ঢাকার যানজট যেভাবে কমানো সম্ভব

সুমন দত্ত :

ঢাকা শহরে যানজট কমার আদৌ কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এক রাস্তা দিয়ে সব ধরনের পরিবহন, সব রুটের রাস্তা এক, ঘন ঘন সিগন্যাল ও সিগন্যালের সময় সীমা একেক রাস্তার মোড়ে একেক রকম হওয়ার কারণে দীর্ঘ হচ্ছে যানজট।

যানজট কমানোর জন্য দরকার একটি সুপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেটা করবে কে? বিদেশি সহায়তায় দেয়া সিগনাল বাতিগুলো এক সময়ে কাজ করত। এখন আর করে না। কেন করে না সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই বলতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেও যানজট ঠেকানো যাচ্ছে না। আর এসব করতে গিয়ে রিকশা ভাড়া বেড়ে যায়। আগে যেখানে কম ভাড়ায় রিকশা পাওয়া যেত, এখন আর পাওয়া যায় না। রিকশা অনেক অলি গলি দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। আর এজন্য যাত্রী সাধারণকে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়।

রাজধানী ঢাকা শহরে এখন প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। এসব প্রাইভেট গাড়ির চালকের অদক্ষতার কারণে ও যেখানে খুশি সেখানে পার্কিং করার কারণে রাস্তায় গাড়ি চলাচলে গতি কমে যায়। সৃষ্টি হয় যানজট। ঢাকার নবাব পুর রাস্তা ওয়ান ওয়ে করে দেয়ার পরও সেখানে যানজট থাকে। কারণ সেখানে রাস্তায় ছোট ছোট ভ্যান, পিকাপ দাড় করিয়ে মালামাল খালাস করে সেখানকার দোকানদাররা। এসব কারণে গুলিস্তান থেকে পুরান ঢাকার কোট কাছারি এলাকায় আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। সবাইকে বংশালের রাস্তা দিয়ে আসতে হয়। অথচ এই বিকল্প সড়কটিতে যদি দোকানদারদের পণ্য খালাস করতে দেয়া না হত তবে বংশালের রাস্তার ওপর চাপটা কমানো যেত। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ সেটা করবে না। এবার আসি এক রাস্তায় একাধিক রুটের বাস চলাচলের ব্যাখ্যায়। সবচেয়ে বেশি চাপ হচ্ছে পল্টন-জিপিও মোড়।

গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও সদরঘাট থেকে আসা সব রুটের বাস এই পল্টন-জিপিও মোড় দিয়ে আসা যাওয়া করে। অথচ এসব এলাকা থেকে আসা বাসগুলোকে বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে চলাচলের নির্দেশ দেয়া হলে যানজট কমে যেত। কিন্তু সেটা করা যায় না। আগে বঙ্গবাজার-কার্জন হল-হাইকোর্ট দিয়ে গাবতলি,মিরপুর রুটের বাস গুলো চলাচল করত। এখন আর হয় না। কার্জন হলের বিপরীতে মেয়েদের হল তৈরি করার পর ওই এলাকা দিয়ে পাবলিক বাস চলাচল নিষিদ্ধ। কারণ হিসেবে বলা হলো হলের ছাত্রীরা দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে একটি ফ্লাইওভার করে দেয়া হয়েছে। ওই ফ্লাইওভার থাকতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের দুর্ঘটনাগ্রস্ত হবার আশংকা অযৌক্তিক।

এবার আসি মালিবাগ মৌচাক মোড়ের যানজট নিয়ে। রামপুরা ও গাজীপুর রুটের বাস চলে এই রাস্তা দিয়ে। অথচ মগবাজার ফ্লাইওভারটি ব্যবহার করতে দিলে অর্থাৎ বিচারপতির ভবনের সামনের রাস্তা ব্যবহার করতে দিলে মালিবাগ মৌচাকের যানজট এড়ানো যেত। কিন্তু ট্রাফিক বিভাগ সেটা করতে পারে না। এ নিয়ে দুরকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছে বিচারপতি ভবনের নিরাপত্তার জন্য মগবাজার ফ্লাইওভারে বাস উঠতে পারে না। আরেক পক্ষ বলছে ফ্লাইওভারে উঠতে যে কর দিতে হয় তাতে রাজি নয় বাস পরিবহণ মালিকরা। এজন্য মগবাজার ফ্লাইওভার ব্যবহার করেত পারে না পাবলিক বাস। এতে দীর্ঘ যানজট হয় শান্তি নগর- মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার ওয়ারলেস গেটে।

যানজটের আরো কয়েকটি কারণ হচ্ছে বাসগুলো নির্দিষ্ট স্টপেজ
ছাড়াই যাত্রী উঠায়। এজন্য যানজট হয়। যেমন নয়াবাজারে-ইংলিশ রোড মোড়, শাহবাগ মোড়, গোলাপ শাহ মাজার মোড়। এসব মোড়ে কোনো বাস স্টপেজ নেই। তারপরও এসব মোড়ে দীর্ঘক্ষণ বাস দাঁড় করিয়ে রেখে যাত্রী ওঠানো হয় বাসে। ট্রাফিক পুলিশের পকেটে ১০-২০ টাকা গুজে দিলেই বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো যায়। অনেক সময় দেখা যায় সিগনালে পড়ার আশায় বাস চালক গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়, যাতে সে সিগনাল পড়ে গিয়ে বাসে যাত্রী উঠাতে ও নামাতে পারে।

রাজধানীতে অনেক অবৈধ ও ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলছে। সেগুলো ধরার অভিযান এখন বন্ধ। অভিযান শুরু হলেই গাড়ির সংখ্যা কমে যায়। এসব ফিটনেস বিহীন গাড়ি যারা নামায় সেই পরিবহন সমিতি ও বাস মালিকদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয় না। যে কারণে রাস্তায় যানজট দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে।

রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিক করতে হলে সিগনালিং ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, রাস্তায় গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, বিকল্প রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর নির্দেশ দিতে হবে। ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহার করতে দিতে হবে। পল্টন-জিপিও মোড়ের ওপর চাপ কমাতে হবে। ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে মানাতে হবে। যেখানে সেখানে বাস দাড় করানো যাবে না। এসব বাস্তবায়ন করা গেলেই ঢাকার ভেতরে যানজট কমানো যাবে।