রায় নিয়ে সরব রাজনীতি

নিউজ ডেস্ক: সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরব গোটা রাজনৈতিক অঙ্গণ। অরাজনৈতিক অঙ্গণেও চলছে এনিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। মোটকথা, দেশের প্রায় সর্বত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রে এই বিষয়টি-ই। রায়ে সংক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীরা পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন বিষয় ও প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার প্রকাশ্য সমালোচনা করছেন।

অন্যদিকে এই রায় ও পর্যবেক্ষণে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে বিএনপিসহ দলটির সমমনাদের বক্তব্য-মন্তব্যে। এনিয়ে তক্কাতক্কির প্রতিযোগিতায় রাজনীতির মাঠ থেকে উধাও হয়ে গেছে অন্য প্রায় সব ইস্যু। বিশেষ করে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না করা নিয়েও ক’দিন আগ পর্যন্ত চলা বিতর্ক এখন চাপা পড়েছে ষোড়শের রায় ও পর্যবেক্ষণে।

‘রায় নিয়ে রাজনীতি’ চোখ এড়ায়নি সুপ্রিম কোর্টেরও। যার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না, আমরা অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের ফাঁদে পা দেব না।’ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে একইদিন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, ‘আমরা রায় নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না, রায় ও পর্যবেক্ষণের কিছু বিষয়ে আমরা দুঃখিত ও সংক্ষুব্ধ, তারপরেও রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল।’ রাজনৈতিকভাবে নয়, সরকার আইনিভাবেই সবকিছু মোকাবেলা করতে চায় বলেও জানান আইনমন্ত্রী।

প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীর বৃহস্পতিবারের এই বক্তব্যের পর রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে কোনো পক্ষেরই আর রাজনীতি করা সমীচীন নয় বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘রায় নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো পক্ষেরই রাজনীতি করা ঠিন নয়।

প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে আন্দোলন করা হবে বলে খাদ্যমন্ত্রী (কামরুল ইসলাম) যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা খারাপ লক্ষণ। আমার কথা হচ্ছে, আদালতের পর্যবেক্ষণে কিছু বিষয় হয়তো মূল ইস্যুর সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক, তবে একথা সত্য যে-প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে কিন্তু ভুল কিছু বলেননি। এটা তো সত্য যে, দেশের কোথাও এখন জবাবদিহিতা ও প্রতিবাদ নেই বললেই চলে।’

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বাহাস সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি আমরা দেখছি, প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রী বৃহস্পতিবার অত্যন্ত গঠনমূলক বক্তব্য রেখেছেন। তাদের দু’জনের এই বক্তব্যের পর এনিয়ে আর কারোই রাজনীতি করা উচিত নয়।

আমাদের দেশে অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্যানে এমন কিছু বিষয় সামনে চলে আসে যখন আমরা অনেকেই নিজেদের পেশাদারিত্বটা ভুলে যাই। যার কারণে ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যার ঘটনা ঘটে। কার কোন দায়িত্ব, কে কোন দায়িত্ব নেবে, কোনটি নিয়ে কার কথা বলা উচিত, কার উচিত নয়- এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক থাকি না। সবাই যদি যার যার অবস্থানে দায়িত্বশীল হন, তাহলে এই অপচর্চা কমে আসবে।’

আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে গতকালও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা বিভিন্ন স্থানে সমালোচনামূলক বক্তব্য রেখেছেন। পক্ষান্তরে গত কয়েকদিনের মত গতকালও রায়ের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন বিএনপি নেতারা। সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও তিন দফা দাবিতে সারাদেশে জেলা বারসমূহে রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিপরীত অবস্থানের বাইরে অন্য কয়েকটি দলের পক্ষ থেকে বিচারবিভাগকে প্রতিপক্ষ না বানানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হকের বক্তব্যকে ‘আদালত অবমাননাকর’ দাবি করে তার অপসারণ ও গ্রেপ্তার দাবি করেছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এই দাবি জানান।

এসময় তিনি দিন দফা দাবিতে সারাদেশে জেলা বারসমূহে আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার তিনদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচিও ঘোষণা করেন। তিন দফা দাবি হচ্ছে- আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে খায়রুল হকের অপসারণ ও গ্রেপ্তার, মন্ত্রীদের বক্তব্যের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি বিধিমালার গেজেট অবিলম্বে প্রকাশ।

ব্যারিস্টার খোকন বলেন, যারা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, যারা সংবিধানে বিশ্বাস করেন, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তারা যেন এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বলেছেন যে, বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পরে তাদের কোনো সরকারি দায়িত্ব নেয়া উচিত নয়। তিনি নিজেই নিজের রায় ভঙ্গ করে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেসব পদ সাংবিধানিক পদ আছে সেগুলোর শপথের কথা বলা আছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের শপথের কোনো বিধান নেই। চেয়ারম্যান প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারি মাত্র। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসেবে তার বক্তব্যে সীমাবদ্ধতা আছে, কোড অব কন্ডাক্ট আছে। কো
ড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী তিনি সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না, তিনি চাকরির শর্ত ভঙ্গ করেছেন।