আর্থিক সংকটে করণীয় ঠিক করতে গঠিত হচ্ছে কাউন্সিল

নিউজ ডেস্ক: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে প্রধান করে গঠিত হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল (এফএসসি)। ব্যাংক আইনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার, ব্যাংকের কাঠামোগত সংকটকালে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন, দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ভবিষ্যতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট প্রতিরোধ এবং তা প্রতিকারে করণীয় ঠিক করবে এ কাউন্সিল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে দাতা সংস্থাগুলো আর্থিক খাতের সংকট মোকাবেলায় উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়ে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি খাতসহ বেসরকারি ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক খাতে নানা ধরনের সংকট দেখা দেয়ায় এফএসসি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ বিষয়ে নতুন করে কাউন্সিল গঠনের চাইতে বিদ্যমান আইন-কানুন পরিপালনে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। নতুন কাউন্সিল হলে এর সুপারিশমালা বাস্তবায়নের মানসিকতা থাকতে হবে। না হলে এসব কাউন্সিল কোনো কাজে আসবে না।

এ বিষয়ে জানাতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, এটা ভালো। তবে আসল কথা হলো অলরেডি যে সমস্ত নিয়ম-কানন, আইন রয়েছে সেগুলো পরিপালন করাটাই খুব জরুরি। এ ধরনে কাউন্সিলের কী ধরনের ভূমিকা থাকবে সেটা জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ কাউন্সিলের মাধ্যমে কাজের মধ্যে একটা সমন্বয় আসতে পারে। তারপরও এটি কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। কারণ দুর্বলতাগুলো তো আমরা জানি। সেগুলো কাটিয়ে ওঠাই বড় কথা। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ সংক্রান্ত নিজ নিজ কমিটি আছে। আর মনিটরিং পলিসি কোর্ডিনেশন কাউন্সিলও একটা আছে। এ কাউন্সিলেও তো এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আলাদা আলাদা অনেকগুলো কমিটি করা হলো কিন্তু এগুলোর সুপারিশ বা প্রস্তাব বাস্তবায়ন আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই না। এগুলো কেবল আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল (এফএসসি)’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে কাউন্সিল গঠনের গুরুত্বারোপের বিষয়টি পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী।

প্রস্তাবিত কাউন্সিলে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব/সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব/সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস-চেয়ারম্যান, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান, সমবায় বিভাগের রেজিস্ট্রার অ্যান্ড ডিরেক্টর সদস্য হবেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর কাউন্সিলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রয়োজনে যে কাউকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন।

সূত্র জানায়, দেশের যেকোনো আর্থিক সংকটকালে কিভাবে তা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে কাউন্সিলের সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রস্তাবিত কাউন্সিলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও রাখার প্রস্তাব করা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগামী এক বছরের মধ্যে এ কাউন্সিল গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।

নতুন এ কাউন্সিল কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ সংশোধন করতে হবে বলেও সূত্র জানায়।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের উচ্চ পর্যায়ের কাউন্সিল রয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিল সরকারকে। সে কর্মপরিকল্পনায় আর্থিক খাতে সংকট মোকাবেলায় এ ধরনের কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দেয় বিশ্বব্যাংক। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্ধিত ঋণ কর্মসূচির (ইসিএফের) অন্যতম শর্তও ছিল এ কাউন্সিল গঠন করা। নানা কারণে সরকার এতদিন এ উদ্যোগ না নিলেও এখন তা করতে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ায় কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করবে এ কাউন্সিল। এমনকি যাতে এ ধরনের সংকট সৃষ্টি না হয়, এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নজরদারি ব্যবস্থা করবে কাউন্সিল। এজন্য দেশের সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থা একসঙ্গে কাজ করবে। আর্থিক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানে সংকট দেখা দিলে তা উত্তরণে কাউন্সিল সরকারকে সুপারিশ করবে।

এস কে সুর চৌধূরীর উপস্থাপিত ধারণাপত্রে প্রস্তাবিত কাউন্সিলের গঠনতান্ত্রিক কাঠামো তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, কাউন্সিলের অধীনে দুটি ওয়ার্কিং গ্রুপ থাকবে। একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করবে। অপরটি কাজ করবে সামষ্টিক আর্থিক খাতের নজরদারিতে। এজন্য একটি কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল থাকবে। এসব গঠনের জন্য ইতোমধ্যে কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল টেকনিক্যাল গ্রুপ গঠন করা হয়েছে, যারা কারিগরি সহায়তা দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে এর সচিবালয় হবে।