শোক ও স্মরণ থেকে তৈরি হোক শপথের তরবারি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী:  আজ পয়লা আগস্ট। বাঙালির জাতীয় জীবনে শোকের মাসের শুরু। আজ থেকে ৪২ বছর আগে এই মাসের ১৫ তারিখে নিখিল বিশ্বের বাঙালি শোকস্তব্ধ হয়ে শুনেছিল নব্য বাংলার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থান করায় তাঁর দুই কন্যা সেই বর্বরতা থেকে রক্ষা পান। তারপর ৪২ বছর কেটে গেছে। এই মাসটিতে শোকের সঙ্গে স্মরণ মিশ্রিত হয়ে তৈরি হওয়া দরকার শপথের তরবারি। সেই তরবারি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলা রক্ষা করার প্রহরী।

শোক কয়েক দিনের। কিন্তু স্মরণ চিরদিনের। ব্রিটেনে তাই জাতীয় বীরদের মৃত্যু বা নিহত হওয়ার দিনটাকে বলা হয় remembrance day বা স্মরণ দিবস। রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন—‘মোর লাগি করিয়ো না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
’ বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও এই কথাটি সঠিক। তাঁর রয়েছে কর্ম ও সৃষ্টি (স্বাধীন বাংলাদেশ), রয়েছে বিশ্বলোক। তিনি বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। প্রতিবছর তাই আগস্ট মাস বা ১৫ আগস্ট তারিখটি এলে শোক নয়, স্মরণ, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও তাঁর স্বপ্নকে নতুন করে ধারণ ও বরণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠা উচিত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার এক বছরের মাথায় অর্থাৎ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমি লন্ডনের অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘বাংলার ডাক’ পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় লিখেছিলাম, তার শিরোনাম ছিল ‘১৫ আগস্ট তোমার মৃত্যু দিন নয়, নতুন জন্ম দিবস’। এক বিরাট রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে যেমন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তেমনি গোটা পরিবারসহ মৃত্যুস্নানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নবজন্ম হয়েছে। এখন তিনি আরো শক্তিশালী। আরো ব্যক্তিত্বময়।

তাই বাংলাদেশের কবিরা এখন লেখেন, ‘মুজিব মানেই বাংলাদেশ’। কেউ কেউ লিখেছেন, ‘মুজিব মানেই মুক্তি’। তাঁর দল এখন ক্ষমতায় আছে বটে, কিন্তু কবরে শুয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন শেখ মুজিব। তাই ঘাতক শক্তি ও একাত্তরের পরাজিতপক্ষ ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতি দ্বারা ক্ষমতা দখল করেছিল; কিন্তু শত চেষ্টা দ্বারাও মুজিবের নাম ও ছবি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। দানবের মূঢ় অপব্যয় ইতিহাসে কোনো শ্বাশ্বত অধ্যায় গ্রন্থনা করতে পারেনি। ইতিহাসের সেই শ্বাশ্বত অধ্যায় হয়ে আছেন শেখ মুজিব।

তাই আগস্ট মাসটি এলেই বাংলাদেশের মানুষ রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষায় জাতির পিতা, স্বাধীনতার স্থপতিকে স্মরণ করে—‘মুক্তিদাতা, তোমারও ক্ষমা, তোমারও দয়া, রবে চির পাথেয়, চির যাত্রায়। ’ বাঙালির এই যাত্রাপথ তো কুসুমাস্তীর্ণ নয়। হত্যা, ষড়যন্ত্র ও মিলিটারি ক্যু, হিংস্র সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা দ্বারা কণ্টকাকীর্ণ। কখনো পতন, কখনো উত্থান। এই ‘পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থায়’ সংগ্রামের চির সারথি বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগ এই পথযাত্রায় কখনো কখনো ভুল করতে পারে, পথভ্রষ্ট হতে পারে। কিন্তু তাদের সামনে উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মতো জেগে আছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বেঁচে আছেন এবং বাংলাদেশের মানুষের অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামে এখনো নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

তাই তাঁর মৃত্যুর ৪২ বছর পরও দেশের ঘাতক ও অশুভ শক্তি জোট ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি শুনলেই ভয় পায়। রক্তচোষা ড্রাকুলা যেমন ক্রসচিহ্ন দেখলেই ভয় পায়, তেমনি বঙ্গবন্ধুর নাম শুনলেই একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতক শক্তি ভীত হয়। তাঁর নাম মুছে ফেলতে চায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের এবং একাত্তরের মানবতার শত্রুদের যাতে বিচার ও দণ্ড না হয় সে জন্য এই ঘাতক জোটের প্রধান দলটির নেত্রী চেষ্টা করেছেন এবং জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টকে তাঁর বানোয়াট জন্মদিন ঘোষণা করে উৎসবের দিনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। আগস্টের স্মরণ ও শপথের তরবারি তাঁর সেই ভ্রষ্টাচার ও মিথ্যাচার ব্যর্থ করে দিয়েছে।

এখানে একটি বিস্ময়কর ব্যাপার লক্ষণীয়। আগস্ট মাসের আগের জুলাই মাসটিও ছিল বহুকাল বাঙালির জীবনে একটি শোকের মাস। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই ইংরেজ বণিকদের শঠতা ও মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা মিলিত হয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে হত্যা করেছিল। ব্রিটিশ আমলে, আমাদের ছোটবেলায়ও দেখেছি, প্রতিবছর ৩ জুলাই শোক ও স্মরণ দিবস হিসেবে পালিত হতো। পলাশীর যুদ্ধ ও নবাব সিরাজকে নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সব সম্প্রদায়ের মানুষ নানা অনুষ্ঠান করত।

গত শতকের চল্লিশের দশকের গোড়ায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই ৩ জুলাইকে শোক দিবস নয়, সংগ্রামের শপথ গ্রহণ ও ব্রিটিশ রাজশক্তিকে প্রতিরোধের দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক আরোপের জন্য ইংরেজরা কলকাতায় যে হলওয়েল মনুমেন্ট তৈরি করেছিল, সুভাষ বসু এক বিশাল শোভাযাত্রা বের করে সেই মনুমেন্ট ভেঙে ফেলেন। এই শোভাযাত্রায় শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন। তিনি তখন তরুণ বয়সী ছাত্র।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর ৩ জুলাই পালন ধীরে ধীরে বিস্মরণের অন্ধকারে তলিয়ে যায়। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে বাঙালি ভুলে যায়নি। আমার ধারণা, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৩ জুলাইয়ের শোক ও স্মরণ ১৫ আগস্টের মধ্যে আবার মূর্ত হয়েছে। ইতিহাসের একই ধারায় ৩ জুলাই ও ১৫ আগস্ট গ্রথিত; যদিও এই দুই দিবসের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২০০ বছরের।

৩ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের শোক থেকে যেমন বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে শপথের তলোয়ার তৈরি হয়েছিল, তেমনি ২০০ বছর পর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড থেকে স্বদেশি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে শপথ ও সংগ্রামের হাতিয়ার গর্জে উঠেছিল। বাংলার মানুষ শোককে অতিক্রম করে সংগ্রামের শপথ গ্রহণ করেছিল বঙ্গবন্ধুরই কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু অনেক পতন-উত্থানের মধ্য দিয়ে অসমাপ্ত স্বাধীনতার যুদ্ধ সমাপ্ত করার লড়াই এখনো চলছে।

আগস্ট মাস তাই শুধু শোক প্রকাশের মাস নয়। স্মরণের মাস এবং এই স্মরণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর রক্তঋণ শোধ করার শপথ ঝালাই করার মাস। এটা সম্ভব জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে যদি প্রতিবছর এই মাসে দল, দেশ ও জাতি শপথ গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নে সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৭১ সালে একটি লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেই ডাক ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের। এবার এই সংগ্রামের মাঠ আরো বিস্তীর্ণ হয়েছে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধ্বংস করার জন্য দেশি ও বিদেশি অপশক্তি জোটবদ্ধ হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, জঙ্গিবাদ ও মধ্যযুগীয় উগ্র ধর্মান্ধতা ও দুর্নীতি দেশটাকে গ্রাস করতে চাইছে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব শিবিরের অস্তিত্ব এখন নেই। আগ্রাসী ধনবাদী বিশ্বায়ন সব জাতিসত্তার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বিশ্বধ্বংসী জোয়ারে বাঁধ দেওয়ার শক্তি বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের সৌভাগ্য, তাদের এই শক্তি অর্জনের একটি উৎস আছে। সেটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। ড্রাকুলা তাড়াতে হলে যেমন ক্রসচিহ্ন ধারণ করতে হয়, তেমনি বাংলাদেশকেও বিশ্বায়নের ড্রাকুলা শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রূপায়ণে বজ্রকঠিন শপথ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান আওয়ামী লীগ শুধু বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের তাবিজ বিক্রি করছে, নিজেরা ধারণ করছে না। শুধু মুজিব কোট গায়ে চাপালেই মুজিবপন্থী হওয়া যায় না। মুজিবের স্বপ্ন ও আদর্শ রূপায়ণে একাত্তরের মতো সংগ্রামের শপথ নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর বর্তমান অনুসারীরা কি জানেন, তাঁর লক্ষ্য ও আদর্শ কী ছিল? তাঁর অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, সমাজতন্ত্রঘেঁষা অর্থনীতি (মিশ্র অর্থনীতি নামে যা পরিচিত), সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান—এর কোনোটাতেই কি তাঁদের দৃঢ় আস্থা ও আনুগত্য রয়েছে? যদি না থাকে তাহলে বিশ্বাসের এই শিকড়ে তাঁদের ফিরতে হবে। আর যদি থাকে তাহলে দেশের সব মানুষের মধ্যে এই আস্থা ও আনুগত্য ছড়িয়ে দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর অশুভ জোট ও তাদের বিদেশি অভিভাবকদের সম্মিলিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের শপথ গ্রহণ করতে হবে। সেই শপথ গ্রহণের মাস এই আগস্ট। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে রুখে দাঁড়ানোরও মাস এই আগস্ট।

এই মাস আত্মশোধনের মাস, আত্মসচেতনতার মাস, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাস। দেশ যে দুর্যোগকবলিত, একা আওয়ামী লীগের দ্বারা তার প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্ভব নয়। দেশে একাত্তরের মতো গণজাগরণ দরকার। বঙ্গবন্ধু এই গণজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি একটি দুর্নীতিমুক্ত দল ও ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং ত্যাগী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তাঁর পেছনে পেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার পেছনে এই শক্তিজোট নেই। এখন চলছে দুর্নীতি-সন্ত্রাসের রাজত্ব, ধর্মান্ধতার দানবের হিংস্র অভ্যুত্থান। সেই সঙ্গে বিশ্বায়নের মানবতাবিরোধী আগ্রাসন। দেশের মানুষ শত অপপ্রচারে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। এই সময়ে শেখ হাসিনার জন্য কবি নজরুলের একটি কথাই যেন সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে :

‘কাণ্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যাজিবে কি পথ-মাঝ?

করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!’

এই মহাভার কাঁধে বহন করা সহজ করতে হলে এই শোক ও স্মরণের মাসে সবাইকে শপথ নিতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতিতে ফিরে যাওয়ার। তাঁর অসমাপ্ত সংগ্রাম সমাপ্ত করার। একটি সাধারণ নির্বাচন সামনে নিয়ে এই আগস্ট মাস হোক সেই লক্ষ্য সফল করার বজ্রকঠিন শপথ গ্রহণের মাস।

লন্ডন, সোমবার, ৩১ জুলাই, ২০১৭