টেন মিনিট স্কুল এর পথচলা

আশিক আল মামুন : একটি স্কুল , যে স্কুলে সারিবদ্ধ ভাবে শ্রেণী কক্ষের পর শ্রেণী কক্ষ নেই, শিক্ষার্থীদের বসার জন্য নেই কোন বেঞ্চ, আবার শিক্ষকদের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোন চেয়ার কিংবা টেবিল! ধরাবাঁধা নিয়মের বাহিরে এসে, কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ এরকম একটি স্কুল গড়ে তুলেছে। নাম দিয়েছে, টেন মিনিট স্কুল ( www.10minuteschool.com )। যার শ্লোগান হচ্ছে, শেখো, অনুশীলন করো এবং উন্নত হও। স্কুলটি এমন একটি অনলাইন প্লাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীরা পছন্দের বিষয় শিখতে পারবে, বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবে, এমনকি কোন বিষয়ে নিজের দক্ষতা যাছাইয়ের জন্য পরীক্ষাও দিতে পারবে।

আমাদের সেকেলের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনটা জরুরী হয়ে পড়েছিল। পরিবর্তনের এই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে ১০ মিনিট স্কুল। www.10minuteschool.com ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বোঝা যায়, টেন মিনিট স্কুলের সৃজনশীলতা এবং কৌশল শিক্ষার্থীদের কাছে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। স্কুলটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে যে কোন বিষয়কে ১০ মিনিটের মধ্যে আয়ত্ব করা সম্ভব। টেন মিনিট স্কুলে দক্ষতা যাছাইয়ের জন্য পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ও ১০ মিনিট এবং সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর মূল্যায়ন করে পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার প্রদান করা হয়। উক্ত বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীর কতোটুকু দখল আছে, কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে, অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে সে কতোটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে তা জানিয়ে দিতেও টেন মিনিট স্কুল ভুল করে না।

দিন যতো যাচ্ছে, স্কুলটিতে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন টিউটোরিয়াল, নতুন নতুন কৌশল, নতুন নতুন প্রশ্ন ব্যাংক। আর যে নতুন মাত্রাটি সব থেকে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তা হল ‘লাইভ ক্লাস’। ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে লাইভ ক্লাসের আয়োজন করে আসছে টেন মিনিট স্কুল। লাইভ ক্লাসের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশকে যে একটা ক্লাস রুমে পরিণত করা যায় তা প্রমাণ করে দিয়েছে টিম ‘টেন মিনিট স্কুল’। ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ইচ্ছুদের একটা বিরাট অংশ এই লাইভ ক্লাসের শিক্ষার্থী ছিল।

সপ্তাহে পাঁচ দিন নির্দিষ্ট কোন টপিকের উপর এই লাইভ ক্লাস অনুষ্ঠিত হতো। এই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা প্রায় শেষ, তাই এখন ভর্তি পরীক্ষার টপিকের বাহিরে কঠিন কঠিন বিষয়গুলোকে সামনে রেখে লাইভ ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। জেএসসি, এসএসসি, বিসিএস পরীক্ষা, ব্যাংক জব পরীক্ষার জন্যও টেন মিনিট স্কুলে রয়েছে নানা প্রকার কুইজ এবং ভিডিও টিউটোরিয়াল। এমনকি দেশের বাহিরে পড়াশুনা করতে হলে যে সব পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় তাকে সহজ করার জন্য SAT, GRE, GMAT এবং IELTS এর অনুশীলনের টেন মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইট আছে অজস্র মডেল টেস্ট এবং কুইজ।

টেন মিনিট স্কুলের ইনস্ট্রাক্টর টিমের সদস্যরা প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়, হৃদয়গ্রাহী, এবং সহজবোধ্য উপায়ে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, মার্কেটিং, ফাইনান্স, উদ্যোক্তা, ও লেভেল, বিসিএস ইত্যাদি বিষয়ের উপর টেন মিনিট স্কুলের ইউটিউব চ্যানেলে (www.youtube.com/10minuteschool) আছে হাজার খানেক ভিডিও। পাঠ্য বইয়ের বাহিরে নিজেকে অন্য সবার থেকে ইউনিক করে তুলতে টেন মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, কেস সল্ভিং, ডিবেট, প্রেজেন্টেশন স্কিলস, লাইফ হ্যাকস সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর আছে মজাদার ভিডিও।

এই যে এতো কিছু, তার সবটাই একদম ফ্রি! প্রতি সপ্তাহে টেন মিনিট স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের ভিডিও লাইব্রেরীতে ৯৫ টি ভিডিও আপলোড করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভিডিও লাইব্রেরী, ইনফো ফ্যাক্টরি, স্টাডি হ্যাকস, মডেল টেস্ট, সারপ্রাইজ মি ইত্যাদি টেন মিনিট স্কুলকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার এবং টেন মিনিট স্কুল মিলে “ফ্রি এডুকেশন ফর অল” প্রোজেক্ট চালু করতে যাচ্ছে। এতে করে শহরের পাশপাশি গ্রামের শিক্ষার্থীরাও টেন মিনিট স্কুলের মাধ্যমে ডিজিটাল উপায়ে খুব সহজেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

 

টেন মিনিট স্কুলের রয়েছে বিশাল তরুণ কর্মী বাহিনী। বলতে গেলে তারাই টেন মিনিট স্কুলের প্রাণ। তাদের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। টেন মিনিট স্কুলের সদস্যরা স্বপ্ন না দেখলে হয়তো আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার খোলস অপরিবর্তিত থাকতো। তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেকেলের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগাতে। হ্যাঁ! টিম টেন মিনিট স্কুল ইতিবাচক পরিবর্তনের রাস্তায় অনেক দূর এগিয়েছেন। আর এই পুরো সিস্টেমটা নির্বিঘ্নে চলার জন্য টেন মিনিট স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে রবি আজিয়াটা লিমিটেড। আশা করছি, বাংলাদেশ সরকারকেও সামনে টেন মিনিট স্কুলের পাশে পাব। দিন যতোই যাচ্ছে, টেন মিনিট স্কুল ততোই অগ্রসর হচ্ছে। চাইলেই শিক্ষায় বিপ্লব ঘটানো যায় না, তার জন্য হিম্মত লাগে। টেন মিনিট স্কুল সেই হিম্মতটা দেখিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে নিশ্চিন্তে বলা যায়, আলো আসবেই, আলোকিত হবে বাংলার মানুষ।