আমরা কেন নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনছি

কামাল লোহানী:  আমাদের শৃঙ্খলিত মাতৃভূমিকে মুক্ত স্বদেশে পরিণত করার জন্য যে অগণিত মানুষের জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে, আমরা তা ভুলতে চাই না। প্রতিটি মুহূর্তে এ কথা নির্বিবাদে স্বীকার করি যে, একাত্তর ছিল আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একটি বিস্ফোরণ, যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছি। আর এই মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

৭ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সুবিশাল জনসমুদ্রে তার বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই সঙ্গে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধু নিরস্ত্র জাতিকে যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমরা জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে জীবনকে বাজি রেখে সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে শীর্ণ দেহের পাঁজর হাতে লড়াই শুরু করেছিলাম। বন্ধুর সহযোগিতা আর শত্রুকে ঘায়েল করে কেড়ে নেওয়া অস্ত্র দিয়ে আমরা লড়েছিলাম ছূড়ান্ত লড়াই- নয় মাস।

এ যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সঙ্গী, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতা, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। এ সরকারের প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেন। কিন্তু তার নির্দেশ অনুযায়ী তাজউদ্দীন আহমদ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে প্রমাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর যথার্থ সহযোগী হিসেবে। তার সুতীক্ষ্ন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক কৌশলের কারণে আমরা মুক্তিকামী পূর্ববাংলার অমিততেজ মানুষ অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ মুক্তি লাভ করলাম, অবশ্যই বন্ধু রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে।

২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এসে পৌঁছলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। এদিকে কূটনৈতিক কলাকৌশলে এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে দিল্লি পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে ঢাকায় তার শুভাগমন ঘটল ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। ফিরেই তিনি সরকারের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাজউদ্দীন হলেন তার মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে চটজলদি একটি সংবিধান প্রণয়ন করলেন।

যার চারটি স্তম্ভ রচনা করলেন এক. বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দুই. গণতন্ত্র, তিন. ধর্মনিরপেক্ষতা এবং চার. সমাজতন্ত্র। ১৯৭২-এ এই যে সংবিধান প্রণয়ন করলেন তার সংসদীয় সাথীদের নিয়ে, এটি এক ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে রইল। একটি মুক্তিযোদ্ধা জাতি এত তাড়াতাড়ি একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সংবিধান দিতে যে পারে তা তিনি প্রমাণ করলেন। এই সংবিধানেই বলা হলো, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা যাবে না। নিশ্চিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের জন্য এ ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ, যা বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতও অর্জন করতে তখনো পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধকালে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে প্রতিহত করার জন্য সপ্তম নৌবহর পাঠাতে চেয়েছিল সেই দেশই কেন যেন আমাদের ‘বন্ধু’তে পরিণত হতে শুরু করল। দেখা গেল, এক সময় মুক্তিযুদ্ধের সেই পরিচালক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকেই বিতাড়িত হলেন। কিন্তু রয়ে গেলেন সেই কুৎসিত চক্রান্তকারী আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ, যাকে আমরা দেখেছি কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের একটি নিভৃত কক্ষে বসে আমলা মাহবুবুল আলম চাষী এবং তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে।

আমরা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, চক্রান্তকারী মোশতাককে রেখে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তাজউদ্দীন আহমদকে কেন সরিয়ে দিলেন। তাজউদ্দীন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছিলেন, ‘জানিস না ওটা একটা শয়তান। তাই ওকে কাছে রেখে দিলাম।’ ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সেই ‘শয়তান’ মোশতাকই কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক তরুণ সামরিক অফিসারের অবাধ্যতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করল।

এসব কথা আমাদের সবারই খুব ভালোভাবে জানা আছে, কিন্তু তার পর এক সময় জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্যু করে এবং ত্রাণকর্তা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিজের লোভনীয় ক্ষমতার আসনটি নিশ্চিত করল। তার পর কী হয়েছিল, সেসব কথা জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন পর্যন্ত আমাদের সবারই জানা আছে। উপরিউক্ত দুই সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদ দেশ শাসন করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ প্রদর্শন করল। দেশবাসী জনগণের মধ্যে নেমে এলো হতাশা, দমন-পীড়নে নাভিশ্বাস উঠল সাধারণ মানুষের।

মানুষ তখন যূথবদ্ধ হয়ে দিনরাত্রির লড়াই-সংগ্রামে স্বৈরাচারের প্রায় এক দশকের অবসান ঘটাল। হায়রে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল তা ঘাটে ঘাটে ঘাত-প্রতিঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে সামরিক শাসকদের কুৎসিত কৌশল মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে আপসরফা করে দেশ পরিচালনা করতে শুরু করেছিল। সেখান থেকে ফেরার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পতাকা বহনকারী দল আওয়ামী লীগের যে পথে হাঁটা উচিত ছিল, সে পথে হাঁটল না। ফলে তা না হয়ে ১৯৯১ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হলো বিএনপি।

স্বৈরাচার পতনের পর বিএনপির বিজয়ে সবাই হতবাক হয়েছিল। তার অপপ্রয়াস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে প্রচ-ভাবে হতাশ করল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলো। সবার আশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুফল এবার হয়তো পাওয়া যাবে।… কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলো যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামকে নিয়ে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ৯০-র দশকেই খালেদা জিয়ার শাসনকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গণআদালত বসিয়েছিলেন। সেখানে জননী সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন জাহানারা ইমামের বামপাশে এবং ডানপাশে ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা।

শহীদ জননীকে এই গণআদালত অনুষ্ঠানে সাহস দিয়েছিলেন এই বিরোধীদলীয় নেত্রীই। যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘ফাঁসির দাবি’তে আন্দোলনরত শহীদ জননীকে খালেদা জিয়া তার পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। আর ড. আহমদ শরীফ, কবীর চৌধুরী প্রমুখ বরেণ্যজনসহ শহীদ জননীকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় ফেলেছিলেন খালেদা জিয়া। এই খালেদা জিয়াই ২০০১-এ আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন। মাঝখানে আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ‘বিড়ম্বনা’ বাংলাদেশকে একটা অদ্ভুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল, এবার সেখান থেকে মুক্তি মিলল।

২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন হলো। তবে এর বাইরে আবার সেই স্বৈরাচারী এরশাদকে নিয়ে ১৪ দল মহাজোটে পরিণত হলো। এই জগাখিচুড়ি জোটবদ্ধতা বিএনপি-জামায়াত থেকে রক্ষা করল বটে এবং এরা যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেন ঠিকই কিন্তু কাজটি শুরু করতে নানান টালবাহানা করতে থাকলেন। তবুও তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেন এক সময়। ইতোমধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত আবালবৃদ্ধবনিতার বিপুল সমাবেশ শাহবাগ চত্বরকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে উচ্চকিত করে তুলল।

অবশেষে সরকার যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি দিয়ে যাত্রা শুরু করল। তার পর কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মীর কাসেম আলী এসব ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসিও হলো। তবে নাটের গুরু নবতিপর গোলাম আযম আমৃত্যু জেল খাটতে গিয়ে অল্প কিছুদিন পর কারাগারেই মৃত্যুবরণ করলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাঈদীর ফাঁসি আপিলে যাবজ্জীবনে রূপান্তরিত হলো এবং শুনলাম, একজন বিচারক তাকে খালাসের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। হায়রে স্বদেশ! সেই সাঈদীর রিভিউ আবেদন নাকচ হয়ে আমৃত্যু বন্দিত্বই বহাল রইল। আমরা তো দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রতিটি মানুষ সাঈদীর ফাঁসিই চেয়েছিলাম।

ইতিহাস গড়াতে গড়াতে এমন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে পৌঁছল, যখন দেখলাম ২০১৩ সালের ৫ মে হাটহাজারীর আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি ধর্মান্ধ সংগঠন ঢাকায় সমাবেশ করতে অনুমতি চাইল। প্রথমে দেওয়া না হলেও পরে তাদের অনুমতি কেন দেওয়া হলো সেটা সাধারণের বোধগম্য নয়। অনুমতি পাওয়ার পর হেফাজতিরা, যাদের মধ্যে টিনএজারদের সংখ্যাই সর্বাধিক। ধর্মান্ধদের নেতৃস্থানীয় যারা তাদের হুকুমে এই ‘কিশোর মাস্তান’দের দিয়ে ঢাকা শহরে এক তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে ফেলল।

আইল্যান্ডের লোহার রেলিং উপড়ে ফেলল, গাছপালা তুলে ফেলল, বায়তুল মোকাররম মসজিদে আগুন দিল, দক্ষিণ প্লাজায় অসংখ্য অস্থায়ী দোকানের কোরআন শরিফে আগুন লাগাল, কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে অগ্নিসংযোগ করল। এমনিভাবে তারা ক্রমেই সচিবালয় দখলের মতলব এঁটেছিল। সেখান থেকেই তাদের নিরস্ত্র করে পুলিশ রাতের গভীরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে পিটিয়ে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দিল। এর পাশাপাশি তাজ্জব ব্যাপার, ভোর ৪টার দিকে গণজাগরণ মঞ্চের সব আয়োজন লোপাট করে দেওয়া হলো। এর পরের কাহিনি দীর্ঘ। সেদিকে না গিয়ে আসল কথায় আসি। লোকে বলাবলি করছিল, হেফাজতের সঙ্গে সরকারের গোপন রফা হয়েছে, সে কারণেই গণজাগরণ মঞ্চকেও উচ্ছেদ করা হলো।

কিন্তু যতই দিন যেতে আরম্ভ করল ততই লক্ষ করলাম হেফাজতের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে বিএনপি-জামায়াত রটনা করল হেফাজতিদের ওপর পুলিশ হামলা চালিয়ে ২ হাজার ৫০০ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। যা ছিল ডাহা মিথ্যা কথা। পরবর্তীকালে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তদন্ত করে দেখেছে মাত্র ৩৯ জন নিহত হয়েছিল। তবু বিএনপি ‘চোরের মায়ের বড় গলা’র মতো হত্যার সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ বলে যাচ্ছিল। যেটা প্রমাণ করার কোনো যুক্তি তারা দেখাতে পারেনি আজও পর্যন্ত। কিন্তু এই সমাবেশে, পুলিশি হামলায়, নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ চিৎকার করে হেফাজতে ইসলাম ও তার নেতৃত্ব সরকারের সঙ্গে ক্রমেই এক গোপন আঁতাতে জড়িয়ে পড়তে থাকল।

তারই পরিণতিতে দেখলাম, ১৪ দলীয় সরকারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রায় উচ্ছেদ করে হেফাজতকে কাছে টানতে লাগল। আমার ধারণা, তাদের ভরসা হেফাজতের অনুসারী কয়েক লাখ তালেবে এলেম ও তাদের গার্জিয়ানরা ভোটযুদ্ধে আওয়ামী লীগকে সহায়তা দান করবে। কিন্তু সে গুড়ে যে বালি, তা ক্ষমতাসীনরা ভাবতেই পারছেন না। মজার ব্যাপার হলো, দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় জামায়াতকে গলায় ফুলের মালা দিয়ে আওয়ামী লীগে গ্রহণ করেছেন এবং ভাবছেন এই জামায়াতিরা তাদের হয়ে গেল। কিন্তু এরা যে জনগণের সঙ্গে বেইমানি করলেও, হত্যা কিংবা ধ্বংসলীলা চালালেও নিজেদের বিশ্বাস থেকে একরত্তিও নড়বে না, সেটা সরকারি নেতারা বুঝতে পারছেন না।

যাহোক মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির নতুন মুখোশ পরা হেফাজতে ইসলাম বর্তমান সরকারকে পেয়ে বসল এবং তারা মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে এক চক্রান্ত পরিকল্পনা করল। তারা ভাবল নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জাতীয় ঐতিহ্য ও চলমান শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘পরিমার্জন’ করতে হবে। তারা একটি দাবিনামা প্রণয়ন করে তাতে ১৩টি বিষয় উল্লেখ করল এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কুসুমকুমারী দেবী এবং পল্লীকবি জসীমউদ্্দীনকে পর্যন্ত শিক্ষাক্রম থেকে হয় বাদ দিল না হয় কাটছাঁট করে ক্ষতবিক্ষত করল। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘বই’ কবিতাটি বাতিল করার দাবি জানাল।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকার অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার কথা মুখে বললেও হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা কুৎসিত দাবি মেনে নিল এবং সেই অনুযায়ী প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন করে ফেলল। বুঝলাম হেফাজতি সাম্প্রদায়িকীকরণের বিষাক্ত ছোবল সরকারকে চেপে ধরেছে। হুমায়ুন আজাদের লেখা বই কবিতাটি কেন সম্পূর্ণ বাতিল করা হলো তা সরকার এবং হেফাজতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বুঝতে পারলাম না। কবিতাটিতে শিশু-কিশোরদের সেসব বই পড়তে বারণ করা হয়েছে যা কিছু শিশু মনকে বিভ্রান্ত করে কিংবা ভয় দেখায়। পাঠক, আমরা তো জানি শিশু-কিশোরদের জন্য যেসব বই অতীতে লেখা হয়েছে তার মধ্যে ভূতপ্রেত, রূপকথার দৈত্যদানব, অদ্ভুত কল্পকাহিনি এবং লোমহর্ষক গপ্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

আমার মনে হয়, হুমায়ুন আজাদ যে বইয়ের কথা লিখেছেন তাকে কল্পিত ব্যাখ্যা দিয়ে হেফাজতিকরণের মাধ্যমে কোনো শঙ্কায় আক্রান্ত হয়েছে। তাই বুঝি ওদের ক্রোধ হুমায়ুন আজাদের ওপর। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, শিক্ষাবিদ হুমায়ুন আজাদকে জঙ্গি হেফাজতের ‘সন্ত্রাসী স্বজনরা’ই হত্যা করেছে। তাই তার কোনো কর্মকে হেফাজতের কেন পছন্দ হবে।

এহেন হেফাজতিদের পরিচালিত মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশু-কিশোর-তালেবে এলেম সংখ্যায় ১৪ লাখ। আমাদের সদাশয় সরকার এই তালেবে এলেমদের অমানুষ হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টায় এক পরিকল্পনা গ্রহণ করল। তারা ভাবল এই বিরুদ্ধবাদীদের ‘মগজধোলাই’ করে সৎ পথে নিয়ে আসবে। হোক না তারা সাম্প্রদায়িক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সন্ত্রাসী আদর্শে দিক্ষিত। সরকার তার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওদের মানুষ করার জন্য একটি ধারায় নিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু হেফাজতি একগুঁয়েমির কারণে এই কওমি মাদ্রাসার সবাইকে কি এক করতে পারল কিংবা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ধারায় ফেরাতে পারল?

ওদের জন্য ছয়টিকে একত্রিত করে যে বোর্ড গঠন করা হল তাতে তো ওদের লোক ছাড়া অন্য কাউকে সেখানে ঢুকতে দিল না বলেই শুনেছি। তাহলে কী পরিবর্তন হলো? কাজেই মনে রাখতে হবে, কওমি মাদ্রাসার তালেবে এলেম ও তাদের ওস্তাদ এবং মাদ্রাসা পরিচালকরা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি হিসেবে সারাজীবন পৃথক সত্তা বজায় রেখে, শোষণ থেকে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেরও তীব্র বিরোধিতা করেছিল এবং দেশবাসী সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

বাংলাদেশ তো মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভূখ-, তাই তারা এই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে কখনই মেনে নিতে পারেনি, গোপনে ও প্রকাশ্যে কেবল বিরোধিতাই করে এসেছে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে সরকার কেন কওমি মাদ্রাসার তালেবে এলেম এবং হেফাজতিদের প্রতি এত দুর্বল? তবু শুনলাম, শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য দায়িত্ব অর্পণ করেছে, এ অবশ্যই সুসংবাদ। এ সিদ্ধান্তের পরিচয় ফলেই পাওয়া যাবে।

দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে বিচারের প্রতীক হিসেবে গ্রিক দেবীর সর্বজনীন ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মৌলবাদী অপশক্তির একাংশ একে ‘মূর্তি’ বলে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানিয়েছিল। গণভবনে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বিশাল বৈঠকে প্রসঙ্গটি উঠলে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলবেন। এদিকে দেশের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল সচেতন জনগণই নয়, দেশবাসী সবাই ভাস্কর্য অপসারণের তীব্র প্রতিবাদ করছিলেন।

অবশেষে একদিন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য রাতের অন্ধকারে মিস্ত্রি ও জোগালিয়ারা হাতুড়ি-শাবল নিয়ে ভাস্কর্যটি ভাঙতে শুরু করে দিল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় খবর পৌঁছলে সচেতন ছাত্র সমাজ এই শিল্পকর্মটিকে অপসারণের প্রতিবাদে মিছিল নিয়ে বিচারালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন। কিন্তু পুলিশি বাধার কারণে তারা সেখানেই অবস্থান নিলেন। আর ভেতরে হাতুড়ি-শাবল চলতে থাকল। নাগরিক চেতনাকে উপেক্ষা করে শিল্পের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে ভাস্কর্যটিকে সরিয়ে ফেলা হলো। রাখা হলো এনেক্স বিল্ডিংয়ের কাছে।

মৌলবাদীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অপসারিত ভাস্কর্যটি শেষে স্থান পেল ওই বিল্ডিংয়ের সামনেই। যারা ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে ফারাক বোঝে না তাদের দাবিও মানা হলো এতে, আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে শিল্পানুরাগীদেরও মন রক্ষা করা হলো। এ এক বিস্ময়কর নাটক। এমনি করেই কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলবাদী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের কাছে বিসর্জন দিতে হবে?

জামায়াত যখন দেখল তাদের ওপর যুদ্ধাপরাধের পাপটি একটির পর একটি প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তারা কৌশল গ্রহণ করল ক্রমেই আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করতে। আর যে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে তাদের প্রবল বিরোধিতা ছিল, তাকে উচ্ছেদ করে কৌশলের কারণেই ‘মিতালী’তে পরিণত করল। যে হেফাজত আগে জামায়াতকে দেখতে পারত না, সেই হেফাজতই জামায়াতের ‘গেহরা দোস্ত’ হয়ে গেল। এখন জামায়াত সাংগঠনিকভাবে তাদের কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত সুচারুরূপে নির্ধারিত করে হেফাজতের সঙ্গে ওপরে ওপরে দোস্তি করছে আর তারই মাধ্যমে সরকারকেও বেমক্কা কৌশলে আটকে ফেলার চেষ্টা করছে।

কিন্তু সরকার মনে করছে ‘এ আমাদের কূটকৌশলের বিজয়।’ হায়রে রাজনীতি, জামায়াত কিংবা হেফাজত আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দলের বন্ধু হবে এবং নির্বাচনে তাদেরই ভোট দেবে এ কথা ভাবছেন কী করে? এমনই চালের কৌশলে বর্তমান সরকারকে মৌলবাদীরা সাম্প্রদায়িকতার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। তাহলে আমরা কি বুঝব ধর্মনিরপেক্ষতার যে মৌলস্তম্ভ তাকে জলাঞ্জলি দিয়েছি? সংবিধানের মূল চারটির একটি ধর্মনিরপেক্ষতা এখনও আছেই, এই যুক্তি যখন দেখানো হয় তখন পাঠকের মনে কি এ প্রশ্ন জাগে না যে, জেনারেল জিয়ার ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এই দুটিকে পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশ হিসেবে সংবিধানে রেখে দেওয়া কি সাম্প্রদায়িকতারই শামিল নয়?

তাহলে আমরা কি ভাবতে পারি ৭২-র সংবিধান সম্পূর্ণভাবে পুনর্বহালের যে ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিমকোর্ট দিয়েছিলেন, তা গ্রহণ না করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া সংবিধানটিকেই কি কলঙ্কিত করা হলো না?

দেশবাসী সব মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের হেফাজতে ইসলামের কাছে নতজানু নীতির নানা বহিঃপ্রকাশ দেখে প্রচ-ভাবে শঙ্কিতবোধ করছে। আমরা কেন নিজেদের ‘সর্বনাশ’ না হলেও ক্ষতি ডেকে আনছি। যে ক্ষতি গোটা দেশকে শত শত বছর পিছিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ কোনোভাবে যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিএনপি, জামায়াত এবং মৌলবাদী অপশক্তির বর্তমান গোলাঘর হেফাজতের বন্ধুরা ক্ষমতায় আসে তাহলে দেশটা কোন পথে হাঁটবে?

তবে কি আমরা ভাবব কবি শামসুর রাহমানের ‘দেশ চলেছে এক উদ্ভট উটের পিঠে’ এ কথাই সত্য হবে? যদি তাই হয় তাহলে লাখো শহীদের রক্তের কাছে আমরা কী জবাব দেব? পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন সংগ্রামে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের সামনে কোন কৈফিয়ত নিয়ে দাঁড়াব? তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্টকারী যে কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব এবং প্রতিরোধ সংগঠিত করব।

কামাল লোহানী, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক