ্যাটি, ওই উন্মাতাল সাগর একই সঙ্গে কখনই আর আমার বন্ধুটি দেখতে পাবে না বলেই ওই রকম একটি অবস্থা হয়েছিল তার।

যাকগে। ধান ভানতে শিবের গীত শুরু করে দিয়েছিলাম। মূল কথায় ফিরে আসি। আকাশ, বাতাস, সাগর এবং ডুবন্ত সূর্যের কথায়। কুষ্টিয়ায় গড়াই নদী এক বড় বিষণœ নদী। বিশেষ করে শীতকাল থেকে শুরু করে একেবারে বর্ষার আগমন পর্যন্ত। প্রায় সবটাই বালুর চর। সোনালি বালু। হয়তো মাঝখান দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে স্রোতধারা। একেবারে নর্দমার মতোই তার ব্যাপ্তি। আর বাকি নদীজুড়ে এখানে সেখানে বড় বড় গর্ত। জলা বলা যেতে পারে। এই গর্তগুলোয় গভীর জল। সেই জলে আকাশ প্রতিবিম্বিত হয়ে নীল রঙে বর্ণময় হয়ে ওঠে।

মানুষের সহজাত আকর্ষণ বোধহয় অতলের প্রতি সবচেয়ে বেশি। সীমাবদ্ধতা কোনো মানুষই পছন্দ করে না। বিশেষ করে যে মানুষ কল্পনার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই বাল্যকাল থেকেই গড়াই নদী, সে নদীর জলাগুলো এবং ওপরের সুবিশাল আকাশ আমার অন্তরকে একেবারে সম্মোহিত করে রাখত। আমি বারবার ঘুরে ঘুরে গড়াইয়ের ধারে চলে যেতাম স্কুল শেষে। এ রকম আকাশ দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। এ রকম আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত, জঙ্গল, বনবনানী, কাশবন এসবই আমার বাল্যকাল এবং কৈশোরকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি ওইসব সীমাহীন অতলান্তের মাঝে।

সেসব ছেড়ে যখন নগর ঢাকায় বাবা থিতু হলেন, আমরা এখানে বাস করতে এলাম, তখন নাগরিক সীমাবদ্ধতায় একটু বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলাম। স্পষ্ট মনে আছে, বাঁধাধরা রাস্তা দিয়ে গতায়ত, নম্বর দেওয়া বাড়িতে আশ্রয়, তার পর একটি সুরম্য ভবনে স্কুল, এসব কিছুই ছিল আমার কাছে যেন বেঁধে দেওয়া গ-ির ভেতরে বিচরণ। যার বাল্যকাল ওইরকম বিস্তীর্ণ আকাশের নিচে, ওইরকম খোলামেলা জায়গায় কেটেছে তার পক্ষে সংজ্ঞায়িত কোনো এলাকার মাঝে কিংবা ভুবনে আবদ্ধ থাকা একটু কষ্টসাধ্যই বটে।

আমি মনে করি গ্রামবাংলায় বেড়ে ওঠা সব বালক-বালিকার জন্য প্রাথমিক নাগরিক যে উপলব্ধি সেটি খুব চিত্তসুখকর হয় না। অবশ্যই পরে নানারকম শহুরে আকর্ষণ তাকে জয় করে ফেলে। রাতে আলোর ঝলকানি, রঙিন পৃথিবী চারধারে, গাড়ি, ঘোড়া এসব কিছুই তার অন্তরে বাসা বাঁধে। সে আস্তে আস্তে ভুলে যায় সেই জায়গা, যেখানে তার বিচরণ ছিল বাল্যকালে। আমারও তাই হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু আমি কখনই গ্রামবাংলাকে ভুলতে পারিনি। এই যে ভুলতে না পারা সেটি বোধহয় একটি বিমূর্ততার দ্বারা আমার অন্তর আক্রান্ত হওয়ার কারণেই হয়েছে। এই বিমূর্ত বিষয়টি কী? এই বিমূর্ত হচ্ছে একটি শব্দ ’বিশাল’। বিশালের তো কোনো আকৃতি-প্রকৃতি নেই। বিশাল একটি উপলব্ধি। বিশাল একটি অনুভূতি।

এই বিশালত্বের বোধ থেকেই মনে হয় আমাদের গুরুজনরা আমাদের আশীর্বাদ করতেন এই বলে যে, ‘আকাশের মতো বড় হও।’ অর্থাৎ আকাশের মতো বিশাল হও! আমরাও ওই আশীর্বাদ গ্রহণ করতাম সহৃদয় চিত্তে বিশেষ কোনো কিছু না ভেবেই। ক্রমে আমরা যখন বড় হই, আমাদের সন্তান-সন্ততি হয় তখন আমরা বুঝতে পারি এই আকাশের মতো বড় হওয়ার অর্থ কী?

আকাশের মতো বড় হওয়ার অর্থ নিশ্চয়ই বিশাল বপুর অধিকারী হওয়া নয়? এমনকি বাহ্যত আকাশে মাথা ঠেকে যাওয়াও নয়। এর অর্থ, এই আকাশের মতো বড় হওয়া, আবারও বিমূর্ত একটি অভিব্যক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত আছে উদার হওয়ার বিষয়টি অতি ঘনিষ্ঠভাবে। মানুষ ক্ষুদ্রমনা থেকে অনেক চিন্তাভাবনা করে যখন বৃহৎ মনের দিকে এগোয়, তখন মানুষের মন ধীরে ধীরে পাহাড়ের মতো, সাগরের মতো, আকাশের মতো বিশালত্বের দিকে ধাবিত হয়।

তখন মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বারা আকর্ষিত হয় না আর। সেই কোন বাল্যকালে, মায়ের যে অমোঘ কথাগুলো এখনো কানে বাজে, ‘আকাশের মতো বড় হও’, তা কিছু মানুষের এখনো বোধ করি ভাবায়। এই ভাবনা অনেককেই অনুপ্রাণিত করে বৃহৎ মনের মানুষ হওয়ায়। আমার ধারণা যে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সবাই অল্পবিস্তর গুরুজনদের এই আশীর্বাদে সিক্ত হয়েছেন। তা হলে কি এমন অপশক্তির প্রভাব এক সর্বগ্রাসী ঝরনার মতো ধেয়ে এলো যে, আমরা সবাই শম্বুকের মতো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার খোলের মধ্যে অবলীলায় নিজেদের গুটিয়ে নিলাম?

আজ যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই ক্ষুদ্র স্বার্থবোধেরই সর্বব্যাপী অগ্রাভিজান। সেই নির্মল সুনীল আকাশ থেকে কতদূরে সরে এসেছি আমরা যে, অহর্নিশ আমাদের দৃষ্টি নিজেদের নাভিমূলের ওপরই নিবদ্ধ। আমরা ভুলে গেছি উদার আকাশের দিকে তাকাতে। মন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এ রকম চলতে চলতে আমরা হয়তো মাটির সঙ্গে মিশে যাব। তখন আমাদের দ্বারা কোনো বড় কাজ করা আর সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সময় এসেছে। আমাদের ভবিষ্যতের বংশধরদের অনুপ্রাণিত করতে হবে আকাশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে।

উন্মুক্ত, উদার আকাশ ছাড়া আমাদের গতি নেই এবং এটাও জরুরি যে, মনটাকেও সেই সঙ্গে উদার এবং উন্মুক্ত করতে হবে। আমি শঙ্কিত হই, যখন দেখি যে, আমাদের মন ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। আজকে আমাদের তরুণ সম্প্রদায়ের বড় অংশই উদারতা হারিয়ে অনুদারতার অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করছে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে আমাদের ওই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, এখনই।

আলী যাকের : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব