অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বিআরটিসি পরিবহন সংস্থা

তাইজুল ইসলাম সবুজঃ  সমগ্র বাংলাদেশে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় যাত্রী পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। বাস মেরামত, চলাচল ও লিজ প্রদানে দুর্নীত, বাস সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের দখলে থাকা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কয়েকশ বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে শত শত বাস কেনা হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এসব বাস পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে একটু আরামে দ্রুত গন্তব্যে পৌছার পরিবর্তে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে যাত্রীর এর প্রতিবাদ করলে অপমানিত হতে হচ্ছে তাদের। অভিযোগ রয়েছে, যাত্রীদে কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা উপরওয়ালা কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের পকেট চলে যাচ্ছে। তাদের আসকারায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বাসগুলো পরিচালনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখানেই শেষ নয়। বিদেশী ঋণের আওতায় প্রতি বছর শত শত বাস কেনা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ কেনা ২৪৫টি চীনা বাসের ১৩৬টিই অকেজো হয়ে বসে আছে। সময়মতো মেরামত হচ্ছে না। সরকারের কাছ থেকে কোনো ভর্তুকিও পায় না বিআরটিসি।

নিজস্ব আয় থেকেই ব্যয় করতে হয়। শুধু যানবাহন কেনার জন্য সরকারের কাছ থেকে ঋণ পায়। এসব যানবাহন থেকে প্রাপ্ত টাকাই বিআরটিসির আয়ের একমাত্র উৎস। আয়ের একমাত্র পথ হলেও বাস পরিচালনায় আগ্রহ কম সংস্থার কর্মীদের। কারিগরি শাখার হিসাবে, সচল বাসের সংখ্যা এক হাজার ৪৯টি। দৈনিক গড়ে এর অর্ধেক বাস রাস্তায় নামছে। গত দুই বছরে একদিন সর্বোচ্চ ৮২১টি বাস রাস্তায় নেমেছিল। কখনও ৪০৬টি বাস চলার নজির আ ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার ডিপো পরিদর্শন করে বাস বসিয়ে রাখার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেও কোনো ফল হয়নি।

ট্রিপ চুরি, অর্থ আত্মসাৎ, দরপত্র ছাড়াই বহিরাগতদের বাস ইজারা দেওয়াসহ নানা দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে সংস্থাটি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, দেশের একমাত্র ইে সরকারি পরিবহন সংস্থাটির বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বহিরাগত ও অবৈধভাবে নিযুক্ত কন্ডাক্টরদের দিয়ে। সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হাতে রেখে বহিরাগতরাই বাস পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রনক বনে গেছে। ভাড়া বাবদ আদায় করা অর্থের বেশির ভাগই সরকারি কোষাগারে জমা না রেখে তা পকেটে পুরে নেওয়া হচ্ছে। ডিপোর রেজিস্টারে আয়ের পৃকৃত হিসাব রাখা হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে ডিপো ব্যবস্থাপক, বহিরাগত সন্ত্রাসী, ইজারাদার ও চালকদের বড় সিন্ডিকেট গিলে খাচ্ছে অর্ধশতাব্দীর অধিক বয়সী সংস্থাটিকে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন দুর্নীতির জন্য অপরাধী শনাক্ত হলেও কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। উল্টো দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুললেই বদলিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে কর্মচারীদের। এ অবস্থায় দুই দফায় সংস্থার ২১টি ডিপোর সব ব্যবস্থাপককে বদলি করা হয়েছে। দুর্নীত রোধের জন্য তাঁদের বদলি করা হলেও এরই মধ্যে তাঁরা আগের ডিপোতে ফেরার জন্য তদবির শুরু করেছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এ দুর্নীতির মূলে আছেন ২১ ডিপোর ব্যবস্থাপকরা।

দুর্নীতির জন্য মূল দায়ী ডিপো ব্যবস্থাপকদের তাই বদলি করা হয়েছে। বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুন পর্যণÍ আগের পাঁচ বছরে সংস্থায় লোকসান ছিল ৩৪০ কোটি টাকা। গত বছরের ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হওয়ায় সংস্থার তিন হাজার ৪১৫ জন কর্মচারীর বেতন প্রায় দ্বিগুন হয়ে গেছে। এমনিতেই কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সংষ্থান করতে পারছে না সংস্থাটি। এর ওপর আদায় করা রাজস্বের চেয়ে কম রাজস্ব জমা হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি।

সংষ্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে, চারদলীয় জোট সরকারের সময় ইজারা প্রথায় বাস পরিচালনা করে ‘লাল বাতি জ্বলে’ সংস্থাটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংস্থার প্রাণ সঞ্চারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগী হন। ২০১০ সালে থেকে ধাপে ধাপে নতুন ৯৫৮টি বাস যোগ হয় বিআরটিসির বহরে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে সংস্থায় বাস ছিল ৩১৮টি। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি।

বিশেস করে সংস্থার আয়ে এবং প্রভাব পড়েনি। সাম্প্রতিক সময়ে করা এক হিসাবে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের কমপক্ষে ২৪ কোটি টাকা জমা হয়নি বিভিন্ন ডিপোতে। ডিপো ব্যবস্থাপক, চালক ও ইজারাদারদের কাছে এ অর্থ রয়ে গেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৮টি ডিপোতে জমা হয়নি ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার ১২৪ টাকা। ভাড়া আদায় করা হলেও ১২ ডিপো ব্যবস্থাপক আট কোটি ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩ টাকা ব্যাংকের হিসাবে জমা দেননি। ইজারাদারতে কাছে বকেয়া পড়ে আছে এক কোটি ৬৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৪ টাকা। প্রতিদিনের রাজস্ব পরবর্তী কর্মদিবসে জমা দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জমা হয়নি।

রাজস্ব আদায়ের জন্য পিডিআর অ্যাক্ট ১৯৯৩ অনুসারে মামলা করতে হয়, তাও করা হয়নি। সংষ্থার চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, বাস পরিচালনার ক্ষেত্রে ডিপো ব্যবস্থাপক ও চালকদের সঙ্গে দিনের আয়ের লক্ষ্য মাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় নাও হতে পারে। তিনি বলেন, টাকা নিয়মিত জমা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। অর্থ সংকট থেকে রক্ষা করতে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে বছরে ৫৪ কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়েছিল।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের জন্য তা আরো কমিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২১ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছিল; যদিও তা পাওয়া যায়নি। অনিয়মের কারণে যে পরিমাণ অর্থ কোষাগারে জমা হয় না, তা জমা হলে সংকট কিছুটা হলেও কমত। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কাজের কাজ কিছুই হয়নি।